shono
Advertisement
Swami Vivekananda

তিনি আত্মস্থ করার বিষয়, 'জেনজি'-র আইকন বিবেকানন্দ?

স্বামীজিকে নিয়ে ভারতীয় ‘জেনজি’-র উপলব্ধি ঠিক কী, তা নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ’ গত বছর একটি সার্ভে ও সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক সমীক্ষা প্রকাশ করে। সেই সমীক্ষা মিশ্র প্রতিক্রিয়াবহুল। বিবেকানন্দর প্রতি অবজ্ঞা নেই, কিন্তু ‘আইকন’ জ্ঞানে মাতামাতিও নেই। 
Published By: Kishore GhoshPosted: 06:11 PM Jan 12, 2026Updated: 07:12 PM Jan 12, 2026

শাহরুখ খান, বিরাট কোহলি, অরিজিৎ সিং, স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)। একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ পার করে আসা যুবকদের সামনে এই চারটি নাম রেখে দিলে ‘ইয়ুথ আইকন’ হিসাবে তারা কাকে বেছে নেবে? উত্তরে মতান্তর হতে পারে। তবে আবেগতড়িত বা নীতিবাগীশ না হয়ে একটা ধারণা করে নেওয়া যায়, যিনি সবথেকে কম ভোট পাবেন, তঁার নাম সম্ভবত স্বামী বিবেকানন্দ।

Advertisement

যুবশক্তি-ই জাতির উন্নতির চালিকাশক্তি– স্বামীজির এই ভাবনাকে মেরুদণ্ড করেই ১৯৮৪ সাল থেকে তাঁর জন্মদিন, ১২ জানুয়ারি, ‘জাতীয় যুব দিবস’ রূপে পালিত হয়ে আসছে। আত্মনির্ভরতা, আত্মশক্তি, শিক্ষার গুরুত্ব এবং মানবসেবা নিয়ে তাঁর ধ্যানধারণা ও মতামত এখনও সমান প্রাসঙ্গিক, বলা বাহুল‌্য। কিন্তু হালের বৃহত্তর যুবসমাজের কাছে তাঁকে এককথায় ‘আইকন’ বলে মেনে দেওয়া সহজ নয়। তিনি যুবমানসে আছেন, কিন্তু অন্তরালে; তেমন যেন প্রকট-প্রত্যক্ষ নন। প্রচ্ছন্ন শ্রদ্ধায় অস্বীকার নেই, কিন্তু ব্যক্তিপুজোর আড়ম্বরও নেই।

অথচ, স্বামীজির বাণীর সারবস্তু ‘জেনজি’-র জন্যই তো সবথেকে প্রাসঙ্গিক। দিন-প্রতিদিন যে সামাজিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের তারা সম্মুখীন, তার মুখোমুখি হয়েও হেরে না-যাওয়ার নিদান। আত্মবিশ্বাস এবং অধ্যবসায়ের পাঠ। ‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া’– ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছনো পর্যন্ত থেমো না। ‘কঠোপনিষদ’-এর এই বাণী স্বামীজি যুবসমাজকে তাদের সুপ্ত সম্ভাবনা উপলব্ধি করাতে, তাদের উদ্বুদ্ধ করতেই ব্যবহার করেছিলেন।

যুবশক্তি-ই জাতির উন্নতির চালিকাশক্তি– স্বামীজির এই ভাবনাকে মেরুদণ্ড করেই ১৯৮৪ সাল থেকে তাঁর জন্মদিন, ১২ জানুয়ারি, ‘জাতীয় যুব দিবস’ রূপে পালিত হয়ে আসছে।

বিবিধ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে ব‌্যস্ত, কেরিয়ার তৈরির লড়াইয়ে নু‌্যব্জ, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সন্দিহান, তবু নিজস্ব সত্তা ও ব‌্যক্তিত্ব গড়ে তোলায় অবিরাম প্রয়াসী– এই ‘কাল্ট’ বৈশিষ্ট‌্যসম্পন্ন জেনজি-দের যেন চিনতেন স্বামীজি। যেন আগে থেকেই জানতেন, ২০৩০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক কর্মশক্তির ২৭ শতাংশ ভারতীয় যুবকদের দখলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। তাই তঁার বার্তায় বস্তুবাদের গণ্ডি পেরিয়ে নৈতিক যাপন, আত্মোন্নয়ন এবং উদ্ভাবনের সুস্পষ্ট আরজি। সমগ্র পৃথিবী এখন অনুভব করছে: স্রেফ জমকালো পেশা নয়– চরিত্রগঠন, লিঙ্গ-সাম্যে আস্থাশীল হওয়া, এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষানীতির সংস্কারের প্রয়োজন।

স্বামী বিবেকানন্দ উনিশ শতকে দাঁড়িয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে আত্মিক মূল্যবোধের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ‘মানুষ গড়া’-র সেই শিক্ষাটির পক্ষেই সওয়াল করে গিয়েছিলেন অনবরত। সেই শিক্ষা যা দেহ, চরিত্র ও মেধার বিকাশ ঘটাবে।

ভূ-রাজনৈতিক কারণে ক্ষমতার টানাপোড়েন, বিপর্যস্ত জলবায়ু, সোশাল মিডিয়াজাত বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং সার্বিক সামাজিক-রাজনৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জেরে পৃথিবীজুড়েই এক অস্থির অবস্থা তৈরি হয়ে আছে। তার নিরিখে জীবনের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দঁাড়িয়ে বর্তমান জেনজি। এই পরিস্থিতিতে স্বামীজি-ঘোষিত ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক সংহতি, ধর্ম-জাতপাত-সম্প্রদায় নির্বিশেষে ‘সেবা’ এবং আত্মিক শান্তির বার্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে: দেশের জেন জি-র মধ্যে আধ্যাত্মিকতার প্রতি ঝোঁক বেড়েছে। শ্রীশ্রীরবিশঙ্কর বা সদগুরুর মতো ব্যক্তিত্বের নিয়মিত এবং আগ্রহী অনুসরণকারীদের মধ্যে যুবক-যুবতীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে তাদের রেকর্ড ভিড়। ভক্তিগীতির জেনজি সংস্করণ ‘ভজন ক্লাবিং’-এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, কিন্তু বাস্তবে একাকিত্বের শিকার এই প্রজন্মের কাছে সনাতন ধর্মের এই যে আধুনিক বিবর্তন, সেখানেও তো স্বামীজির অপ্রত্যক্ষ ছায়া।

তবুও এখনকার যুবসমাজে কাছে, বিশেষ করে নাগরিক সভ্যতা এবং বিশ্বায়নে প্রভাবিতদের কাছে– তিনি ততটাও আরাধ‌্য নন, যতটা রুপোলি পর্দা, মাঠ-ময়দান বা পপ কালচারের ব্যক্তিত্বরা। এমনকী, যে-যুবক বা যুবতীটি নিয়মিত সদগুরুর নৈতিক, আধ্যাত্মিক অথবা জীবনশৈলীর বাণী শুনতে ভালবাসে, সে-ও স্বামীজির লেখা বই নেড়েচেড়ে দেখতে ততটা আগ্রহী নয়।

সাধারণ মানুষের কাছে তিনি অবিসংবাদীভাবে পূজ্য। কিন্তু সার্বিকভাবে জেনজি-র ‘আত্মার আত্মীয়’ কেন নন, তার কিছু কারণ বেশ সহজ।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালে ‘এআই’-সৃষ্ট স্বামীজির অসংখ‌্য ছবি ও ভিডিও ‘ভাইরাল’ হয়।
তবে তাতে আধুনিক প্রজন্মের যে আগ্রহের প্রকাশ দেখা গিয়েছিল, তা গভীর এবং স্থায়ী ভক্তি-শ্রদ্ধা থেকে নয়, বরং নতুনত্বের স্বাদ আস্বাদন হেতু। স্বামীজিকে নিয়ে ভারতীয় জেনজি-র উপলব্ধি ঠিক কী, তা নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ’ গত বছর এক সার্ভে ও সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক সমীক্ষা প্রকাশ করে। সেই সমীক্ষা মিশ্র প্রতিক্রিয়াবহুল। দেখা যাচ্ছে, প্রত্যেকেই স্বামীজির প্রতি কম-বেশি শ্রদ্ধাশীল। অনেকেই তঁার শিকাগোর ভাষণ এবং বাণীতে মোহিত। অনেকে আবার তঁাকে চেনে সাধু-সন্ন্যাসী গোত্রের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে। কারও কাছে তিনি স্রেফ ইতিহাসের এক চরিত্র। বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, তঁার প্রতি ‘জেনারেল’ অবজ্ঞা নেই, কিন্তু ‘আইকন’ জ্ঞান করে মাতামাতিও নেই।

সাধারণ মানুষের কাছে তিনি অবিসংবাদীভাবে পূজ্য। কিন্তু সার্বিকভাবে জেনজি-র ‘আত্মার আত্মীয়’ কেন নন, তার কিছু কারণ বেশ সহজ। স্বামীজির ধ্যানধারণা অতি আধুনিক, সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৬২ বছর আগে ভূমিষ্ঠ ব্যক্তির বক্তব‌্য প্রকাশের ভাব, ভাষা, ভঙ্গি ও উপমার ব্যবহার দ্রুতলয়ের জীবনযাপন আর মিম-প্রভাবিত মানসিকতার কাছে খানিক ‘সেকেলে’। আরও একটি অন্তরায়– স্বামীজির মুখনিঃসৃত জীবনদর্শন শোনার উপায় নেই। তঁাকে চেনার ভরসা বিভিন্ন লেখকের বই, যার অধিকাংশের ভাষাই এই প্রজন্মের পক্ষে যথেষ্ট প্রাঞ্জল নয়। জেনজি তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টিতে বিশ্বাসী। তারা কয়েক মিনিটের রিল্‌সে বা পারস্পরিক আদানপ্রদানভিত্তিক পডকাস্টে বিনোদন ও ভাবনার খোরাক খোঁজে, দীর্ঘ দার্শনিক ভাষণের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ধৈর্য তাদের নেই।

স্কুল-কলেজের বইয়ে ‘বিবেকানন্দ’ তাই তাদের কাছে কেবল মুখস্থ করার একটা চ্যাপ্টার হয়েই রয়ে যায়, তাঁর বাণী থেকে যায় দেওয়ালে বা ব্যানারে লেখা কিছু ভারী-ভারী শব্দে, বা বড়জোর ক‌্যালেন্ডার, টি শার্ট ও কফি মাগে। প্রকৃত মানসিক নৈকট্য আর তৈরি হয় না। উদ্ভাবনী শৌর্যের জন্য ইল্‌ন মাস্ক বা ক্ষমতায়নের জন্য টেলর সুইফ্‌ট-ই তাদের ‘আইকন’ হয়ে ওঠেন, দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো এই যুবাদরদি নন।

প্রজন্মের ফারাক অবশ্যই বড় কারণ। বিবেকানন্দর সময়কালের মূল সমস্যা ছিল ঔপনিবেশিকতা এবং আধ্যাত্মিক নবজাগরণ। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভরশীল যুব সম্প্রদায় সামাজিক একাকিত্ব থেকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন। তাছাড়া, সব যুবক-যুবতীই আত্মিক চেতনায় অনুরণিত নয়, অনেকেই নাস্তিক বা আধ্যাত্মবাদে উদাসীন।

সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সম্পর্কপ্রসূত বিভিন্নরকম চাপ সামলে এবং জীবিকার সংস্থান করে টিকে থাকার লড়াইয়ে জেরবার অধিকাংশের কাছেই এসব বিষয়ে মাথা ঘামানো আদতে বিলাসিতা। স্বামীজি ছিলেন সম্মিলিত জীবনযাপনের আমল। আর, হালের যুব সম্প্রদায় ‘ইন্ডিভিজুয়ালিজম্‌’ যুগের বাসিন্দা। মূলত নিজেকে ঘিরেই তাদের পৃথিবী।

তাই স্বামীজি আর জেনজি-র বন্ধুত্ব করাতে তাঁর সীমাহীন গুণাবলিতে যুবসমাজকে প্রভাবিত করতে– তাঁকে যুগোপযোগী করে উপস্থাপিত করতে হবে। বলা যেতে পারে, আদর্শ পুরুষটির ভাবনাচিন্তার ‘রি-প্যাকেজিং’ প্রয়োজন। এখনকার যুব সম্প্রদায় যেভাবে স্বামীজিকে পেতে চায় সেইভাবেই দিতে হবে– প্রয়োজনে এআই, রিল্‌স, পডকাস্টের মাধ্যমে। আরও সরল করে।
তিনি তো মুখস্থ করার নয়, আত্মস্থ করার বিষয়।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
chiranjibray67@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement