সুদীপ বসু: গভীর রাত। তাঁবুর ভিতরে এক কোণে একটি ছোট চেয়ার-টেবিল। হ্যারিকেনের ম্লান আলোয় চেয়ারে বসে একজন যুবক টেবিলে ঝুঁকে মন দিয়ে হিসাব মেলাচ্ছেন। সারা দিনে কত ত্রাণসামগ্রী এল, কত বিলি হল, কোন কোন এলাকায় কাল পৌঁছতে হবে ত্রাণ নিয়ে– এসবের তালিকা প্রস্তুত করছেন।
বন্যা-কবলিত অঞ্চলে ত্রাণকার্যের জন্য তাঁবু ফেলা হয়েছে অবিভক্ত বাংলার সান্তাহার রেল স্টেশনের পাশে এক উঁচু জমিতে। স্থানটি বগুড়া ও রাজশাহী জেলার সীমান্তে। শরৎকাল। ১৯২২ সালের অক্টোবর। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে শুরু হওয়া ভয়াবহ বন্যায় উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত। বাড়ি-ঘর নিশ্চিহ্ন হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে। পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী আর রংপুর জেলার নদীগুলি বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছে সমস্ত গ্রাম জনপদ, রাস্তা আর খেতখামার। রেললাইন দুমড়ে-মুচড়ে দ।
কলকাতা থেকে আগত সেই যুবকটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য কিছু দিন আগেই কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন সম্প্রতি। ভোর থেকেই শুরু হয়ে যায় তাঁর পরিশ্রম আর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন– ত্রাণকার্যে আত্মনিয়োগ– বন্যাপীড়িত মানুষদের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের উদ্ধার করা। তারপর গভীর রাত পর্যন্ত হিসাব মেলানো আর পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা।
এই কাজের জন্য যে ‘বেঙ্গল রিলিফ কমিটি’ গঠিত হয়েছে তার সভাপতি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নির্দেশেই যুবকটির উপর দেওয়া হয়েছে সমগ্র ত্রাণকার্য পরিচালনার দায়িত্ব। আচার্য জানতেন, এই কাজ সুষ্ঠু ও যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে তাঁর সহপাঠী জানকীনাথ বসুর পুত্র সুভাষচন্দ্রর থেকে যোগ্যতর আর কেউ নেই। সুভাষ ছিলেন ‘বেঙ্গল রিলিফ কমিটি’-র সেক্রেটারি। কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ চৌধুরী, নীলরতন সরকার, চিত্তরঞ্জন দাশ, জি. ডি. বিড়লা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেডি ক্রাফর্ড প্রমুখ।
প্রফুল্লচন্দ্রর আহ্বানে সারা দেশ থেকে প্রভূত অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী আসতে লাগল। সান্তাহার স্টেশনে এসে পৌঁছতে লাগল সেসব। ৫ লক্ষ টাকা সংগৃহীত হয়েছিল। ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহের ভার ছিল ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’-এর পরিচালক এবং প্রফুল্লচন্দ্রর ঘনিষ্ঠতম সহযোগী সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তর উপর। ত্রাণকার্যে সুভাষচন্দ্রর অবিস্মরণীয় ভূমিকা বর্ণিত হয়েছে গোপাললাল সান্যাল রচিত ‘যে কথার শেষ নেই’ বইয়ে (শঙ্করীপ্রসাদ বসু ‘সমকালীন ভারতে সুভাষচন্দ্র’-র প্রথম খণ্ডে এই বই থেকে সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গে উদ্ধৃতি দিয়েছেন)।
গোপাললাল লিখেছেন– দীর্ঘ দু’মাস সুভাষচন্দ্র ওই এক তাঁবুতে, একখানি ক্ষুদ্র তক্তপোষে, দুখানি মোটা কম্বল সম্বল ক’রে রাত কাটিয়েছেন। ওই তাঁবুর আর এক প্রান্তে আর একখানি তক্তপোষে আর দু’জন স্বেচ্ছাসেবকও রাত্রিবাস করতেন। সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১/১২টা, আবার বিকেল ৪টে থেকে রাত ১০/১১টা পর্যন্ত মালপত্র আনা-নেওয়া ও বিভিন্ন কেন্দ্রে বিতরণের হিসেব-নিকেশ করতেন। রাত্রে সুভাষচন্দ্রের টেবিলের আলো নিবত কি না, প্রত্যুষে কখন-বা আবার সে আলো জ্বেলে তাঁর টেবিলে রাখা হতো, কেউ তা জানে না। কোন্ প্রত্যুষে যে তিনি আবার কাজে নিমগ্ন হতেন, তা কি কেউ দেখেছেন। তারপর আহার। ভোরবেলার কাজ শেষে ৬টা নাগাদ একবার উঠে তিনি দাঁড়াতেন গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের লাইনে।... সুভাষচন্দ্র খেতেন শেষ দলে, অর্থাৎ বেলা ১টার পরে।... ভাত, একটা ডাল, তরকারী– না-মাছ, না-মাংস, না-ডিম। রাত্রেও একই মেনু। তবে ভাতের বদলে রুটি।
ভাইফোঁটার দিন বগুড়ার এক জমিদারবাড়ি থেকে বাঁকে বাঁকে অঢেল মিষ্টি ও খাদ্যসামগ্রী আসে ত্রাণে নিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য। সবাই তা গ্রহণও করে, এক সুভাষচন্দ্র ছাড়া। তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে আমি ভোজ খেতে আসিনি’। ত্রাণে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের মনোসংযোগ, নিয়মশৃঙ্খলা ও শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে সুভাষচন্দ্র তাদের কুচকাওয়াজ করাতেন। তাঁর কাজের আর-একটি বর্ণনা কালীচরণ ঘোষ-রচিত ‘A Saint Turns Patriot’ (Netaji, His Life and Works. Edited by Shri Ram Sharma) শীর্ষক নিবন্ধে বর্ণিত আছে।
কালীচরণ লিখছেন– বিশ্রাম বলে কোনো কিছু তিনি জানতেন না। কখনো উদ্দীপনা হ্রাস পায়নি। বিপজ্জনক জায়গায় যাবার সময়ে তিনি সর্বাগ্রে থাকতেন, তবেই অপরকে সে জায়গায় যেতে আহ্বান করতেন। তাঁর দৃষ্টান্ত সহকর্মীদের মধ্যে প্রেরণাসৃষ্টি করেছিল– যাঁদের অধিকাংশই তরুণ, অনভিজ্ঞ, এই কঠিন যন্ত্রণাদায়ক কাজের জন্য যে শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রয়োজন, তা তাঁদের ছিল না।... বাধার সম্মুখীন হবার ক্ষমতা সুভাষের ছিল এবং অসাধারণ সংগঠনশক্তি।... নৌকা ক’রে এ-জায়গা থেকে সে-জায়গায় হাজির হতেন, সহকর্মীদের সঙ্গে এক মুঠো যা জুটত তাই খেতেন দ্বিরুক্তি না ক’রে। কাজের খুঁটিনাটির সন্ধান রাখতেন, অসময়ে হঠাৎ হাজির হয়ে দেখতে চাইতেন যাঁর উপর কাজের ভার, তিনি সে-কাজ ঠিকভাবে করছেন কিনা।
যে নিষ্ঠা পরিশ্রম ও কষ্ট সহ্য করে সুভাষচন্দ্র স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে এই ত্রাণকার্য সাফল্যের সঙ্গে চালিয়ে গিয়েছিলেন তার প্রশংসা, এমনকী, বাংলার তৎকালীন গভর্নর জেনারেলও করতে বাধ্য হন। এরই মাঝে মাঝে তাঁর রাজনৈতিক গুরু ‘দেশবন্ধু’ চিত্তরঞ্জন দাশ বারবার তারবার্তা পাঠিয়ে কলকাতায় ডেকে পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু বন্যাপীড়িত মানুষদের স্বার্থে সুভাষচন্দ্র কলকাতা ফিরে যেতে পারছিলেন না। তিনি প্রফুল্লচন্দ্রকে ওই সমস্ত তারবার্তা পাঠিয়ে অনুরোধ করেন যেন তিনি এ ব্যাপারে চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে কথা বলে নেন– যাতে ‘দেশবন্ধু’ আরও কিছু দিন তাঁকে সান্তাহারে থেকে যাওয়া বিষয়টা অনুমোদন করেন।
প্রফুল্লচন্দ্র অবশ্য চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে কোনও আলোচনায় জড়াননি। তিনি সোজা সান্তাহারে চলে আসেন ঘনিষ্ঠতম সহযোগী সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তকে নিয়ে। সতীশের উপর ত্রাণকার্য পরিচালনার ভার ন্যস্ত করে সুভাষকে সেই কাজ থেকে অব্যাহতি দেন। সান্তাহার স্টেশনে নেমেই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র পরম স্নেহে সুভাষচন্দ্রকে আলিঙ্গন করে বলেন– এসো সুভাষ, কাছে এসো। তুমি জানকীনাথের ছেলে– আমারও ছেলে। জানকী ও আমি একসঙ্গে পড়েছি, দু’জনে একসঙ্গে ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন দেখেছি, আয় একবার তোকে কোলে করি।
প্রায় দু’-মাস ধরে বন্যাকবলিত অঞ্চলের ত্রাণকার্য পরিচালনা করা ও তাতে প্রত্যক্ষ অংশ নেওয়ার সময় সুভাষচন্দ্রকে কাদাজলে হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়ে এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় যেতে হত। সে-যাত্রা ছিল দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। চর্মরোগ আক্রান্ত হন। যা নিরাময় হতে অনেকটা সময় লেগেছিল। রোগ সেরে যাওয়ার পরও দুই হাঁটু বরাবরের দাগ রয়ে যায়। এ যেন সুভাষচন্দ্রর দেশপ্রেমের চিহ্ন! পায়ের উপর এই দাগ সুভাষ বহন করেছিলেন আজীবন– যেমনটা করেছিলেন ভারতকে। বুকের ভিতর। আজীবন।
তথ্যসূত্র
১. ‘সমকালীন ভারতে সুভাষচন্দ্র’, প্রথম খণ্ড। শঙ্করীপ্রসাদ বসু
২. ‘রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র’। নেপাল মজুমদার
