মারামারি বা ভাঙচুর নয়, র্যাগিং থেকে শুরু করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন- এই সমাজ-সংসারে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে গুন্ডামি। দমন করবে কে?
খুদে গুন্ডার দস্যিপনা আমাদের বেশ লাগে। কিন্তু সে যদি বড় হয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে ভাঙচুর, মারামারি করে, অবাধ্য হয় তখন তাকে কড়া শাসনে রাখতে হয়। স্কুল-কলেজে এরকম কিছু পড়ুয়া থাকে, যার অপেক্ষাকৃত কমজোর, শান্তশিষ্ট সতীর্থদের উপর ছড়ি ঘোরায়। এদেরই অত্যাচার ক্রমশ রাগিংয়ের রূপ নেয়। র্যাগিং এক মারাত্মক রকমের গুন্ডামি, যার ব্যাপ্তি শারীরিক থেকে মানসিক অত্যাচারে। যার থেকে নিস্তার না পেয়ে অনেক ছাত্র আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। বিশেষ করে কোনও কোনও ছাত্র পরিবার থেকে দূরে নিঃসঙ্গ হোস্টেল-জীবনে যখন র্যাগিংয়ের শিকার হয়, তাদের বিপন্নতা অকল্পনীয়।
সমাজ-সংসারের বিভিন্ন স্তরে পরতে-পরতে ছড়িয়ে আছে বহুমাত্রিক গুন্ডামি, দস্যিপনা, বেপরোয়া অত্যাচারের বিকৃত আনন্দ। স্বয়ং প্লেটো যখন তাঁর 'রিপাবলিক' বইয়ে ঘোষণা করলেন, তাঁর 'আদর্শ' রাজত্বে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, চিন্তকের কোনও স্থান নেই, তিনি তাঁর স্বপ্নের স্বর্গরাজ্য থেকে নির্বাসনে পাঠালেন সৃজনশীল মানুষকে, কেননা তারা বিপজ্জনক। সেটাও কি নয় এক ধরনের গুন্ডামি। মানসিক পীড়ন। ইন্টেলেকচুয়াল লুণ্ঠন? অন্যায় শাসন? এবং ত্রাসের রাজত্ব।
সমাজ-সংসারের বিভিন্ন স্তরে পরতে-পরতে ছড়িয়ে আছে বহুমাত্রিক গুন্ডামি, দস্যিপনা, বেপরোয়া অত্যাচারের বিকৃত আনন্দ।
এমনই শাসকদের গুন্ডামির কথা লিখে গিয়েছেন মিলান কুন্দেরা তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। যখন রাশিয়ান সৈনিকরা দখল নিল চেকোস্লোভাকিয়ার, তারা বলল সেই দেশের সাধারণ মানুষকে, তোমাদের অতীত আমরা কিনে নিলাম এবং তোমাদের উপহার দিলাম এক ভাবনাচিন্তাহীন ভবিষ্যৎ। তোমরা ভাকনাচিন্তা বন্ধ করো। সর্ব বিষয়ে মতামত দেওয়া বন্ধ করো। সরকারের কথা শুনে মুখ বুজে কাজ করে যাও। খাওয়া পরার অভাব হবে না। মিলান কুন্দের বললেন, আমি লেখক, আমি নিজের মতো না-ভেবে, না-লিখে, না-প্রতিবাদ করে তো থাকতেই পারব না। তাঁকে বিতাড়িত হতে হল নিজের 'চেক' ভাষা থেকে, নিজের সংস্কৃতি থেকে, নিজের দেশ থেকে। তিনি প্যারিসে থাকলেন এবং ফরাসি ভাষায় লিখতে বাধ্য হলেন সারা জীবন। তিনিও কি নন একরকমের রাজনৈতিক গুড়ামির শিকার।
মানুষের অন্তহীন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী কবি ছিলেন পি. বি. শেলি। তিনি বিশ্বাসই করতেন না পুলিশি শাসনে। তিনি লিখলেন- কবিরাই আদর্শ শাসক শাসক এবং তাঁরা-ই হবেন ভবিষ্যতের আইনপ্রণেতা। এবং কবিদের তৈরি আদর্শ রাজত্বে থাকবে না কোনও কয়েদ, কোনও পুলিশ। কিন্তু এই শেলিকে, ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও, বিতাড়িত হতে হয়েছিল, সেই সময়ের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কেননা তিনি লিখেছিলেন 'নাস্তিকতার প্রয়োজন' নামে খ্রিস্টান ধর্ম-বিরোধী প্রবন্ধ। সেই সময়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে গেলে নাস্তিকতার সমর্থনে একটিও কথা বলা যেত না। এও কি নয় এক ধরনের গুন্ডামি, যার পিছনে অন্ধকার বিশ্বাস ছাড়া আর কিছু নেই!
