ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় ভূমি রাজস্ব নিশ্চিত করতে লর্ড কর্নওয়ালিস ‘পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট’ বা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ আইন চালু করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল, দেশের জমিদারদের খুশি ও অনুগত রেখে কোম্পানির কোষাগার ভরিয়ে তোলা, রাজস্ব আদায়ের অনিশ্চয়তা দূর করা। ১৭৯৩ সালে চালু হওয়া সেই আইন খারিজ হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার তিন বছর পর, জমিদারিপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। পাটিগণিতের সহজ হিসাবে আইনটি চালু ছিল ১৫০ বছরেরও বেশি। জমিদারেরা মোট খাজনার ১১ ভাগের ১ ভাগ নিজে রেখে ১০ ভাগ জমা দিতেন কোম্পানির ঘরে। বিজেপিকে আরও বহু বছর ক্ষমতাসীন রাখতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমনই এক পাকাপাকি বন্দোবস্ত করতে চাইছেন এবং সেজন্য কোমর কষছেন পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর ভোটের আগেই সংবিধান সংশোধন করতে। মোদির ইচ্ছাপূরণ হবে কিনা নির্ভর করছে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মর্জির উপর। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতির অর্থ ‘ইন্ডিয়া’-র দিকে হাত প্রসারিত করা। অর্থাৎ মোদির ভাসা-ডোবার চাবি বিরোধীদেরই হাতে।
মহিলা-প্রেমে গদগদ মোদি সরকার চাইছে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই ৩ বছর আগে পাস হওয়া মহিলা সংরক্ষণ আইন বলবৎ করতে। সহজ প্রশ্ন, এতে আপত্তির কীই-বা থাকতে পারে? আইন যখন তৈরিই, সর্বসম্মতিতে, তখন বলবৎ করায় অসুবিধা কোথায়? আপত্তিই-বা কেন?
উত্তর অবশ্য সরল নয়। কারণ, মোদি বর্তমান লোকসভার ৫৪৩ আসনের এক-তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ চাইছেন না– তিনি চাইছেন আসন বাড়িয়ে কাজ হাসিল করতে। সংসদে কোনও কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা সরকারের নেই। তারা তাই চেয়ে আছে বিরোধীদের দিকে। সেই চাহনি নিরীহ নয়। বিরোধীদের কাছে বিষয়টি তারা শঁাখের করাত করে তুলতে চাইছে। মানলে কেল্লা ফতে, না-মানলে বিরোধীদের ‘নারী-বিদ্বেষী’ বলে ভোটে ফায়দা তুলবে। সেই প্রচার শুরুও হয়েছে। কী করবে ‘ইন্ডিয়া’ জোট? ভোটের সামাল দেবে, না কি সরকারি চালের মোকাবিলা? ১৬ এপ্রিল থেকে ৩ দিনের অধিবেশন শুরু। মোকাবিলার ‘ব্লুপ্রিন্ট’ তৈরির ফুরসত কোথায়? পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর শিরে সংক্রান্তি। ভোট ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। প্রচার ছেড়ে ‘এমপি’-রা কী করে দিল্লি যাবেন? এ যে খুড়োর কল!
দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। এখানেও সেই ছল নব-রূপে হাজির! হাতে আরও সময় নিয়ে ধীরে-সুস্থে ‘এসআইআর’ করতে অসুবিধা কোথায় ছিল, সেই প্রশ্নের সদুত্তর জ্ঞানেশ কুমার যেমন এখনও দিতে পারেননি, তেমনই এক্ষেত্রেও উত্তরহীন মোদি সরকার। কেন ভোট চলাকালীন সংসদীয় অধিবেশন ডাকা হল, কেন হপ্তা দুয়েক অপেক্ষা করা হল না, কেনই-বা জনগণনা শেষ না করেই মহিলা আসন সংরক্ষণের এত তাগিদ, এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনও উত্তর সরকারের কাছে নেই।
মহিলা-প্রেমে গদগদ মোদি সরকার চাইছে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই ৩ বছর আগে পাস হওয়া মহিলা সংরক্ষণ আইন বলবৎ করতে। সহজ প্রশ্ন, এতে আপত্তির কীই-বা থাকতে পারে?
মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের কথা প্রথম ভেবেছিলেন রাজীব গান্ধী। পুরসভা ও পঞ্চায়েতে আসন সংরক্ষণে তিনি বিলও এনেছিলেন ১৯৮৭ সালে। যদিও রাজ্যসভায় তা পাস করানো যায়নি। সেই বিল ১৯৯২ সালে পাস হয় নরসিংহ রাওয়ের উদ্যোগে। লোকসভা ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের চেষ্টা শুরু ১৯৯৬ সাল থেকে। কিন্তু বারবার তা ভেস্তে গিয়েছে প্রধানত লোহিয়াপন্থী সমাজতন্ত্রীদের চাপে। বহু টালবাহানার পর শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে মোদি সরকারের উদ্যোগে বিলটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। সেই বিলেই বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভা ও বিধানসভার আসন বাড়ানো হবে। কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসে ‘ডিলিমিটেশন কমিশন’-এর রায় অনুযায়ী কেন্দ্র ও রাজ্যের পুনর্গঠিত আইনসভায় আসন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
সেই নিরিখে লোকসভা ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ
২০৩৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে চালু হওয়া অসম্ভব। কেননা, জনগণনা শেষ হবে ২০২৭ সালে। ‘ডিলিমিটেশন কমিশন’-এর কাজ শেষ হতে আরও অন্তত ২ বছর। তত দিনে ২০২৯ কাবার হয়ে যাবে। লোকসভার পরের ভোট ২০৩৪ সালে।
নরেন্দ্র মোদি অত অপেক্ষায় রাজি নন। তঁাকে ইতিহাসের অঙ্গ হতে হবে। সেজন্যই নতুন সংসদ ভবন তৈরি করেছেন যেখানে লোকসভায় বসতে পারবেন ৮৮৮ জন, রাজ্যসভায় ৩৮৪। প্রমাণ রাখতে হবে মহিলা ক্ষমতায়নের। সেই তাগিদ তঁাকে ধাবিত করছে ‘শর্টকাট’ রুট ধরে লক্ষ্যে পৌঁছতে। ১৬ এপ্রিল তাই ফের বসতে চলেছে সংসদ।
৩ দিনের জন্য। সফল হলে ক্ষমতায় থাকার ‘পাকাপাকি বন্দোবস্ত’-র টিকিট লাভ, না হলে বিরোধীদের নারী-বিদ্বেষী তকমা দিয়ে মহিলা সমর্থন নিশ্চিত করে ভোট বৈতরণী পার হবেন। এ যেন সেই ‘হেড আই উইন, টেল ইউ লুজ’।
সরকার জানে, জনগণনার ফলভিত্তিক লোকসভার আসন বাড়াতে গেলে দক্ষিণী রাজ্যগুলির বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, সেই ফরমুলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাফল্যের দরুন দক্ষিণের ৫ রাজ্যেই আসন বাড়বে নামমাত্র। তুলনায় হিন্দি বলয়ে আসন বাড়বে বিপুল। সমস্যার সমাধানে মোদির দাওয়াই, প্রতি রাজ্যের আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ করে বাড়ানো হবে। উত্তরপ্রদেশের ৮০ আসন বেড়ে হবে ১২০, বিহারের ৪০ বেড়ে হবে ৬০, পশ্চিমবঙ্গের ৪২ বেড়ে হবে ৬৩, কেরলমের ২০ হবে ৩০, তামিলনাড়ুর ৩৯ হবে ৫৯। মোদির ধারণা এতে কারও অভিযোগের অবকাশ থাকবে না। সবারই আসন বাড়বে সমহারে। এই ফরমুলায়
৫৪৩ সদস্য বিশিষ্ট লোকসভার বহর হবে ৮১৬। ওই বাড়তি আসন, অর্থাৎ ২৭৩, মোটামুটিভাবে লোকসভার এক-তৃতীয়াংশ। সেগুলিই সংরক্ষিত হবে মহিলাদের জন্য।
এই অঙ্কে দক্ষিণের রাজ্যগুলির মোট আসন বাড়বে ৬৬টি, হিন্দি বলয়ে ২০০। উত্তর-দক্ষিণের ফারাক তাতে আরও বাড়বে। মাস কয়েক আগে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিনের ডাকা সম্মেলনের গৃহীত প্রস্তাব ছিল লোকসভার আসন আরও ৩০ বছর অপরিবর্তিত থাকুক। উত্তরের রাজ্যগুলি এই সময় আরও ভালভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করুক। বিজেপির শরিক চন্দ্রবাবু নাইডু একটু ঘুরিয়ে রাজ্যবাসীদের জন্মহার বাড়াতে উৎসাহিত করেছেন। দুই বা তার বেশি সন্তান হলে ২৫ হাজার টাকা সহায়তা। সারার্থ, লোকসভায় সদস্য-অসাম্য তিনিও চান না।
মোদি ভাবছেন, তিনি থাকতে থাকতে হিন্দি বলয়ের আসন বাড়লে দক্ষিণের সাহায্য ছাড়াই বিজেপি দেশ শাসন করতে পারবে। তঁার মননে অন্য এক চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি চান, ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের সময় থেকেই ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি চালু করতে যাতে লোকসভার পাশাপাশি বিধানসভার ভোটও সেরে ফেলা যায়। আস্তিনে লুকনো এটি তঁার আরও এক তুরুপের তাস। সেই তাস খেলার আগে তিনি মহিলা সংরক্ষণ বিষয়টির ফয়সালা করতে চাইছেন।
নরেন্দ্র মোদি অত অপেক্ষায় রাজি নন। তাঁকে ইতিহাসের অঙ্গ হতে হবে। সেজন্যই নতুন সংসদ ভবন তৈরি করেছেন যেখানে লোকসভায় বসতে পারবেন ৮৮৮ জন, রাজ্যসভায় ৩৮৪।
কী করবে বিরোধীরা? কীভাবে তারা মোদিকে ঠেকাবে? এখনও সেই ছক স্পষ্ট নয়। ৫ রাজ্যের ভোট নিয়ে সবাই ব্যস্ত। সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার এখনও কোনও ইঙ্গিত সরকার দেয়নি। কংগ্রেস বলেছিল, ২৯ এপ্রিল ভোট মেটার পরেই সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হোক। সরকার গা করেনি। তাহলে?
এবার জনগণনার সঙ্গে জাত গণনাও হবে। কেউ কেউ মনে করছে, মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের এক-তৃতীয়াংশ ওবিসি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে চাপ সৃষ্টি করা দরকার। কিন্তু সেভাবে কি ছক বানচাল করা যাবে? সবচেয়ে বড় কথা, সংরক্ষণ করাই যখন লক্ষ্য ছিল, তখন ৩ বছর চুপটি করে বসে থেকে হঠাৎ কেন ‘ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে’ বলে জেগে ওঠা? তাও আবার ১৬ বছরের পুরনো জনগণনার হিসাবে?
অমরত্বের বাসনা অতি বিষম বস্তু। অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষায় নরেন্দ্র মোদি পাগলপ্রায়। মহিলা সংরক্ষণ নিশ্চিত হলে অপেক্ষায় থাকুন ‘এক দেশ এক ভোট’ ও ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ নামক ডাবল ধামাকার জন্য। মোদির ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ রুখতে কী করবে ‘ইন্ডিয়া’?
(মতামত নিজস্ব)
saumyabandyo@gmail.com
