shono
Advertisement
Artificial intelligence

অগ্নি-নিরাপত্তার লড়াইয়ে কলকাতার সহায়ক হয়ে উঠবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা!

এই প্রযুক্তির লক্ষ্য আগুন নেভানো নয়, আগুন লাগার আগেই বিপদ শনাক্ত করা।
Published By: Biswadip DeyPosted: 01:34 PM Jun 16, 2026Updated: 01:34 PM Jun 16, 2026

ভয়াবহ বহু অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী কলকাতা। কিন্তু আগুন লাগার আগেই যদি সম্ভাব্য বিপদকে চিহ্নিত করা যায়, তাহলে কেমন হবে বিষয়টা? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন ও রোবট বিশ্বজুড়ে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিই হয়তো কলকাতার অগ্নি-নিরাপত্তার লড়াইয়ে হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় সহায়ক। লিখছেন দীপ্র ভট্টাচার্য।

Advertisement

কলকাতা শহর আগুনকে বেশ ভালোই চেনে। শুধু সংবাদপত্রর ‘শিরোনাম’ হিসাবে নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতা হিসাবে। কয়েক দশক ধরে শহর দেখেছে বাজারে আগুন, অফিসে আগুন, বহুতলে আগুন, হাসপাতালের ওয়ার্ডে আগুন, গুদামে আগুন। কখনও কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি ছাই হয়ে গিয়েছে, কখনও প্রাণ হারিয়েছে সাধারণ মানুষ, কখনও আবার জীবন বাজি রেখে আগুনের মধ্যে ঢুকতে হয়েছে দমকলকর্মীদের।

প্রতিবার বড় কোনও অগ্নিকাণ্ডের পরে প্রশ্ন ওঠে– আরও আগে কি বিপদ চিহ্নিত করা যেত? আগুন লাগার পর কি আরও দ্রুত পৌঁছনো যেত ঘটনাস্থলে? ভিতরে আটকে পড়া মানুষদের কি আরও তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করা সম্ভব ছিল? আগুনের বিস্তার কি কিছুটা হলেও রোখা যেত? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হচ্ছে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা ‘এআই’ এবং ‘রোবটিক্স’-এর সাহায্যে। প্রযুক্তিবিদদের একাংশের মতে, আগামী দশ বছরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় বিপ্লব আসতে পারে এই দুই প্রযুক্তির হাত ধরেই। যেভাবে এক সময় মোবাইল ফোন যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছিল, ঠিক তেমনই এআই ও রোবট বদলে দিতে পারে আগুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই প্রযুক্তির লক্ষ্য আগুন নেভানো নয়, আগুন লাগার আগেই বিপদ শনাক্ত করা। অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে প্রায়শই দেখা যায়, দুর্ঘটনার অনেক আগে থেকেই বিপদের লক্ষণ ছিল। কোথাও বৈদ্যুতিক তার অতিরিক্ত গরম হচ্ছিল, কোথাও ট্রান্সফরমারের উপর চাপ বাড়ছিল, কোথাও রাসায়নিক পদার্থের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হয়ে উঠছিল। কিন্তু সেই তথ্য হয় নজরে আসেনি, অথবা গুরুত্ব পায়নি। এখানেই এআইয়ের ভূমিকা।

প্রতিবার বড় কোনও অগ্নিকাণ্ডের পরে প্রশ্ন ওঠে– আরও আগে কি বিপদ চিহ্নিত করা যেত? আগুন লাগার পর কি আরও দ্রুত পৌঁছনো যেত ঘটনাস্থলে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হচ্ছে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা ‘এআই’ এবং ‘রোবটিক্স’-এর সাহায্যে।

ধরা যাক, একটি বড় শপিং মল বা হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার সেন্সর বসানো রয়েছে। এই সেন্সরগুলি প্রতি মুহূর্তে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, ধোঁয়ার উপস্থিতি, বিদ্যুতের লোড এবং যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা সম্পর্কে তথ্য পাঠাচ্ছে। মানুষের পক্ষে এই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু একটি এআই সিস্টেম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই তথ্য খতিয়ে দেখে বুঝতে পারে কোথাও কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না। বিশ্বের বহু বিমানবন্দর, ডেটা সেন্টার এবং শিল্প কারখানায় ইতিমধ্যেই এই ধরনের ‘প্রেডিক্টিভ সেফটি’ প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই– আগুন লাগার আগেই সম্ভাব্য বিপদকে চিহ্নিত করা। কলকাতার মতো শহরে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ শহরের বহু বাজার, পুরনো বাণিজ্যিক ভবন এবং গুদাম এলাকায় বৈদ্যুতিক পরিকাঠামোর বয়স অনেক।

বড়বাজার, পোস্তা, কিংবা পুরনো কলকাতার অসংখ্য ভবনে অগ্নি-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বহু দিনের। সেখানে এআই-নির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিপদের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে আগুন প্রতিরোধই এআইয়ের একমাত্র কাজ নয়। আগুন লেগে যাওয়ার পরেও প্রযুক্তি জীবন বঁাচাতে পারে। আগুন লাগার প্রথম কয়েক মিনিটকে অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞরা বলেন ‘গোল্ডেন মিনিটস’। এই সময়ের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে সমস্যা হল, আগুনের মধ্যে কী ঘটছে, তা বোঝা অত্যন্ত কঠিন। ধোঁয়ার কারণে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ভবনের ভিতরে কোথায় আগুন সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে, কোথায় মানুষ আটকে রয়েছে, কোথায় বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে– এসব তথ্য প্রায়ই স্পষ্ট থাকে না। এই জায়গাতেই ড্রোন এবং এআই একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

বড়বাজার, পোস্তা, কিংবা পুরনো কলকাতার অসংখ্য ভবনে অগ্নি-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বহু দিনের। সেখানে এআই-নির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিপদের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

২০২৩ সালে কানাডার কয়েকটি বড় দাবানলের সময় তাপ-সংবেদনশীল ক্যামেরাযুক্ত ড্রোন ব্যবহার করে আগুনের বিস্তার পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতেও দাবানল মোকাবিলায় ড্রোন এখন প্রায় নিয়মিত সরঞ্জাম। ধোঁয়ার আড়ালে মানুষের চোখ যা দেখতে পারে না, থার্মাল ক্যামেরা তা দেখতে পারে। কোথায় আগুনের তাপমাত্রা বেশি, কোথায় কোনও মানুষ আটকে আছে, কোথায় আগুন নতুন করে ছড়াতে পারে– সেসব তথ্য রিয়েল-টাইমে নিয়ন্ত্রণকক্ষে পৌঁছে যায়।

ভাবা যাক কলকাতার প্রসঙ্গে। কোনও বহুতল আবাসনে আগুন লেগেছে। দমকলের মই পৌঁছতে সময় লাগছে। এর মধ্যেই একটি ড্রোন কয়েক মিনিটের মধ্যে ভবনের চারদিকে ঘুরে পরিস্থিতির মানচিত্র তৈরি করে ফেলতে পারে। কোন তলায় সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা, কোথায় ধোঁয়ার ঘনত্ব বেশি, কোন বারান্দায় মানুষ আটকে রয়েছে– সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে দাবানল মোকাবিলায় ড্রোন এখন প্রায় নিয়মিত সরঞ্জাম। ধোঁয়ার আড়ালে মানুষের চোখ যা দেখতে পারে না, থার্মাল ক্যামেরা তা দেখতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল রোবটের ব্যবহার। আগুনের মধ্যে প্রবেশ করা দমকলকর্মীদের কাজ পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক পেশাগুলির একটি। অনেক সময় তঁাদের এমন জায়গায় ঢুকতে হয়, যেখানে ছাদ ভেঙে পড়তে পারে, বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকতে পারে বা যে কোনও মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতির জন্যই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ অগ্নিনির্বাপণ রোবট তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত ‘থার্মাইট’ নামের একটি অগ্নিনির্বাপণ রোবট দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটি ভয়াবহ তাপমাত্রার মধ্যেও এগিয়ে যেতে পারে এবং বিপুল পরিমাণ জল বা ফোম ছুড়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তেল শোধনাগার, রাসায়নিক কারখানা এবং বিমানঘঁাটির মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের রোবটের ব্যবহার বাড়ছে।

জাপানে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের পরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনুসন্ধানের জন্য বিশেষ রোবট তৈরি হয়েছে। ২০১১ সালের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়ের পর মানুষ যেখানে প্রবেশ করতে পারছিল না, সেখানে বিভিন্ন ধরনের রোবট ব্যবহার করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়েছিল। যদিও সেটি অগ্নিনির্বাপণের ঘটনা ছিল না, তবু এই ঘটনা, বিপজ্জনক পরিবেশে রোবটের কার্যকারিতা যে কতটা সুবিধাজনক, তার সম্পর্কে বিশ্বকে একটা নতুন ধারণা দেয়। চিনের কয়েকটি বড় শহরে আবার অগ্নিনির্বাপণ রোবটকে সরাসরি দমকল বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিছু রোবট আগুন নেভানোর পাশাপাশি গ্যাসের ঘনত্ব মাপতে পারে, আবার কিছু রোবট ভবনের ভিতরে ঢুকে ভিডিও পাঠাতে পারে।

কলকাতার মতো শহরে যেখানে অনেক বাজার এলাকায় রাস্তা সরু এবং গুদামঘরগুলি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে, সেখানে এমন রোবট বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। দমকলকর্মীদের সরাসরি আগুনের মুখে না পাঠিয়ে প্রথমে রোবট পাঠানো গেলে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়াও সম্ভব হবে।

তবে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত ‘ডিজিটাল যমজ’ ধারণা। বিশ্বের কয়েকটি শহরে গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ভার্চুয়াল প্রতিরূপ তৈরি করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভবনের একটি ডিজিটাল সংস্করণ কম্পিউটারে সবসময় উপস্থিত থাকে। আগুন লাগলে সেই মডেলে আগুনের সম্ভাব্য বিস্তার বিশ্লেষণ করা যায়। কোন সিঁড়ি ব্যবহার করা নিরাপদ, কোথায় মানুষ আটকে পড়তে পারে, কোন দেওয়াল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বেশি– এআই কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরতে পারে। কলকাতার হাসপাতাল, মেট্রো স্টেশন, সরকারি ভবন, শপিং মল কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে এই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তি কোনও জাদুর কাঠি নয়। কেবল রোবট কিনে বা সফটওয়্যার বসিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার, আধুনিক সেন্সর নেটওয়ার্ক, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী। সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজন প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

কলকাতার অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, সমস্যার মূল কারণ অনেক সময় প্রযুক্তির অভাব নয়, বরং নিরাপত্তা বিধি না মানা। বৈদ্যুতিক তারের জট, অবৈধ মজুত, বন্ধ ফায়ার এগজিট, অকেজো অ্যালার্ম ব্যবস্থা– এসব সমস্যার সমাধান না হলে শুধু এআই দিয়ে বিপদ ঠেকানো যাবে না। তবু এটাও সত্য, পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে। আগুনের বিরুদ্ধে লড়াইও বদলাচ্ছে। একসময় অগ্নিনির্বাপণ মানে ছিল শুধু জল, পাইপ এবং সাহস। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ডেটা, সেন্সর, অ্যালগরিদম, ড্রোন এবং রোবট।

হয়তো খুব দূরের ভবিষ্যৎ নয়, যখন কলকাতার কোনও অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথমে উড়ে যাবে একটি এআই-চালিত ড্রোন। কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতির বিশ্লেষণ পৌঁছে যাবে নিয়ন্ত্রণকক্ষে। আগুনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশে ঢুকবে একটি রোবট। আর সেই তথ্যের ভিত্তিতে আরও নিরাপদ ও আরও কার্যকরভাবে কাজ করবেন দমকলকর্মীরা আগুনের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই তখনও চলবে। তবে সেই লড়াইয়ে মানুষের পাশে নিশ্চিতভাবে থাকবে নতুন সহযোদ্ধা– কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত রোবটকর্মীরাও।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement