shono
Advertisement
Kolkata Metro

মেট্রো রেলে নিত্য ভোগান্তি, বাংলা বলেই এত ঔদাসীন্য! মাননীয় রেলমন্ত্রী, শুনছেন?

মেট্রোয় বাদুড়ঝোলা ভিড় হলে মেট্রোয় চড়ে লাভ কি? দিনের-পর-দিন কেন কলকাতা মেট্রোকে নাবালক ও অশক্ত করে রাখা?
Published By: Biswadip DeyPosted: 01:57 PM Jan 23, 2026Updated: 02:01 PM Jan 23, 2026

মেট্রো রেলে কিছু না কিছু সমস্যা লেগেই আছে প্রায় রোজ। কখনও রেক খারাপ, কখনও আত্মহত্যা, কখনও বিদ্যুৎ বিভ্রাট, কখনও মেট্রো দেরিতে আসছে, কখনও মেট্রো সংখ্যা কম। বাংলা বলেই কি এত অবজ্ঞা? এত ঔদাসীন্য? লিখছেন আদিত্য ঘোষ

Advertisement

আতঙ্কের অন্য নাম কলকাতা মেট্রো! বিগত দু’-চার মাসে কলকাতা মেট্রো সম্পর্কে যত খবর হয়েছে, সেই সংখ্যক খবর ভারতের আর কোনও মেট্রোকে নিয়ে হয়নি। হয়তো হবেও না। বিশ্বাস না হলে একটু সার্চ করে দেখে নিতে পারেন। তিলোত্তমার ‘লাইফলাইন’ এখন সঠিক পরিকাঠামোর অভাবে যেন-বা ধঁুকছে। অফিসের সময়ে মেট্রো বিভ্রাট হওয়া এখন জলভাত। কিছু-না-কিছু সমস্যা রোজ লেগেই আছে। কখনও রেক খারাপ, কেউ আত্মহত্যা করছে, কখনও বিদ্যুৎ বিভ্রাট, কখনও মেট্রো দেরিতে আসছে, কখনও মেট্রো সংখ্যা কম! কখনও আবার মেট্রো মাঝপথে দঁাড়িয়ে গিয়েছে অজানা কারণে। মেট্রো লাইন দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাত্রীরা বেরিয়েছেন, এমন চিত্রও উঠে এসেছে। এরই মাঝে হাসি মুখে ‘বন্দে ভারত’ উদ্বোধন হয়েছে, রেলমন্ত্রী বহুবার বাংলায় এসেছেন। কিন্তু মেট্রো-ছবি বদলায়নি। বাংলা বলেই কি অবজ্ঞা? এত ঔদাসীন্য?

বিগত দু’-সপ্তাহের কলকাতা মেট্রো সংক্রান্ত খবর খুঁজতে গিয়ে চোখে সরষেফুল দেখার জোগাড়। এত খবর? অথচ দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু মেট্রো বিভ্রাট নিয়ে সাম্প্রতিক কোনও খবর চোখে পড়বে না। কারণটা খুব সহজ। পরিকাঠামোগত উন্নতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে ওই শহরগুলির মেট্রো পরিষেবা ঝকঝকে। সেই তুলনায় কলকাতা মেট্রো দেশের প্রথম মেট্রো পরিষেবা হয়েও, দায়িত্বহীনতার অভাবে মুমূর্ষু। কলকাতা মেট্রো দেশের প্রাচীনতম মেট্রো ব্যবস্থা। নর্থ-সাউথ করিডরের বড় অংশে সিগনালিং, ট্র্যাক ও বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যবস্থা এখনও কয়েক দশক আগের প্রযুক্তির উপর দঁাড়িয়ে।

মেট্রো লাইন দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাত্রীরা বেরিয়েছেন, এমন চিত্রও উঠে এসেছে। এরই মাঝে হাসি মুখে ‘বন্দে ভারত’ উদ্বোধন হয়েছে, রেলমন্ত্রী বহুবার বাংলায় এসেছেন। কিন্তু মেট্রো-ছবি বদলায়নি।

নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হলেও এই কাঠামো এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য বৈদ্যুতিক তারতম্য, সিগন্যালের যান্ত্রিক ত্রুটি বড় ধরনের পরিষেবা ব্যাহত করতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যাত্রীসংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। যে-লাইনের পরিকল্পনা হয়েছিল বহু বছর আগে, তখনকার শহরের চাহিদা আর হালের কলকাতার যাতায়াতের চাপ এক নয়। ভিড়ের সময়ে পরিকল্পিত যাত্রীসংখ্যার অনেক বেশি যাত্রী ওঠার ফলে রেকের দরজা, ব্রেক, এয়ারকন্ডিশনিং ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। একই লাইনে পুরনো ও নতুন প্রযুক্তির রেক একসঙ্গে চালানোর ফলে আরও জটিল হয়ে উঠেছে পরিষেবা।

উপরন্তু, লাইনের মধ্যে ‘বিকল্প’ চলাচল ব্যবস্থা না-থাকায় একটি রেক বা একটি সিগন্যাল পয়েন্টে সমস্যা হলেই তার প্রভাব সারা লাইনে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে অল্প সমস্যাও বড় ভোগান্তিতে পরিণত হয়। প্রায় সারাদিন পরিষেবা চালু থাকায় রাতে ট্র্যাক, সিগনালিং ও পাওয়ার লাইনের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ও সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায় না। ছোটখাটো ত্রুটি সময়মতো ধরা পড়ে না, এবং তা পরে আচমকা বড় সমস্যার রূপ নেয়।

গত অর্থবর্ষে, অর্থাৎ ২০২৪-’২৫ সালে, কলকাতার মেট্রো বিভিন্ন চলমান ও নির্মীয়মাণ প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় বাজেটে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। সরকারি তথ্য ও বাজেট-পরবর্তী প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, শুধুমাত্র ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো করিডরের জন্যই ওই বছরে প্রায় ৯০০ কোটির বেশি টাকা বরাদ্দ করা হয়। পাশাপাশি, নিউ গড়িয়া-এয়ারপোর্ট মেট্রো প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১,৭০০-১,৮০০ কোটি টাকা, জোকা-এসপ্ল্যানেড প্রকল্পের জন্য ধরা হয়েছিল আনুমানিক ১,২০০ কোটি টাকার বেশি।

একই লাইনে পুরনো ও নতুন প্রযুক্তির রেক একসঙ্গে চালানোর ফলে আরও জটিল হয়ে উঠেছে পরিষেবা। উপরন্তু, লাইনের মধ্যে ‘বিকল্প’ চলাচল ব্যবস্থা না-থাকায় একটি রেক বা একটি সিগন্যাল পয়েন্টে সমস্যা হলেই তার প্রভাব সারা লাইনে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে অল্প সমস্যাও বড় ভোগান্তিতে পরিণত হয়।

সব মিলিয়ে ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে কলকাতা মেট্রোর বিভিন্ন করিডোর ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে মোট কয়েক হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ ছিল, যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় যথেষ্ট বেশি। কিন্তু আদতে সেই বাজেট কতটা কাজে লেগেছে, প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যাত্রীসুরক্ষা নিয়েও। কলকাতা মেট্রো সম্প্রসারণ হলেও পরিষেবা এখনও অথৈ জলে। দুর্যোগ এবং দুর্ভোগকে সঙ্গী করা কলকাতা মেট্রো কি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নজরে আসে না?

কলকাতা মেট্রোর বাইরে দেশের অধিকাংশ আধুনিক মেট্রোব্যবস্থায় এমন কিছু প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনার সুবিধা রয়েছে, যা কলকাতায় এখনও সম্পূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি। উদাহরণ হিসাবে দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা মুম্বইয়ের নতুন মেট্রো লাইনে শুরু থেকেই আধুনিক সিগনালিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে ট্রেন চলাচল অনেক বেশি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত। এই প্রযুক্তির সাহায্যে ট্রেনের মধ্যে ব্যবধান কমানো যায়, এবং কোনও একটি জায়গায় ত্রুটি দেখা দিলেও পুরো লাইন ‘বন্ধ’ না করে সেকশনভিত্তিক ভাবে পরিষেবা চালু রাখা সম্ভব হয়, যা কলকাতা মেট্রোর পুরনো লাইনে কার্যত অসম্ভব।

এছাড়া দেশের অনেক মেট্রোতেই প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিনডোর, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা প্রযুক্তি চালু আছে। এর ফলে লাইনে ঝঁাপ, অননুমোদিত প্রবেশ বা হঠাৎ মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে। আধুনিক মেট্রোগুলোতে রিয়েল-টাইম মনিটরিং, পর্যাপ্ত রিজার্ভ রেক এবং নির্দিষ্ট সময়ের গভীর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও আগে থেকেই পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। ফলে কোনও রেক বা যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দিলেও পরিষেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না। এই আধুনিক কাঠামো ব্যবস্থার অভাবই কলকাতা মেট্রোকে অন্য শহরের মেট্রোগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রেখেছে।

বাংলার মাটি থেকে প্রথম স্লিপার ‘বন্দে ভারত’ উদ্বোধন হল। ইতিহাসের পাতায় স্থান পেল বাংলা। কিন্তু তাতে সাধারণ রেলযাত্রীর কী সুবিধা হল? মেট্রোয় বাদুড়ঝোলা ভিড় হলে মেট্রোয় চড়ে লাভ কি? দিনের-পর-দিন কেন কলকাতা মেট্রোকে নাবালক ও অশক্ত করে রাখা? মাঝেমধ্যে তো মেট্রো অ্যাপটিও কাজ করে না। মাননীয় রেলমন্ত্রী, শুনছেন?

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement