তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের উপর নজরদারি চালানো হয়েছে, এই মর্মে ব্রিটিশ রাজপুত্র হ্যারি আইনি যুদ্ধ হেঁকেছেন ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডের বিরুদ্ধে।
ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডের সঙ্গে ব্রিটেনের রাজপুত্র হ্যারির, ‘ডিউক অফ সাসেক্স’, আইনি লড়াই এখন তুঙ্গে। ‘অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার লিমিটেড (বা ‘এএনএল’)-এর অধীনে রয়েছে ‘ডেইলি মেল’, ‘মেল অন সানডে’, ‘ডেইলি মেল অনলাইন’। হ্যারির অভিযোগ, ‘এএনএল’-এর তরফে দীর্ঘ দিন ধরে তঁার ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি মারা হয়েছে তথ্যর জন্য। আইনি ভাষায়– ‘ক্লিয়ার, সিস্টেমেটিক অ্যান্ড সাসটেন্ড ইউজ অফ আনলফুল ইনফরমেশন গ্যাদারিং’। হ্যারির প্রতিটি পদক্ষেপ নাকি নজরে রাখা হয়েছিল ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত।
তঁার ফোনে আড়ি পাতা হত। কোথায় যাচ্ছেন বা কার সঙ্গে মিশছেন– তাও অলক্ষ্যে জরিপ চলত। এসব ‘খবর’ জনপরিসরে দেদারে বিকোয়। কারণ, ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্দরমহলের কথা জানার আগ্রহ আপৃথিবীর। সোজা কথায়, হ্যারির মতে, তঁার ব্যক্তিগত জীবনের খবর বেচে একটি গণমাধ্যম ব্যবসা করেছে, অথচ নিদারুণ মনস্তাত্ত্বিক চাপ ভোগ করতে হয়েছে তঁাকে। যে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে, সেখানে হ্যারির আইনজীবী বলেছেন– জীবনের নিভৃতি ও নিজস্বতা নষ্ট হতে দেখে হ্যারি ক্রমশ হয়ে উঠেছেন সন্দেহপ্রবণ, খিটখিটে। মানসিক বৈকল্য ঘিরে ধরেছে তঁাকে। ‘এএনএল’ বলা বাহুল্য এ অভিযোগ স্বীকার করেনি। এসব কথাকে ‘মনগড়া’ ও ‘শিশুসুলভ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
হ্যারির অভিযোগ, ‘এএনএল’-এর তরফে দীর্ঘ দিন ধরে তঁার ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি মারা হয়েছে তথ্যর জন্য। আইনি ভাষায়– ‘ক্লিয়ার, সিস্টেমেটিক অ্যান্ড সাসটেন্ড ইউজ অফ আনলফুল ইনফরমেশন গ্যাদারিং’।
কিন্তু এই ঘটনার আশ্রয়ে যে-ন্যারেটিভের দিকে আমাদের মনোযোগ ধাবিত হয়, সেটি বহু দিনের তর্ক। একজন সেলেবের জীবনের কতখানি তাঁর ‘ব্যক্তিগত’, এবং কতখানিই বা ‘জনপরিসরে’ নিবেদিত? সত্যজিৎ রায় যে ‘নায়ক’ অরিন্দমের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, বিখ্যাত হওয়ার পরে তার জীবনেও তো একই জ্বালা, একই সমস্যা, একই মোচড়-তোলা ব্যথা। সে পার্টিতে গেলে ‘খবর’ হয়ে যায়, পার্টিতে কারও সঙ্গে তক্কাতক্কি হলে তা তো আরও বেশি মুচমুচে খবর। পুরনো ‘বন্ধু’ দেখা করতে আসে। তার সঙ্গে অরিন্দম বেরিয়ে পড়ে গাড়ি নিয়ে। বন্ধুটি নিয়ে যায় তাকে– ধর্মঘট চলা একটি কারখানার সামনে। সেখানে শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে। অরিন্দমের বন্ধুটি শ্রমিক-নেতা। সে, অরিন্দমকে অনুরোধ করে, দু’-চার কথা বলার জন্য শ্রমিকদের উদ্দেশে্য। অরিন্দম ক্ষুণ্ণ হয়, রেগে যায়, বন্ধুর সঙ্গ ত্যাগ করে পত্রপাঠ সেখান থেকে চলে আসে। পুরস্কার নিতে সে দিল্লি যাচ্ছে। ট্রেনের কুপে রটে যায় মুহূর্তে খবরটি। এইভাবে অরিন্দমের ‘ব্যক্তিগত’ জীবন কখনওই ‘নেহাত’ ব্যক্তিগত হয়ে থাকে না। তা হয়ে ওঠে ‘পাবলিক’ ও পাঁচজনের।
সেখানে হ্যারির আইনজীবী বলেছেন– জীবনের নিভৃতি ও নিজস্বতা নষ্ট হতে দেখে হ্যারি ক্রমশ হয়ে উঠেছেন সন্দেহপ্রবণ, খিটখিটে। মানসিক বৈকল্য ঘিরে ধরেছে তঁাকে।
প্রতিনিয়ত অন্যের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলে মানসিক বৈকল্য তৈরি হতে বাধ্য। কিন্তু ‘সেলেব’ নির্মাণের যে সামাজিক মানদণ্ড, সেটি এই শর্তের দিকে ঝেঁাকা– সেলেবের জীবন সেলেবের নিজের নয়। যে অনুরাগীরা ‘সেলেব’ তৈরি করে, সেই অনুরাগীরাই সেলেবকে হাটের মাঝে নামিয়ে আনতে চায়। তাই ক্রাইসিসের নিরিখে– হ্যারির সঙ্গে অরিন্দমের কোনও তফাত নেই। এহেন গণ-ধাক্কা সামলানোর রাস্তা তঁাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।
