shono
Advertisement

Breaking News

FIFA World Cup 2026

বিশ্বকাপে কোনও 'ছোট' দেশ নেই! অঘটন ঘটিয়ে কেপ ভার্দে, কঙ্গোরাও আজ সমান সম্মানের দাবিদার

কোনও দেশ যুদ্ধে বিধ্বস্ত, কোনও দেশ ধুঁকছে আর্থিক সংকটে। তবু কীভাবে 'মিরাকলে'র ভরসায় না থেকে লড়াই উপহার দিচ্ছে এই দেশগুলো?
Published By: Arpan DasPosted: 04:44 PM Jun 22, 2026Updated: 05:51 PM Jun 22, 2026

'আমরা তো আর ছোট নেই'। স্বর্ণযুগের বাংলা সিনেমার গানের সঙ্গে অনায়াসে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপকে (FIFA World Cup 2026) মিলিয়ে দেখা যায়। কেউ ছোট নেই। যাদের তুমি ছোট বলে পশ্চাতে টানছ, সে তোমাকে পয়েন্ট তালিকায় পশ্চাতে ফেলে দেবে। কুরাসাও, কেপ ভার্দে, ডিআর কঙ্গোর মতো দেশগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্য তৈরি। বিশ্বকাপে কি অঘটন হয় না? হয় তো। প্রত্যেকবারই হয়। কিন্তু এভাবে এতগুলো দেশের চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা এর আগে কবে ঘটেছে? আরেকটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা দরকার। এবারের বিশ্বকাপ ৪৮টি দলের। গতবারের থেকে ১৬টি বেশি দল। তাতে প্রশ্ন উঠেছিল, আমেরিকা-মেক্সিকো-কানাডায় কি আদৌ ততটা প্রতিযোগিতা দেখা যাবে? কিন্তু ফুটবলের মজা এটাই। খাতায়-কলমের সমস্ত পরিকল্পনা সবুজ ঘাসে বিলীন করে দেওয়া কাজ। 'পিছড়েবর্গে'র দেশগুলো সেটা গত ১০ দিনে প্রমাণ করে দিয়েছে।

Advertisement

কয়েনের দু'টো পিঠ থাকে। একদিকে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল-স্পেন-ফ্রান্সের মতো দলগুলো বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে নামে। অন্তত সেমিফাইনালে না গেলে সেটাই তাদের ব্যর্থতা। আবার আছে 'লাস্ট বয়'রা। তাদের থেকে কারও কোনও প্রত্যাশা নেই। দুয়েকটা চমক দিলেও ক্ষতি নেই! এমনকী এই দেশগুলোর দর্শকরাও হয়তো খুব বেশি চাহিদা নিয়ে খেলা দেখতে বসেন না। বিশ্বকাপ একটা উৎসব। তাতে অংশগ্রহণ করাটাও অনেক। নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজেদের ইতিহাস সকলের কাছে বলার সুযোগ থাকে। কিন্তু ব্যাপারটা শুধু সেখানে থেমে থাকে না। বড় দলগুলোর লড়াই থাকে নিজেদের দাপট দেখানোর, আর ছোট দলগুলোর থাকে নিজেকে প্রমাণ করার পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় পাস করলে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার সুযোগ। শেষ পর্যন্ত নায়ক হয়ে ওঠেন একজন। সেই নামটা বদলাতেই পারে। তবে কোনও বিশেষ ফুটবলার নয়, দিনের শেষে লোকে মনে রাখবে সেই দেশের লড়াকু মানসিকতার কথা।

পর্তুগালকে আটকে দেওয়ার পর ডিআর কঙ্গো

ধরা যাক ভোজিনহার কথা। কেপ ভার্দের গোলকিপারের নাম এখন মুখে-মুখে ঘুরছে। ৪০ বছর বয়সে মহাশক্তিধর স্পেনের সামনে ৭টা সেভ করে প্রাচীর হয়ে উঠেছিলেন। আচ্ছা, যদি সেদিন ভোজিনহা নায়ক না হতেন? যদি সুযোগ পেতেন রিজার্ভ বেঞ্চের কোনও গোলকিপার? কিংবা শেষ মুহূর্তে গোললাইন সেভ করতেন কোনও ডিফেন্ডার। গল্পটা একই থাকত, শুধু মূল চরিত্র বদলে যেত। তাতে বিরাট কোনও ক্ষতি হত না। এই পারফরম্যান্স থেকে ভোজিনহার ব্যক্তিগত কেরিয়ারে বড় কোনও উন্নতি হবে না। কিন্তু তাঁর নাম অমর হয়ে থাকবে। জার্মানির কাছে ৭ গোল খেয়েছিল কুরাসাও। তারপর ড্র করেছে এবারের বিশ্বকাপের ডার্ক হর্স ইকুয়েডরের সঙ্গে। ১৫টি সেভ করে রেকর্ড গড়েছেন এলয় রুম। কিংবা বলা যায় ডিআর কঙ্গোর কথা। হট ফেভারিট পর্তুগালকে আটকে দিয়েছে তারা। গোল করেছে ইয়োনে উইসা। বিশেষ কোনও প্লেয়ারের নাম হয়তো মনেও থাকবে না। কঙ্গো পরের রাউন্ডে যাবে কি না, সেটাও সময় বলবে। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোদের বিরুদ্ধে এগারো ও পরে বদলি পাঁচজনের অসম লড়াইয়ের জন্য সমান পয়েন্ট পকেটে ভরেছে তারা।

বিশ্বকাপে ইরান

এটা কোনও বিশেষ প্লেয়ারের গল্প নয়। প্রত্যেকটা দেশের ইতিহাসও একরকম নয়। কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা মাত্র দেড় লক্ষ। দেশটা আয়তনে কলকাতার থেকেও ছোট। কোনও প্লেয়ারই সেই দেশে জন্মগ্রহণ করেনি। অর্থাৎ, সব প্লেয়ারই বিদেশি বংশোদ্ভূত। প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ভরাডুবির পর কেঁদে ফেলেছিলেন কোচ ডিক অ্যাডভোকেট। বিমান ভাড়াও নিজের পকেট থেকেই দিতেন কুরাসাওয়ের কোচ। কেপ ভার্দে আবার ফুটবলার খুঁজেছিল লিংকডইনে। ৫ লক্ষ জনতার দেশ কাপ অফ নেশনসে ঘানাকে হারিয়েছে, মিশরের সঙ্গে ড্র করেছিল। শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের লড়াই থামে। ফলে বিশ্বকাপে তারা যা করছে, তা পুরোপুরি চমক নয়। ইবোলার সঙ্গে লড়াই করছে ডিআর কঙ্গো, দারিদ্র্যসীমায় বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ দেশের তালিকায়। হাইতিতে চলছে গ্যাংওয়ার, যুদ্ধে বিধ্বস্ত ইরান। তার মধ্যেও বিশ্বকাপের তাদের পারফরম্যান্স হাসি ফোটাচ্ছে দেশবাসীর মুখে।

কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনহা।

এই লড়াকু মানসিকতার নেপথ্যে বিশ্বকাপের একটা অঙ্কও আছে। ৪৮ দেশের বিশ্বকাপ নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। কিন্তু এবার ৩২টা দেশ পরের রাউন্ডে যাবে। গ্রুপ পর্ব থেকে প্রথম দু'টো দল তো যাবেই। সেই সঙ্গে ১২টি গ্রুপের তৃতীয় স্থানে শেষ করা দলগুলোর মধ্যে পয়েন্ট তালিকায় প্রথম ছয়ে থাকা দেশগুলোও পরের রাউন্ডে যাবে। অর্থাৎ নিজেদের প্রমাণ করার একটা বাড়তি সুযোগ। সহজ হিসেব- দু'টো ম্যাচ কষ্ট করে ড্র করো, আরেকটা ম্যাচ জেতার জন্য সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপাও। রাউন্ড অফ ৩২ নিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। ছবিটা আরও বড় করে দেখা যেতে পারে। যেমন জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯৮ সালে জাপান খুব খারাপ পারফর্ম করেছিল। কিন্তু তারপর ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করেছে। লক্ষ্য স্থির রেখেছে। ২০২২-এ জার্মানি, স্পেনকে হারিয়েছে। এবারও যে কোনও দলকে হারিয়ে দিতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়াও যথেষ্ট শক্তিশালী। একটা সাফল্য দেশের ফুটবল মানচিত্র বদলে দিতে পারে। কেউ সুবিধা নিতে পেরেছে, কেউ পারেনি। সেটা সেই দেশের পরিকল্পনা ও বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কোনও দেশকে আর 'ছোট' ভাবলে ভুল করা হবে। তাই, প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের কাছে ড্র করাতেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মাত্র ৪৫ মিনিটের জন্য হলেও লামিনে ইয়ামালকে নামাতে বাধ্য হন স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। চমক নয়, তারাও বিশ্বকাপে সমকক্ষতা দাবি করছে।

কুরাসাওয়ের গোলকিপার এলয় রুম।

এটাই হয়তো জীবনের দর্শন। ছোট জীবন, ছোট আশা-ভরসা। বহু লড়াই করেও স্বপ্নপূরণ হয় না। মানুষ অপেক্ষা করে একটা মিরাকলের। কেপ ভার্দে, ডিআর কঙ্গোরা সেই লড়াইয়ের প্রতীক। ওই জন্যই চায়, মহাশক্তিধর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তারা জিতুক। জীবনের সংগ্রামে মানুষও তো 'ছোট' থাকতে চায় না। অথচ 'বড়'ও হয়ে উঠতে পারছে না। ওই যে শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, 'আসলে কেউ বড় হয় না, বড়র মত দেখায়'। ফুটবল বিশ্বকাপের এই 'লিলিপুট' দেশের লড়াই মানুষকে ৯০ মিনিটের জন্য নিজেদের ছায়ার থেকেও বড় করে দেয়। সেটুকুই প্রাপ্তি।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement