আবার সম্ভবত একই ঘটনা ঘটল। ঝাড়খণ্ডের বেলডাঙায়। ঠোঁটে বাংলা ভাষা, তাই সন্দেহ, হয়তো আলাউদ্দিন শেখ বাংলাদেশি বাঙালি। তার মানেই ‘অনুপ্রবেশকারী’! অতএব মরতে হল তঁাকে। সম্ভবত খুন হতে হল। সংবাদপত্রে প্রকাশ, ৩৫ বছরের আলাউদ্দিন পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করতেন। থাকতেন ঝাড়খণ্ডের বিশ্রামপুর এলাকার বাড়িতে। সেখানে বৃহস্পতিবার তঁার ঝুলন্ত দেহ পাওয়া গিয়েছে। হয়তো আত্মহত্যা নয়, খুন। কেননা তিনি ‘পরিযায়ী’, অথচ বাংলা বলেন। তাহলে তিনি নিশ্চয়ই বাংলাদেশি! এবং বাংলাদেশি মানেই অনুপ্রবেশকারী। অতএব তাকে মেরে ফেলে টাঙিয়ে দাও। এমন সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কেননা, বাংলা বলার জন্য কেউ না কেউ দেশের কোথাও না কোথাও প্রায় রোজ খুন হচ্ছে! ফলে বাঙালি ক্রমেই আতঙ্কিত। বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা।
অধিকাংশ বাঙালির পক্ষে সেই ভাষায় কথা বলাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ এখন এমন, বাংলার বাইরে তো বটেই, এমনকী ধর্মে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ এই রাজ্যেও বাংলা বললেই সন্দেহ প্রসারিত হচ্ছে– জাল নথিপত্রের সাহায্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে। বেআইনিভাবে এই দেশে কাজ পেয়েছে। অতএব সে ক্রিমিনাল। এবং তার উপর নানাভাবে চড়াও হওয়া যায়! এমনকী, তাকে মেরে ফেলাও যায়! যারা সীমিত শিক্ষার কারণে বাংলা ছাড়া আর কোনও ভাষা জানে না, বাংলায় কথা বলা ছাড়া যাদের উপায় নেই, এবং এদের মধ্যে যারা বাংলার বাইরে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের অসহায়তা এবং অনিশ্চয়তা ভয়াবহ– সন্দেহ নেই।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, আমাদের বাংলার এবং পাশেই বাংলাদেশের প্রধান ভাষা বাংলা। কিন্তু আমাদের দুই দেশের মৌখিক বাংলা এতটাই ভিন্ন যে, বাংলাদেশি বাংলাকে মুহূর্তে চেনা যায়। তবে অধিকাংশ মানুষ যারা এদেশে বাংলাদেশি বাংলায় কথা বলে, তারা এই দেশেরই নাগরিক, বেআইনিভাবে এদেশে এসে কাজ করছে, এমন নয়। কিন্তু তারা এক ব্যাপ্ত বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। আলাউদ্দিন শেখ এই দেশেরই এক বাঙালি মুসলমান, যিনি বাংলা ছাড়া আর কোনও ভাষা জানতেন না, এমন হওয়া স্বাভাবিক। তবু হয়তো বাংলা বলার জন্যই তঁাকে মরতে হল!
নতুন প্রজন্মের বাঙালি বাংলা ভাষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বাংলা ভাষায় বইপ্রকাশের ব্যবসা ধুঁকছে। বাংলায় বই লিখে ক’জন বাঙালি বলার মতো উপার্জন করতে পেরেছে? তবে একথা ঠিক কলকাতায় বাঙালির বাৎসরিক হিড়িক ও হুজুক কলকাতা বইমেলা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের উজান টানে! এই মেলার জনপ্লাবনের বাড়বাড়ন্ত ক্রমান্বিত! এ এক ম্যাজিক বাস্তব, যার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই বাংলা ভাষার ঘনায়মান বিপদের! বাঙালির বইমেলায় গেলে মনে হয় না– বাঙালির মাতৃভাষা গভীর সংকটে!
