কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারগুলিকে খুশি করতে তৈরি করে 'কস্তুরীরঙ্গন কমিটি', যা গ্যাডগিল রিপোর্টের পরামর্শসমূহকে অনেকটা হালকা, কিছুটা বাতিল করে দিল। তিনি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে গিয়ে ক্ষেত্রসমীক্ষা দ্বারা সাহায্য করলেন প্রান্তিক মানুষদের জীবন ও জীবিকার লড়াইকে তাদের পরিবেশবান্ধব যাপনে। স্থানীয় মারাঠি পত্রিকায় নিয়ম করে লিখতে থাকলেন মাসিক কলাম। লিখছেন গৌতম সাহা এবং সুলগ্না সাহা
'আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস' সুযোগ করে দেয়- একমাত্রিক উন্নয়নের বিপরীতে যাঁরা জল, জঙ্গল, জমি এবং তার সঙ্গে যুক্ত প্রান্তিক মানুষদের রক্ষার কথা বলেন, 'বিকল্প' উন্নয়নের রূপরেখা দেন- তাঁদেরকে জানার। এমনই একজন পরিবেশবিদ সদ্যপ্রয়াত ড. মাধব গ্যাডগিল। যাঁকে কেরলম থেকে উত্তরাখণ্ড। দেশের প্রতিটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরে সাধারণ মানুষ স্মরণ করেছে তাঁর ঈশ্বরসম অগ্রিম সতর্কবার্তার কথা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক পরিবেশবিদ্যায় ('Mathematical Ecology') পিএইচডি, পরে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ ছেড়ে এসে কীভাবে এই মারাঠি যুবক হয়ে উঠলেন ভারতীয় পরিবেশ বিজ্ঞানের প্রধান পুরুষ, কীভাবে ভারতের অরণ্য, পাহাড়, নদী, সমুদ্র, মরুভূমি আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষকে জানলেন নিবিড় ক্ষেত্রসমীক্ষায়, হয়ে উঠলেন তাদের কণ্ঠস্বর- ড. মাধব গ্যাডগিলের জীবন তারই আশ্চর্য দলিল।
১৯৪২ সালে পুনেয় জন্ম। বাবা বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ধনঞ্জয় গ্যাডগিল। কীভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে সৃষ্ট অর্থ প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষদের নাগালের বাইরে চলে যায়, আর প্রকৃতিও রিক্ত হয়ে যায়- সেই পাঠ বাবার থেকে পাওয়া। স্কুলজীবনেই বিশ্বখ্যাত পক্ষীবিশারদ সেলিম আলির পরিচয়। ওঁর কাছ থেকে কিশোর মাধব পেয়েছিলেন ক্ষেত্রসমীক্ষার (field study) নিবিড় পাঠ। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার পরে জীববিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও পরিবেশবিদ্যার মেধাবী ছাত্র মাধব দেশের মানুষ, প্রকৃতি ও ক্ষেত্রসমীক্ষার উপর ভালবাসার টানে সস্ত্রীক চলে আসেন ভারতে।
স্ত্রী সুলোচনা হার্ভার্ডের পিএইচডি, বিখ্যাত আবহাওয়াবিদ। কিছু দিন পুনের 'আগারকার রিসার্চ ফাউন্ডেশন'-এ কাজ করার পর ড. গ্যাডগিল ১৯৭৩ সালে যোগ দেন 'ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স', বেঙ্গালুরুতে। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয় 'সেন্টার ফর ইকোলজিকাল সায়েন্সেস', যা ভারতের পরিবেশ বিজ্ঞান গবেষণার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। পরিবেশবিদ্যার তাত্ত্বিক গবেষণার উপর বিশ্ববিখ্যাত গবেষণাপত্রের লেখক হলেও নিবিড় ক্ষেত্রসমীক্ষার জন্য হেঁটেছেন হিমালয় থেকে পশ্চিমঘাট, নাগাল্যান্ড থেকে থর মরুভূমি। ভালবেসেছেন পিঁপড়ে, প্রজাপতি থেকে তিমি, শ্যাওলা থেকে পাইন-সহ জীবনের সমস্ত চাক্ষিক প্রাকৃতিক রূপকে। আর প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রকৃতির সংরক্ষণে তাদের ভূমিকাকে বড় করে দেখেছেন।
মাধব গ্যাডগিলের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ২০১১ সালের পশ্চিমঘাট পর্বতের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কিত রিপোর্ট। কমিটির চেয়ারম্যান রূপে ড. গ্যাডগিল পশ্চিমঘাট পর্বতের ৬৪ শতাংশ অঞ্চলকে 'দুর্ঘটনাপ্রবণ' ও 'সংবেদনশীল' ঘোষণা করলেন।
এই দর্শন থেকে তাঁর নেতৃত্বে বাস্তুতন্ত্র রক্ষার্থে কেরলমের কুণ্ঠিপুঝা নদীর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হয়েছে 'সাইলেন্ট ভ্যালি জাতীয় পার্ক'। কর্নাটকের বন্দিপুরের বাঁশবন স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধির উপায় হয়েছে। কর্পোরেটকে সঞ্জয় বাঁশ জোগান দেওয়ার অহেতুক অনুদান বন্ধ হয়েছে। লাগামছাড়া উন্নয়নকে বাস্তুতন্ত্রের কাছে থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। শক্ত-শক্ত কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। নীলগিরি পর্বতে ভারতের প্রথম জীবমণ্ডল সংরক্ষণ (Biosphere Reserve) কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। ভারতের অরণ্যের স্থানীয় অধিবাসীদের ঐশ্বরিক বিশ্বাসকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে অরণ্য সংরক্ষণকে পরিবেশবিদ্যা গবেষণার মূল স্রোতে আনা হয়েছে। তিনি ভারত সরকারের পরিবেশ সংক্রান্ত উপদেষ্টা হিসাবে ২০০২ সালে ভারতের 'জৈবিক বৈচিত্র 'আইন' (The Biological Diversity Act) প্রণয়নে সার্থক ভূমিকা নেন। পরিবেশ শিক্ষাকে স্কুল পাঠ্যের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য পাঠ্যক্রম তৈরিতে নেতৃত্ব দেন।
মাধব গ্যাডগিলের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ২০১১ সালের পশ্চিমঘাট পর্বতের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কিত রিপোর্ট। কমিটির চেয়ারম্যান রূপে ড. গ্যাডগিল পশ্চিমঘাট পর্বতের ৬৪ শতাংশ অঞ্চলকে 'দুর্ঘটনাপ্রবণ' ও 'সংবেদনশীল' ঘোষণা করলেন।
৭টি বিশ্ববিখ্যাত বই, ২০০-র বেশি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে গবেষণাপত্রের লেখক, 'আইআইএস' ছাড়াও স্ট্যানফোর্ড, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক ডক্টর গ্যাডগিলকে কেরলম, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, গোয়া, তামিলনাড়ুর ডান, বাম, মধ্যপন্থী সব সরকারই অবাস্তব ও 'উন্নয়নের শত্রু' বলে দাগিয়ে দিলেন। ডক্টর গ্যাডগিল নির্বিকার রইলেন। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র 'গণশত্রু'-র (১৯৮৯) ডাক্তারবাবুর মতোই তিনি পূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে দৃঢ়ভাবে বললেন, আমাদের রিপোর্ট 'বৈজ্ঞানিক সত্য', তার 'রাজনৈতিকভাবে সত্য' হওয়ার কোনও দায় নেই।
পশ্চিমঘাটের সংরক্ষণের জন্য এই অঞ্চলে বড় বাঁধ-খনন 'নিষিদ্ধ' করে, স্থানীয় মানুষ-নির্ভর পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পথটি শিরোধার্য করেন। এতে পশ্চিমঘাট পর্বতের গায়ে লাগা রাজ্যগুলির খনি, রিয়েল এস্টেট, পাহাড় থেকে পাথরকাটা ব্যবসায়ীরা রুষ্ট হয়। ৭টি বিশ্ববিখ্যাত বই, ২০০-র বেশি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে গবেষণাপত্রের লেখক, 'আইআইএস' ছাড়াও স্ট্যানফোর্ড, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক ডক্টর গ্যাডগিলকে কেরলম, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, গোয়া, তামিলনাড়ুর ডান, বাম, মধ্যপন্থী সব সরকারই অবাস্তব ও 'উন্নয়নের শত্রু' বলে দাগিয়ে দিলেন। ডক্টর গ্যাডগিল নির্বিকার রইলেন। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র 'গণশত্রু'-র (১৯৮৯) ডাক্তারবাবুর মতোই তিনি পূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে দৃঢ়ভাবে বললেন, আমাদের রিপোর্ট 'বৈজ্ঞানিক সত্য', তার 'রাজনৈতিকভাবে সত্য' হওয়ার কোনও দায় নেই।
কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারগুলিকে খুশি করতে তৈরি করে 'কস্তুরীরঙ্গন কমিটি', যা গ্যাডগিল রিপোর্টের পরামর্শসমূহকে অনেকটা হালকা, কিছুটা বাতিল করে দিল। তিনি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে গিয়ে ক্ষেত্রসমীক্ষা দ্বারা সাহায্য করলেন প্রান্তিক মানুষদের জীবন ও জীবিকার লড়াইকে তাদের পরিবেশবান্ধব যাপনে। স্থানীয় মারাঠি পত্রিকায় নিয়ম করে লিখতে থাকলেন মাসিক কলাম। আর যখনই সুযোগ পেলেন, উন্নয়নের 'ভুল' দিশাকে প্রশ্ন করতে থাকলেন। ২০১৮ সালে, কেরলমের ওয়ানাডে, বিধ্বংসী বন্যায় সবচেয়ে ভূমিধ্বস ঘটেছিল ২০১১ সালে প্রকাশিত মাধব গ্যাডগিল রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লিখিত পরিবেশগতভাবে অতি সংবেদনশীল অঞ্চলে। তখন বিশেষজ্ঞ মহল নড়েচড়ে বসে। বলা হতে থাকে, গ্যাডগিল রিপোর্টের মেনে চললে হয়তো হয়তো ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের। ৮০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যেত। সাম্প্রতিক সময়পর্বে পশ্চিমঘাট পর্বতের সন্নিহিত অংশে প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই গ্যাডগিল রিপোর্টের বৈজ্ঞানিক সত্য কম-বেশি প্রমাণ করেছে।
ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহের সঙ্গে লিখেছিলেন ভারতীয় পরিবেশচর্চার ইতিহাস, যা এক প্রামাণ্য দলিল। তাঁরই অনুপ্রেরণায় ড. গ্যাডগিল ২০২৩ সালে লেখেন আত্মজীবনী 'A Walk Up the Hill: Living With People and Nature', যা অনূদিত হয়েছে বাংলা-সহ ৭টি ভারতীয় ভাষায়। ছাত্রজীবনে পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাথলেটিক্স রেকর্ডধারী ড. গ্যাডগিল ৭০ বছর বয়সেও ক্ষেত্রসমীক্ষার জন্য হাঁটার দৌড়ে অল্পবয়সি ছাত্র, গবেষকদের হারিয়ে দিতেন অনায়াসে।
ড. গ্যাডগিলের আর-একটি বিশেষত্ব সহ-গবেষক, ছাত্রদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশা, কখনও নিজের মত বা জ্ঞান চাপিয়ে দিতেন না তাদের উপর। তাঁর ছত্রছায়ায় জীনতত্ত্ববিদ শরৎচন্দ্র, উদ্ভিদবিদ ফাদার সেসিল সালদানার মতো অসংখ্য পরিবেশবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক তৈরি হয়েছেন, যাঁরা এখন মানবকেন্দ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। গ্যাডগিল সমালোচিত হয়েছেন, সম্মানও পেয়েছেন বিস্তর। তাঁর পাওয়া অসংখ্য পুরস্কারের মধ্যে অন্যতম-পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার, ইউনাইটেড নেশনসের দেওয়া 'চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ' পুরস্কার, হার্ভার্ড সেন্টেনারি মেডেল। প্রকৃতিপ্রেমী ড. গ্যাডগিলের নামে ২০২১ সালে পানাকাড জেলার নেলিয়ামপাথি পর্বতের একটি বৃক্ষ প্রজাতির নামকরণ করা হয় 'Elaeocarpus gadgili'। মাধব গ্যাডগিলের জীবন এই দৃঢ় বিশ্বাস দেয় যে, নিজ-আদর্শকে ক্ষমতার কাছে বিকিয়ে না দিয়েও প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমরা পালন করতে পারি। এমনকী, দুঃসময়েও।
(মতামত নিজস্ব)
লেখকদ্বয় বিজ্ঞানী
