shono
Advertisement
Rabindranath Tagore

বিশ্বসাথে যোগ যেথায়... সভ্যতার কলুষতা ও রবীন্দ্রনাথ

শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের পরিবেশ ভাবনাকে আজীবন প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন।
Published By: Biswadip DeyPosted: 01:43 PM Jun 29, 2026Updated: 01:45 PM Jun 29, 2026

রবীন্দ্রনাথ-কাঙ্ক্ষিত সমাজের সম্মিলিত আত্মজাগরণে পরিবেশ ছিল মূল। শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন জুটি এবং সেখান লালিত পরিবেশ-ঘেঁষা সংস্কারে ফিরে তাকালে দেখা যায় ব‌্যক্তি ও সমাজজীবনের চাবিকাঠিটিকে। যা পাড়া ছাড়িয়ে লোকালয়, লোকালয় ছাড়িয়ে দেশ ও দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বকে বঁাধে বিশ্বপ্রকৃতির বিনিসুতোর মালায়। লিখছেন মানস ভট্টাচার্য।

Advertisement

পৃথিবীর গভীর, গভীরতম অসুখ এখন...। অসুখটা যে ঠিক কী তা বুঝেও যেন আমরা না বোঝার একটা ভান করে থাকি। প্রতি বছর জুন মাসের ৫ তারিখে দিকে দিকে মহাসমারোহে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’-এর অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে বাকি ৩৬৪ দিনে এর গুরুত্ব ভুলে থাকি। কিন্তু পরিবেশ এমন জিনিস যাকে সাময়িক ভুলে থাকা হয়তো সম্ভব, কিন্তু এর অসুখ থেকে আমাদের এড়িয়ে যাওয়া কখনওই সম্ভবপর নয়।

প্রায় ১৪০ কোটির দেশ ভারতের অর্থনীতি মূলত কৃষিপ্রধান। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীজুড়ে গড় তাপমাত্রা যেভাবে বাড়তে শুরু করেছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে উপযুক্ত পরিমাণে খাদ‌্যলাভের সম্ভাবনা আমাদের দেশে ব্যাপক হারে কমছে। পরিবেশ এর থেকে আর একটু বেশি অসুস্থ হতে শুরু করলে আমাদের বেঁচে থাকার পর্যাপ্ত খাবারটুকু পর্যন্ত জোগাড় করা কঠিন হয়ে উঠবে। দৈনন্দিন জীবনে নগর সভ্যতার কলুষতা এবং একইসঙ্গে পরিবেশ ও প্রকৃতি বিমুখতা যে কী বিপদ বয়ে আনছে, সে-বিষয়ে যে-যে মনীষী সাবধানবাণী উচ্চারণ করে গিয়েছেন তঁাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যতম। তঁার সাহিত্যজীবনে যেমন প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়তার ছবি দেখতে পাই, তেমনই তঁার ব্যবহারিক জীবনেও দেখি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষ। এই পারস্পরিক সম্পর্কটি যেমন হয়েছে তেমন নয়, যেমন হতে পারত তেমন এক আদল রবীন্দ্রনাথ খুঁজেছেন প্রায় সমস্ত জীবন ধরে। চিন্তা ও কর্মের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা শান্তিনিকেতন এবং শ্রীনিকেতন আসলে রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ ভাবনারই এক বিচিত্র নির্মাণশালা।

দৈনন্দিন জীবনে নগর সভ্যতার কলুষতা এবং একইসঙ্গে পরিবেশ ও প্রকৃতি বিমুখতা যে কী বিপদ বয়ে আনছে, সে-বিষয়ে যে-যে মনীষী সাবধানবাণী উচ্চারণ করে গিয়েছেন তঁাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যতম।

রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি ও পরিবেশের সাধনাকে ‘সকল সাধনা’র গোড়ার কাজ বলেছিলেন। বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাকালে তিনি আমাদের উপযোগী পরিবেশকেন্দ্রিক নতুন এক শিক্ষাধারার কথা বলেন– যে শিক্ষাধারায় প্রাচীনকাল থেকে অর্জিত নানা বিদ্যার সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে গ্রামবাসীর সর্বাঙ্গীণ উন্নতির উপযোগী একটি বিদ্যালয় স্থাপন করা তঁার উদ্দেশ‌্য ছিল। বিশ্বভারতী প্রকৃতির মধ্যে বিকশিত হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতিকে রবীন্দ্রনাথের ছন্দে নাচিয়ে তুলতে পারেনি। ফলে অচিরেই প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল আর-একটি বিদ্যালয়ের– যার সঙ্গে জড়িয়ে প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষ।

শ্রীনিকেতন গোড়া থেকেই এই কঠিন সাধনায় ব্রতী হয়েছিল। পরিবেশের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীকে জীবনের সঙ্গে পরিচিত করাই ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য। জীবন তো কেবলমাত্র পুঁথির পাতা নয়, জীবন হল সেই বৃহৎ ও বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র যেখানে চাষি চাষ করছে, তঁাতি তঁাত বুনছে, ছুতোর হাতুড়ি পিটচ্ছে, কামার বা সেকরার হাপর ফুঁসছে, কুমোরের চাকা ঘুরছে, কলুর ঘানি চলছে। শ্রীনিকেতনে এই সমাজ ও পরিবেশনির্ভর জীবনকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিকাঠামোটি তৈরি হয়েছিল। এই সামগ্রিক জীবনকে ঘিরেই কিন্তু আবর্তিত হয়েছে আমাদের দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিও। সবের উদ্দেশ্য পরিবেশের সঙ্গে এক নিবিড় আত্মীয়তাবোধ গড়ে তোলা। এই আত্মীয়তাবোধ-ই প্রকৃত শিক্ষা। পরিবার ছাড়িয়ে পাড়া-প্রতিবেশী, প্রতিবেশী ছাড়িয়ে দূরের লোকালয়, লোকালয় ছাড়িয়ে সমগ্র দেশ, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে এই প্রকৃতি ও পরিবেশকেন্দ্রিক আত্মীয়তার সম্পর্ক জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের মধ্যে ব্যাপ্ত হবে– এই ছিল রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার উদ্দেশ্য। কোথাও যা ছিল না, তাই দিয়েই শুধুমাত্র পরিবেশকে নিবিড় আত্মিক সম্পর্কে জড়িয়ে বিশ্বভারতী তৈরি হয়েছিল, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শ্রীনিকেতন। প্রকৃতি ও পরিবেশই ছিল সেখানকার চালিকাশক্তির প্রধান উৎস।

শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের পরিবেশ ভাবনাকে আজীবন প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন। শহরের ইট-কাঠ-পাথরের শুষ্ক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে মাটির কাছাকাছি প্রকৃতির মধ্যে থাকার এই আদর্শগত টানেই দেশ-বিদেশের কত জ্ঞানী-গুণী মানুষ এসেছেন, তঁারা স্বচ্ছন্দে মাটির ছোট ছোট ঘরে থেকেছেন। তিনি তঁার সৃষ্টি ও যাপনচিত্রের মধ্য দিয়ে যে কথাটি ক্রমাগত বলে গিয়েছেন তা হল আসলে মাটির কথা। বৃদ্ধ বয়সে সেই মাটির টানেই ফিরে গিয়েছিলেন শ্রীনিকেতনে, ‘ফিরে চল্‌, ফিরে চল্‌, ফিরে চল্‌ মাটির টানে–/ যে মাটি অঁাচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে॥’ গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার এক মাস পরেই রচনা করেন।

কোথাও যা ছিল না, তাই দিয়েই শুধুমাত্র পরিবেশকে নিবিড় আত্মিক সম্পর্কে জড়িয়ে বিশ্বভারতী তৈরি হয়েছিল, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শ্রীনিকেতন। প্রকৃতি ও পরিবেশই ছিল সেখানকার চালিকাশক্তির প্রধান উৎস।

১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপনের সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল চিন্তাভাবনা ছিল পরিবেশকেন্দ্রিক পল্লিসংস্কার। রাশিয়ায় গিয়ে সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের বেশ জোরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘অনতিকাল পরে এই গ্রামের ইস্কুলটিই সত্যিকার আদর্শ বিদ্যালয় হয়ে উঠবে’। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছে ছিল: গ্রামের জাগরণ, আত্মপ্রস্তুতি, সমাজগঠন, স্বাধীনতার অন্তর্গত ভিত্তি নির্মাণ। গ্রামের উপযোগী শিক্ষা, আত্মশক্তি, রুজিরোজগারের ভিত তৈরি। আর সমাজের এই সম্মিলিত আত্মজাগরণে পরিবেশ ছিল মূল। শুধু আঙুলের কাজ নয়, আত্মার কাজের প্রসারিত পটভূমির মধ্যে তিনি পরিবেশকে দেখতে পেয়েছিলেন।

শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নভুবনকে শুধুমাত্র বই পড়ে পাওয়া যাবে না, তার থেকেও আরও নিবিড়ভাবে পাওয়া যাবে সেখানকার প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে। শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতন যেন বনের ভিতর পড়ে থাকা এক জাদুদণ্ড– যার স্পর্শে সারা ভারত তথা বিশ্ব তৎক্ষণাৎ হয়ে উঠবে পরম কাঙ্ক্ষিত এক মহামূল্যবান বস্তুতে!

পরিবেশকেন্দ্রিক এই শান্তিনিকেতন একবিংশ শতকের বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানীর যোগ্যতম দাবিদার হয়ে উঠতে পারে। রবীন্দ্রনাথ আরও চার-পঁাচটি নোবেল পাওয়ার মতো বই হয়তো লিখেছেন। কিন্তু যদি শেষ পর্যন্ত যদি তঁাকে আরও এক এবং একটি বারই নোবেল দেওয়া, তাহলে তা নিঃসন্দেহে দাবি করতে পারে তঁার সব অন‌্যতম মহাসৃষ্টি– তথা পরিবেশভাবনার ‘অ‌্যাপ্ট ব্লুপ্রিন্ট’ শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন জুটি।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement