ইরান সংকট আবার মনে করিয়ে দিল, যুদ্ধ শুরু করা সহজ হলেও স্থায়ী শান্তির পথ শেষ পর্যন্ত কূটনীতির মধ্যেই নিহিত।
ইরান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতির সেই পুরনো সত্যটিকে ফের সামনে এনেছে- যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, তার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা ততখানি কঠিন। তেহরানের উপর সামরিক চাপ বাড়িয়ে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছনোর যে-কৌশল ওয়াশিংটন নিয়েছিল, তা এক জটিল অচলাবস্থার জন্ম দিয়েছে। সংঘাতের শুরুতে যেসব লক্ষ্য সামনে ছিল, তার কোনওটিই সফল হয়নি। বরং দীর্ঘ সংঘর্ষ ইরানকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেছে।
একদিকে ইজরায়েলের সামরিক তৎপরতা, যা পরিস্থিতিকে বারবার উত্তপ্ত করে তুলছে, আর অন্যদিকে ইরান, যারা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রতিরোধ দেখিয়ে আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছে। ফলে মার্কিন প্রশাসন এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও কাঙিক্ষত ফল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার পিছিয়ে এলেও রাজনৈতিক বার্তা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব এই সংকটকে গভীরতর করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ হিসাবে এই অঞ্চলের অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। কোনও পক্ষই যদি মনে করে সামরিক চাপ দিয়ে অপর পক্ষকে সম্পূর্ণ নত করা সম্ভব, তবে সেই ধারণা বাস্তবের সঙ্গে মিলছে না। আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে শক্তিশালী রাষ্ট্রকে সহজে কোণঠাসা করা যায় না। বরং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অনেক সময় প্রতিপক্ষর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
যুদ্ধ তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে অবশ্যই, কিন্তু একই সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে কয়েক মাস আগে যে-শর্তে সমঝোতার সম্ভাবনা ছিল, এখন তা বদলে গিয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে অবশ্যই, কিন্তু একই সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে কয়েক মাস আগে যে-শর্তে সমঝোতার সম্ভাবনা ছিল, এখন তা বদলে গিয়েছে। ইরান এখন আর আগের অবস্থান থেকে কথা বলতে চাইছে না। তারা চাইছে প্রথমে শত্রুতার অবসান, তারপর আলোচনার পথ। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার সামনে সবচেয়ে বাস্তবিক পথটি হল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা। আসলে, কোনও দেশের আত্মসমর্পণকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসাবে দেখার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত সংঘাতই বাড়ায়। তাই স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পন্থা, যেখানে উভয় পক্ষই কিছু ছাড় দেবে এবং মুখরক্ষা করার সুযোগ পাবে। যুদ্ধক্ষেত্রে জয় আর কূটনৈতিক সমাধান এক জিনিস নয়- এই পার্থক্য বুঝতে না-পারলে বড় শক্তিগুলিও ছোট রাজনৈতিক হিসাবের কাছে আটকে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বোমা দিয়ে নিরাপত্তা তৈরি করা যায় না। তৈরি করা যায় কেবল আরও ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা এবং নতুন সংঘাতের বীজ। ইরান প্রশ্নে এখন প্রয়োজন এমন এক কূটনীতি, যাতে সাময়িক জয়ের বদলে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অগ্রাধিকার পাবে। কারণ, এই সংঘাতে কোনও পক্ষের সম্পূর্ণ বিজয় সম্ভব নয়, কিন্তু সকল পক্ষের ক্ষতি কমিয়ে শান্তির একটি পথ তৈরি এখনও সম্ভব।
