মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনের ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে’ কার্যকর করতে সতৃষ্ণ, সচেষ্ট। তাঁর এই সদিচ্ছাকে আমরা স্বাগত জানাই। এমন উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়নি, তা নয়। তবে নানা কারণে ফলপ্রসূ হয়নি। এই কাজে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’-কে পুনরুজ্জীবিত করা দরকার, যোগ্য লোক নিয়োগ করে, যোগ্য লোককে যোগ্য কাজের দায়িত্ব দিয়ে। সেখানে দল-মত না দেখাই উচিত হবে। লিখছেন পবিত্র সরকার।
২০ জুলাই, ২০২৬। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন যে, আগামী
১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে পশ্চিমবাংলার সমস্ত সরকারি কাজ বাংলা ভাষায় হবে। আমি ইউটিউবে বিধানসভায় তাঁর ঘোষণাটি শুনলাম, যাতে তিনি বলছেন ওই তারিখ থেকে ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক কার্যকর করলাম’। শব্দপ্রয়োগ যাই হোক, ঘোষণাটির অর্থ স্পষ্ট এবং অভিনন্দনযোগ্য।
এই ঘোষণার নেপথ্যে যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও সমবায় মন্ত্রীর অনুপ্রেরণা আছে, সে-কথাও সরল প্রাণেই তিনি জানিয়েছেন। তা, অন্তর ও বাহির, যেখানকারই প্রেরণা থাক, এই ঘোষণাকে আমরা সাদরে অভ্যর্থনা জানাই।
অবশ্য, এ ধরনের ঘোষণার ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধানেই অষ্টম তফসিলের ভাষার অনেকগুলির আঞ্চলিক সরকারি ভাষার মর্যাদা স্বীকৃত হয়েছিল। স্বাধীনতার আগেই তো কংগ্রেস কমিটির প্রস্তাবে এই দাবি স্বীকার করা হয়েছিল, পরে পুরুলিয়া-মানভূমের বাংলা ভাষার আন্দোলনেও বাংলা ভাষার পক্ষে এই দাবি তোলা হয়েছিল। আর স্বাধীনতার পর থেকেই পশ্চিমবাংলার সরকারি কাজকর্মে ‘সর্বস্তরে’ বাংলা ভাষার প্রচলনের দাবি ওঠে। সরকার এ বিষয়ে কোনও সময়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানায়নি। দাবিটির ঔচিত্য মেনে নিয়েছে এবং ধীরে ধীরে তা করাও হবে এমন ইচ্ছা জানিয়েছে।
সব আমাদের মনে নেই, তালিকা করাও সম্ভব নয়, কিন্তু স্মরণে আসছে যে, আজ থেকে বছর ৬৫ আগে রবীন্দ্র শতবার্ষিকীর বছরে প্রয়াত সাহিত্যস্রষ্টা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা বিধান
পরিষদে এরকম একটি দাবি জানিয়েছিলেন, আর যত দূর মনে হয় বিধানসভায় এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছিল।
আকাদেমি একটি চমৎকার ‘প্রশাসনিক পরিভাষা’ তৈরি করে দিয়েছিল।
সেই তখন থেকেই পশ্চিমবাংলার সরকারি কাজে, ফাইলপত্র তৈরিতে, প্রান্তিকভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার শুরু হয়েছিল বলে মনে হয়। তবে, এ-কথা বলা যদি এখন অপরাধ না হয়, ‘আগের আগের’ সরকারের আমলেই অন্য দু’-একটি আঞ্চলিক ভাষাকে (সঁাওতালি, নেপালি) যেমন সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল– তেমনই সরকারি কাজে বাংলা ও সেসব সরকারি ভাষার ব্যবহার একটা অনুসরণযোগ্য নীতি হিসাবে গৃহীত হয়েছিল। এ ব্যাপারে কোনও কোনও উচ্চ পদাধিকারীর দ্বিধা বা উন্নাসিকতা ছিল বলে শোনা যায়, কিন্তু তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাঁদের অনেকেই বাংলা ফাইলে উৎসাহ দিতেন বলেই শুনেছি।
দু’-একটি কৌতুককর গল্পের সূত্রও আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছিল এই ব্যাপারে। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সরকারে একজন বড় পদাধিকারী ছিলেন নারায়ণন কৃষ্ণমূর্তি। তামিল, কিন্তু স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ভাল বাংলা শিখেছিলেন। নারায়ণন উৎসাহভরে সই করতেন বাংলায়, ‘না’ বলে, ‘নারায়ণন’-কে, সংক্ষেপে। তাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হত, অনেকে ভাবতেন তিনি ফাইলের প্রস্তাবটিকে নাকচ করে দিচ্ছেন। প্রধান সচিব নীতীশ সেনগুপ্ত ‘নী. সেনগুপ্ত’ বলে সই করতেন, প্রচুর মন্ত্রীও বাংলায় সই করতেন।
শুনেছি ফরওয়ার্ড ব্লকের মন্ত্রী কমল গুহ এ ব্যাপরে খুব নিষ্ঠা বজায় রাখতেন। যাই হোক, সরকারি কাজকর্ম বাংলায় একেবারে হচ্ছিল না, এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই। ওই সরকারের আমলে একটি ‘পরিভাষা সমিতি’-তে কাজ করেছেন স্বয়ং সুকুমার সেন, ক্ষুদিরাম দাস, নারায়ণ চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্ব। একটি স্থায়ী অনুবাদের সেলও ছিল। তার উপরে, ওই আমলে ১৯৮৬ সালের ২০ মে, ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’ প্রতিষ্ঠিত হয়, তারও একটি প্রধান কাজ– সরকারকে এসব বিষয়ে সাহায্য করা।
আকাদেমি একটি চমৎকার ‘প্রশাসনিক পরিভাষা’ তৈরি করে দিয়েছিল। অবশ্য এ ব্যাপারে আগেকার পূর্ব পাকিস্তান আর পরে বাংলাদেশের ‘বাংলা একাডেমি’ অনেক অনুসরণযোগ্য কাজ করে রেখেছিল। পরে, অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি মুখ্যমন্ত্রীকে সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া ইত্যাদিতে ব্যগ্রতা দেখালেও এ ধরনের কাজে আর উৎসাহ দেখায়নি। এমনকী, সেই সময়কার অভিধান, বানান-অভিধান ইত্যাদির মুদ্রণও বন্ধ করে দিয়েছিল।
২
‘সর্বস্তরে’ কথাটির অর্থ কী?
এর বহিঃসীমার কথা আগে বলি। রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের, ভারতের অন্য রাজ্যের বা বহির্বিশ্বের যেসব যোগাযোগ, তাতে বাংলা বা অন্য সরকারি ভাষার (সাঁওতালি, নেপালি, রাজবংশী ইত্যাদি) বদলে হিন্দি বা ইংরেজি ব্যবহার করতে হবে, তাতে কোনও বারণ নেই, থাকার কথাও নয়।
প্রথমত, মুখের যোগাযোগের, সংবাদমাধ্যমের, শিক্ষাদানের, বক্তৃতার ভাষা যেমন বাংলা বা সরকারি অন্য ভাষা হবে– তেমনই সরকারের নিজের কাজকর্মের লিখিত ফাইলপত্র যত দূর সম্ভব সরকারি ভাষায় লেখা হবে। জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগের মুদ্রিত যত উপায় আছে, সবই সরকারি ভাষায় মুদ্রিত হবে, এইটা একটা। সরকারি বিজ্ঞপ্তি, পুস্তিকা, পত্রপত্রিকা ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজের বাংলা পত্রিকা ছিল ‘পশ্চিমবঙ্গ’, তার সাঁওতালি রূপ ছিল ‘পছিম বঙ্গাল’। বা অন্যান্য দপ্তরের নিজের নিজের বাংলা পত্রিকা। যেমন ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ দফতর বা শিক্ষা দফতর তাদের নিজের বাংলা পত্রিকা বের করত। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন-ও একটি সুন্দর পত্রিকা বের করত, একসময় বইও প্রকাশ করেছে। সেগুলির ২০১১ সালের ‘পরিবর্তন’-এর পরে কী অবস্থা হয়েছিল, এখন কী অবস্থা, তা ঠিক জানি না।
বাংলার পুলিশ প্রশাসনে বাংলা ঠিক কতটা চালু হয়েছে, তার ফাইলপত্র বাংলায় লেখা হয় কি না। নতুন সরকারকে এদিকেও নজর দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের সঙ্গে সঙ্গে আইন আর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জড়িত। আইনের ব্যাপারে দলিল তৈরি বাংলা ভাষায় শুরু আগেই হয়েছিল, আর নিম্ন আদালতগুলিতে বিচারকদের রায়ও বোধ হয় বাংলায় বেশ খানিকটা চালু হয়েছিল। তবে বিচার একটি ‘সর্বভারতীয় ব্যবস্থা’ বলে অনেক সময় অবাঙালি বিচারকগণ, বিশেষত উচ্চ আদালতে, বাংলা বা অন্যান্য সরকারি ভাষায় রায় দিতে বা লিখতে পারেন না। সে সীমাবদ্ধতা আছে, তখন তার অনুবাদের ব্যবস্থা করতে হয়।
আমি জানি না, বাংলার পুলিশ প্রশাসনে বাংলা ঠিক কতটা চালু হয়েছে, তার ফাইলপত্র বাংলায় লেখা হয় কি না। নতুন সরকারকে এদিকেও নজর দিতে হবে বলে মনে হয়, কারণ দূরদূরান্তে সরকারের মুখ হল পুলিশ, এবং প্রজাবসতির মধ্যে যে-সরকারের অবস্থান তার একটি হল পুলিশ।
সেই সঙ্গে আছে ব্যাপক শিক্ষা-প্রশাসন। এই সঙ্গে জেলা আর মহকুমা, এমনকী ব্লক স্তরের প্রশাসনও জনসাধারণের কাছাকাছি সরকারি অস্তিত্ব, সেখানে বাংলা বা অন্যান্য সরকারি ভাষা কতটা ব্যবহৃত হয় সেদিকে ‘লক্ষ’ রাখতে হবে। যত দূর জানি, পঞ্চায়েতের নানা স্তরের প্রশাসনে বাংলা বা অন্য সরকারি ভাষারই ব্যবহার হওয়ার কথা। সরকারি দায়দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত যে ব্যাপক চিকিৎসা প্রশাসন, তাও জনসাধারণের স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, সেখানে বাংলা বা অন্য সরকারি ভাষার প্রয়োগ কতটা এগিয়ে নেওয়া যায়, তাও দেখতে হবে।
৩
মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘কার্যকর করলাম’। বলা বাহুল্য, তাঁর কথাপ্রয়োগকে আমরা একটি আন্তরিক সদিচ্ছার প্রকাশ রূপেই ধরে নিয়েছি। যে-সময় আছে, এই কাজের জন্য তাঁকে কতকগুলি ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথমত, সরকারি বিভাগগুলিকে– রাজধানী আর অঞ্চলের– প্রশাসন, আইন, নিরাপত্তা, শিক্ষা আর চিকিৎসা প্রশাসন সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে হবে যে, সমস্ত সরকারি নথিপত্রে বাংলার বা সরকারি ভাষার ব্যবহার আবশ্যক করতে হবে। তার জন্য যদি সরকারি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়, তারও ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্রশিক্ষণে স্বচ্ছন্দ সরল চলিত বাংলা লেখা, বানান, পরিভাষা ইত্যাদির সঙ্গে তাদের আরও ঘনিষ্ঠ পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। কঠিন পরিভাষার বদলে চেনা ইংরেজি পরিভাষা বাংলা বর্ণে লিখলেও কোনও ক্ষতি নেই।
ভাষার মর্যাদার একটি লক্ষণ হল– সেই ভাষার দৃশ্যমানতা; চোখে কতটা দেখি আমরা দেখি সে-ভাষাকে।
এই কাজে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’-কে পুনরুজ্জীবিত করা দরকার, যোগ্য লোক নিয়োগ করে, যোগ্য লোককে যোগ্য কাজের দায়িত্ব দিয়ে। সেখানে দল-মত না দেখাই উচিত হবে। একটি আকাদেমিই এ বিষয়ে সরকারকে যোগ্য সহায়তা করতে পারে। সরকারের অনুবাদ-ব্যবস্থা বা পরিভাষা নির্মাণেও আকাদেমির যোগ দিতে পারে। আর সর্বাঙ্গীণভাবে বাংলা শিক্ষাকে বা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে তার ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে তুলে আনতে হবে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করে। সরকারের ঘোষণা বাংলা ভাষার মর্যাদাসূচক নিশ্চয়ই, কিন্তু আগের আমলে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রসারে বাংলার যে-সংকোচ ঘটেছে, তার প্রতিবিধান করতে হবে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলিতে বাংলা পড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ভাষার মর্যাদার একটি লক্ষণ হল– সেই ভাষার দৃশ্যমানতা; চোখে কতটা দেখি আমরা দেখি সে-ভাষাকে। ছোটরা স্কুলে যেতে যেতে দোকানের নামপাটা পড়ে, অনেক বাংলা শব্দও শেখে। তাতে নিজেদের ভাষা দেখলে ভাবে আমার ভাষাটা আমার পৃথিবীর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আগের সরকার কলকাতা শহরের দোকানের নামপাটাগুলিতে বাংলা জুড়ে দেওয়ার
নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু তা একুশে-ফেব্রুয়ারি-উনিশে মে-র বাঙালিরাই মানে না। তারা নিছক বাঙালি মিষ্টির দোকানের নাম ‘সুইটস’ ছাড়া দেয় না, গয়নার দোকান হয় ‘জুয়েলারি হাউস’। এর মধ্যে বিপুল আলোর ঝলমলানি-সহ যেসব দোকান বাঙালিরা খুলছে, সবই দেখি ইংরেজি নাম। বাঙালি নিজের রাজভক্তি না বদলালে সরকারি ঘোষণায় কাজ হবে না। কলকাতা আন্তর্জাতিক শহর, তাতে ইংরেজি নাম আর নামপাটা থাকবেই, কিন্তু একপাশে বাংলারও একটু জায়গা হবে না, এটা কি কোনও কাজের কথা? আগের সরকারি ঘোষণায় তেমন কোনও কাজই হয়নি।
আমরা ১ সেপ্টেম্বরের সেই ঐন্দ্রজালিক দিনটির জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকব। জয় বাংলা ভাষা, জয় সকল মাতৃভাষা!
(মতামত নিজস্ব)
লেখক ভূতপূর্ব উপাচার্য রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়
pabitra37@gmail.com
