shono
Advertisement
Oracle Layoffs

‘এআই’ অবকাঠামো নির্মাণে ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাই, জোগান ও খরচের ভারসাম্য থাকবে?

ওরাকলের এই সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক ব্যবসায়িক সমীকরণ। কোম্পানিটি এখন তার প্রচলিত ‘সার্ভিস-ভিত্তিক’ পরিচয় মুছে ফেলে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং’ বা পরিকাঠামো নির্মাণের মরীচিকার পিছু ছুটছে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 08:43 PM Apr 06, 2026Updated: 09:32 PM Apr 06, 2026

মার্কিন টেক সংস্থা ‘ওরাকল’ ইমেল মারফত ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে (Oracle Layoffs)। ‘এআই’ অবকাঠামো নির্মাণে কোম্পানি এবার বেশি করে মনোযোগী হবে। ভালো কথা। তবে ভুললে হবে না যে, ‘এআই’ শুধু উৎপাদন করতে পারে, ভোগী-সত্তা তার নেই। আর, যারা কিনতে পারে, সেই রক্তমাংসের মানুষের হাতে কাজ নেই। জোগান ও খরচের মৌলিক তত্ত্বের ভারসাম্য থাকবে তো? লিখেছেন সুজনকুমার দাস

Advertisement

প্রযুক্তির জয়গান গাইতে গিয়ে আমরা কি তবে মানবিকতার শেষ সলতেটুকু নিভিয়ে দিতে বসেছি? ‘ওরাকল’-এর ছাঁটাইয়ের ঘটনাটি কি অদূর অন্ধকার ভবিষ্যতের শুরুয়াত? সকাল ৬টার নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন একযোগে ৩০ হাজার কর্মীর ইনবক্সে একটি যান্ত্রিক ইমেল এসে পৌঁছয়, ‘আজ থেকে আপনাকে আর অফিসে আসতে হবে না’– তখন সেটি কেবল একটি কর্মসংস্থান হারানোর বার্তা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে একবিংশ শতাব্দীর কর্পোরেট বিশ্বাসঘাতকতার নির্মম দলিল।

ভারতের মতো দেশে যেখানে অন্তত ১২ হাজার মানুষ এই ইমেলের শিকার হয়েছেন, সেখানে এই সংকট কেবল অর্থনীতির নয়, বরং এক গভীর সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের চালচিত্র। যে-কর্মীরা বছরের পর বছর নিজেদের ঘাম ও শ্রম দিয়ে কোম্পানিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাঁদের বিদায় দেওয়া হল কোনও আলোচনা বা ন্যূনতম সৌজন্যবোধ ব্যতীত। একটি ডিজিটাল সিগনেচারের বিনিময়ে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে এভাবে পণ্য করে তোলা সম্ভবত আধুনিক পুঁজিবাদের সবচেয়ে কুৎসিত রূপ।

ভারতের মতো দেশে যেখানে অন্তত ১২ হাজার মানুষ এই ইমেলের শিকার হয়েছেন, সেখানে এই সংকট কেবল অর্থনীতির নয়, বরং এক গভীর সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের চালচিত্র।

ওরাকলের এই সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক ব্যবসায়িক সমীকরণ। কোম্পানিটি এখন তার প্রচলিত ‘সার্ভিস-ভিত্তিক’ পরিচয় মুছে ফেলে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং’ বা পরিকাঠামো নির্মাণের মরীচিকার পিছু ছুটছে। তাদের এই রূপান্তরের নেশা এতটাই তীব্র যে, প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করার ‘লক্ষ্যে’ ৩০ হাজার মানুষের ভবিষ্যৎকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতেও দ্বিধা নেই। এই বিশাল অর্থ এখন বিনিয়োগ করা হবে ডেটা সেন্টার ও এআই পরিকাঠামো নির্মাণে। অর্থাৎ, রক্তমাংসের মানুষের মগজের চেয়ে এখন সিলিকন চিপ আর সার্ভার rack-এর কদর ওরাকলের কাছে অনেক বেশি।

অথচ বিড়ম্বনার বিষয় হল, ১০৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ওরাকল যখন বার্কলেসের মতো সংস্থার কাছে ‘জাঙ্ক স্টেটাস’ বা দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তখন সেই ব্যর্থতার দায়ভার কিন্তু ল্যারি এলিসনের মতো কর্ণধারকে নিতে হয় না। দায় মেটাতে হয় সেই সাধারণ কর্মীদের, যারা হয়তো গত রাতেও ১৫ ঘণ্টা কাজ করে বাড়ি ফিরেছেন এই আশায় যে, তঁাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে এক ধরনের জুয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। ওরাকল বর্তমানে যে চিপ প্রযুক্তির পিছনে ছুটছে, তার বাজার অত্যন্ত অস্থির। তাদের এক সময়ের প্রধান মক্কেল ‘ওপেন এআই’ এখন এনভিডিয়ার দিকে হাত বাড়াচ্ছে।

চিপ প্রযুক্তিতে প্রতিদিন যে পরিবর্তন আসছে, তাতে আজ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যা তৈরি হচ্ছে, আগামী কাল তা সেকেলে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই অনিশ্চিত দৌড়ে টিকে থাকতে গিয়ে ওরাকল তার সবচেয়ে বড় সম্পদ– অভিজ্ঞ মানবসম্পদ ও কর্মীবাহিনীকেই বিসর্জন দিচ্ছে। শেয়ার বাজারের সাময়িক ঊর্ধ্বগতি বা ১৫ বছরের সর্বোচ্চ আয়ের পরিসংখ্যান হয়তো বিনিয়োগকারীদের তৃপ্ত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে ‘প্রতিভা’-র এই ‘অপচয়’ কোম্পানিকে শূন্যতার দিকেই ঠেলে দেবে। যে কোনও প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি কর্মীর আনুগত্য, কিন্তু ওরাকলের এই ডিজিটাল ছঁাটাইয়ের সংস্কৃতি সেই বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেছে।

​বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি কোম্পানির সমস্যা নয়, বরং পুরো আইটি সেক্টরের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সংকেত। আমরা এখন এক ‘অটোমেশন প্যারাডক্স’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগে কোম্পানিরা বড় বড় সফটওয়্যার বা ইআরপি-র জন্য মানুষের উপর নির্ভর করত।

এটি এমন এক ধরনের সফটওয়্যার যা একটি বড় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্ত কাজ (যেমন: হিসাবরক্ষণ, মানবসম্পদ বা এইচআর, সাপ্লাই চেন, এবং ইনভেন্টরি) এক জায়গায় পরিচালনা করতে সাহায্য করে। এখন এআইয়ের দাপটে সেই নির্ভরতা কমছে। গ্রাহকরা এখন আর চড়া সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে সফটওয়্যার কিনতে রাজি নন, তঁারা এআই দিয়ে নিজেদের কাজ নিজেরাই সেরে নিচ্ছেন। ফলে ওরাকলের মতো সংস্থা তাদের আয়ের উৎস হারাচ্ছে এবং মরিয়া হয়ে কর্মী কমিয়ে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। যেহেতু বিশ্বের আইটি মেধার বড় একটি অংশ ভারতে কাজ করে, তাই এই ভূরাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রথম বলি: আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারেরা। বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদের মতো শহরে যখন আবাসন বাজারে মন্দা দেখা দেয়, বা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় স্থবিরতা আসে, তখন বুঝতে হবে আইটি খাতের এই রক্তক্ষরণ কেবল অফিস কক্ষের ভিতরে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণের রান্নাঘর পর্যন্ত।

চিপ প্রযুক্তিতে প্রতিদিন যে পরিবর্তন আসছে, তাতে আজ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যা তৈরি হচ্ছে, আগামী কাল তা সেকেলে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

​২০২৬ সালে এসে এই সামগ্রিক চিত্রটি আমাদের অন্ধকার এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। ‘আমাজন’-এর ১৬ হাজার ছঁাটাই থেকে শুরু করে ‘সেলসফোর্স’ বা ‘পিন্টারেস্ট’-এর পথ অনুসরণ– সবই যেন অঘোষিত প্রতিযোগিতার অংশ। এমনকী, টিসিএসের মতো সংস্থাও যখন কর্মীসংখ্যা কমাতে বাধ্য হয়, তখন বুঝতে হবে– এই ঝড় কতটা প্রবল। সবচেয়ে মর্মান্তিক অবস্থা সেসব সিনিয়র পেশাদারদের, যারা গত দুই দশক ধরে এই শিল্পকে গড়ে তুলেছেন। ৫০ বছর বয়সে এসে যখন তঁাদের বলা হয় যে তারা ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে পড়েছেন, তখন সেই অপমান কেবল ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক সমষ্টিগত পরাজয়। নতুন প্রজন্মের কর্মীদের বলা হচ্ছে এআই শিখতে, অথচ যে এআই তাদের অগ্রজদের কর্মহীন করল, তাকে আপন করে নেওয়া এক ধরনের আত্মঘাতী লড়াইই তো!

ভাবা দরকার, আমরা আসলে কোন ধরনের প্রগতি চাইছি? প্রযুক্তির উৎকর্ষ যদি কেবল মানুষের বেকারত্ব আর অনিশ্চয়তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তবে সেই সভ্যতা কি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে? প্রযুক্তির পরিবর্তন, গ্লোবাল জিও-পলিটিক্স, তেলের মূল্যবৃদ্ধি বা মুদ্রাস্ফীতির দোহাই দিয়ে কর্মীর রক্ত চুষে খাওয়ার এই কর্পোরেট সংস্কৃতি কোম্পানিদের মজ্জায় মজ্জায়। ওরাকলের এই ছাঁটাই হওয়া

৩০ হাজার কর্মীর, মানুষের, পরিবারের কান্না হয়তো বড় বড় বিনিয়োগকারীর কানে পৌঁছবে না, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এটি এক অমানবিক দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে। প্রযুক্তির এই উন্মাদনায় যদি মানবিকতা হারিয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের হাতে কেবল যান্ত্রিক কিছু কাঠামোই পড়ে থাকবে, কোনও প্রাণ থাকবে না। শিল্প থেকে পরিষেবা, ব্যাঙ্ক থেকে সংবাদমাধ্যম– সব ক্ষেত্রেই এআই দক্ষতা, গতি এবং খরচ কমানোর যুক্তিতে মানুষের বিকল্প হয়ে উঠছে। কিন্তু এখানে এক গভীর প্রশ্ন উঠে আসে, যা অর্থনীতির মূলে আঘাত করে। এআইয়ের তো কোনও চাহিদা নেই। তার খিদে পায় না, সে বাজারে গিয়ে জামাকাপড় কেনে না, অসুস্থ হলে ওষুধ লাগে না, কিংবা বাস-ট্রামে চড়ে কোথাও যায় না। অর্থাৎ, সে উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু ভোগ করতে পারে না। অথচ পুঁজিবাদী অর্থনীতির মৌলিক চক্রটি দাঁড়িয়ে আছে উৎপাদন ও ভোগের ভারসাম্যের উপর।

যদি উৎপাদনের বড় অংশই এমন এক সত্তার হাতে চলে যায়, যার নিজস্ব কোনও ভোগক্ষমতা নেই, তাহলে প্রশ্নটা অনিবার্য–এই বিপুল পণ্য কিনবে কে? এই সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদ কি নিজের মুনাফার ক্ষুধায় একদিন নিজেকেই গ্রাস করবে?

(মতামত নিজস্ব)
লেখক অর্থনীতির অধ্যাপক
skdssc76@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement