রাজস্থানের সরকারি স্কুলে প্রতিদিন সংবাদপত্র কিনে পড়াতে হবে পড়ুয়াদের, অন্তত ১০ মিনিট। খবর চিনতে ও সচেতনতা তৈরিতে মোক্ষম।
‘সংবাদ মূলত কাব্য’? এই প্রশ্নবোধক পরিসর হয়তো ভাবনার পরিধিকে আরও একটু ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করে। ‘সংবাদ’-এর কাজ সংযোগ ঘটানো। ‘কাব্য’-ও সংযোগ করতে চায়। তাহলে উভয়ের ‘উদ্দেশ্য’ এক হলেও মাত্রাগত যে ফারাকটি রয়ে যায়, তা বোধহয় রসের। রসোৎসারের তারতম্যেই কি ‘সংবাদ’ ও ‘কাব্য’ সমান্তরাল সরলরেখার মতো চলতে থাকে?
যুধিষ্ঠিরদের পুড়িয়ে মারার চক্রান্ত করছে দুর্যোধন। এ ঘটনা বারনাবত নগরের। কিন্তু মহামতি বিদুর ম্লেচ্ছ বা সাংকেতিক ভাষায় যুধিষ্ঠিরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। আগুন লাগানো হবে। পূর্বপ্রস্তুতি হিসাবে যদি মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খনন করে রাখা হয়, তাহলে সহজে রক্ষা পাওয়া যাবে।
পাণ্ডবরা সেইভাবে তৈরি হলেন। তারপর একটি বিশেষ দিনে কুন্তী ব্রাহ্মণভোজন করালেন। এক নিষাদ রমণী ও তাঁর পাঁচ ছেলেকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। অন্যরা খেয়েদেয়ে চলে গেলেও অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে এই নিষাদ রমণী ও তার ছেলেরা ফিরতে পারেননি। সকলে সুষুপ্ত হলে গভীর রাতে স্বগৃহে আগুন ধরিয়ে দিলেন ভীম। তারপর সুড়ঙ্গপথে পাণ্ডবরা নিষ্ক্রান্ত হলেন। নিষাদ রমণী ও তাঁর ছেলেরা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলেন। দুর্যোধন দূত মারফত সে-খবর পেয়ে অত্যন্ত হৃষ্টচিত্তে পাণ্ডবদের নামে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার আয়োজন করলেন।
এ গল্পে ‘সংবাদ’ দু’টি। এক) দুর্যোধনের তরফে আগুনে পুড়িয়ে মারা হতে পারে, তার আগাম আভাস, দুই) পাঁচ পুত্র-সহ এক নিষাদ রমণীর দেহাবশেষের খোঁজ পাওয়া, যা পাণ্ডব-সহ কুন্তীর মৃত্যুর পরোক্ষ প্রমাণ বহন করছে। কিন্তু কাব্যের দৃষ্টিতে দেখলে এখানে যেমন পাণ্ডবদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে, তেমনই মনে হতে থাকে, বারবার প্রাণঘাতী আক্রমণের মুখে পড়ে পাণ্ডবরা যেদিন প্রতিবিধানের পথে হাঁটবেন, সেদিন কুরুক্ষেত্র প্রাঙ্গণে ধর্মযুদ্ধর আয়োজন ঘটা ব্যতীত আর কীই বা ‘বিকল্প’ রয়েছে মহাভারতীয় কাঠামোয়? সংবাদের হাড়-কাঁটা সংগ্রহ করে কাব্যরচনার উদ্যোগ বহু দিনের। রসের ভিয়েন সংবাদকে গৌণ করে কাব্যের মূল্যকে সামনে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সংবাদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এই যে, তা প্রতিবার বাস্তবের উপকরণকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে, সেসবকে কাব্যস্তরে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
সম্প্রতি রাজস্থান সরকারের স্কুল শিক্ষা দপ্তর একটি নির্দেশে জানিয়েছে যে, সরকারি সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল ও ইংরেজি মিয়িডাম স্কুলগুলিকে রোজ কমপক্ষে দু’টি করে সংবাদপত্র কিনতে হবে। আর, দৈনিক অন্তত ১০ মিনিট পড়ুয়াদের তা পড়াতে হবে। দু’টি সংবাদপত্রের একটি হবে হিন্দি মাধ্যমের, অন্যটি ইংরেজি। সরকারি আপার প্রাইমারি স্কুলগুলিকে দু’টি করে হিন্দি মাধ্যমের সংবাদপত্র কিনতে হবে। রাজ্য ও জাতীয় স্তরের নানাবিধ খবরের অন্তঃসার আলোচনা করতে হবে। শেখাতে হবে রোজ অন্তত পাঁচটি করে নতুন শব্দ। এই পদক্ষেপ ঐতিহাসিক। ‘সংবাদ’ সম্বন্ধে, ‘বাস্তব’ সম্বন্ধে, ‘ভুল খবর’ এবং রাজনীতি বিষয়ে পড়ুয়াদের চেতনাকে তা সমৃদ্ধ করবে।
