কেউ নরেন্দ্র মোদিকে ‘পছন্দ’ করতে পারে, বা কেউ ‘নাও’ পারে– তবে ‘ব্র্যান্ড মোদি’-কে অগ্রাহ্য বা অবহেলা করা যাবে না। তঁার দায়িত্ববোধ প্রবল। তিনি দক্ষ নেতা। দেশের দীর্ঘতম সময়-কাল জুড়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব সামলাচ্ছেন। মানুষ, আশাবাদী। লিখেছেন শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির বিপুল ভোটে বিজয়ের সময়-কালে আমার বাবা প্রয়াত প্রণব মুখোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশ্লেষণের কথা মনে পড়ছে। বাবা সেই সময় দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে। নরেন্দ্র মোদি এবং প্রণব মুখোপাধ্যায়– ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের হলেও উভয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল, যা প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিসরের উদাহরণ।
তা, যে-গল্প বলছিলাম। নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ভবনে নরেন্দ্র মোদি এসেছেন বাবার কাছে। কথাবার্তার সময়– মোদিজির কাছে বাবা এই নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে– তঁার মতামত জানতে চান। মোদিজি বলেন, তিন দশক পর একটি রাজনৈতিক দল এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। পরিচিত পেশাদারি মেজাজে বাবার পরবর্তী প্রশ্ন, ‘আর?’ নরেন্দ্র মোদি নিরুত্তর।
২০১৪ সালের আগে নরেন্দ্র মোদি ছিলেন জাতীয় রাজনীতির নতুন মুখ। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সেখানে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, সত্য। কিন্তু ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে তিনি যেমন প্রথমবারের জন্য সাংসদ হলেন, তেমনই গ্রহণ করলেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব। এ এক কথায় অভূতপূর্ব ব্যাপার!
বাবা উত্তর দিলেন, লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে ২০১৪ সালের ভোট স্বতন্ত্র। এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা আগে থেকেই ঘোষণা করা হয়েছিল। একজন নতুন মুখকে সামনে নিয়েও আসা হয়েছে। এই বিপুল জনাদেশ শুধু বিজেপির জন্য নয়, বরং দেশের মানুষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী রূপে নরেন্দ্র মোদির পক্ষেই মত দিয়েছেন।
ইতোপূর্বের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন সে নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হত, কিন্তু সরকারিভাবে কখনই কারও নাম ঘোষণা করা হত না। নবনির্বাচিত সাংসদরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করতেন। অনেক সময়, জোট শরিকদের সংখ্যাতত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত প্রধানমন্ত্রী মনোনয়নে। মোদিজির পূর্বসূরি ড. মনমোহন সিং জননেতা ছিলেন না। তদানীন্তন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী তাও তঁাকে মনোনীত করেছিলেন। ভারতের অপর দু’জন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিমা রাও এবং দেবেগৌড়া যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখন তো
তঁারা সাংসদও ছিলেন না। সোজা কথায়, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদরা প্রধানমন্ত্রী বাছাই করতেন। ২০১৪ সালে, ভারতের রাজনীতিতে, নির্বাচনী আবহের মধ্যে, গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছিল। দেশের জনসাধারণ নরেন্দ্র মোদিকে তঁাদের প্রধানমন্ত্রী রূপে বেছে নেন, অনেকটা মার্কিন মুলুকের ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন’-এর মতো।
সর্বোচ্চ সময়কাল ধরে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রিত্ব সামলাচ্ছেন। ‘শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী’ বলে তঁাকে বিবেচনা করতে পারি। জোট সরকারে টিকে থাকার নেপথ্যে শরিক দলগুলির অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন দাবিদাওয়া থাকে। কিন্তু এই সমস্যাগুলি কাটিয়ে মোদি একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী সরকার পরিচালনা করছেন।
এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল, ২০১৪ সালের আগে নরেন্দ্র মোদি ছিলেন জাতীয় রাজনীতির নতুন মুখ। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সেখানে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, সত্য। কিন্তু ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে তিনি যেমন প্রথমবারের জন্য সাংসদ হলেন, তেমনই গ্রহণ করলেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব। এ এক কথায় অভূতপূর্ব ব্যাপার! পুরনো সংসদ ভবনের সিঁড়িতে তঁার প্রণাম করার দৃশ্যটি কোটি কোটি ভারতবাসীর হৃদয়কে আবেগাপ্লুত করেছিল।
নির্বাচনে জয়লাভের নেপথ্যে একটি মাত্র নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। বিভিন্ন বিষয়ের জটিল প্রক্রিয়া এর সঙ্গে যুক্ত। বিজেপির বুনিয়াদি স্তরে শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছনোর জন্য তারা কৌশলগত নানা পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বন করে। পদক্ষেপে ত্রুটি দেখা দিলে, তা দ্রুত সংশোধন করার মানসিকতা এই দলের রয়েছে। এসব কারণের জন্যই বর্তমান সময়-কালে নির্বাচনে জয়লাভের নিরিখে বলা যায়, এই দলটি রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিরোধ্য। এবং এ-ও অস্বীকার করা যায় না যে, বিজেপির শক্তিশালী ট্রাম্প কার্ডটি আর কেউ নন– নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। তঁার মধ্যে জনগণ একজন শক্তিশালী নেতাকে প্রত্যক্ষ করেছে– যিনি কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে এ জায়গায় এসে উপনীত হয়েছেন। কংগ্রেস এবং পরিবার-নিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক দলগুলির পরিবারতন্ত্রের বাইরে থেকে উঠে আসা মানুষ তিনি।
নরেন্দ্র মোদিও বিজেপি সমার্থক। সম্প্রতি, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় আমি কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমার নিজের আত্মীয়স্বজনরা কংগ্রেসের একনিষ্ঠ সমর্থক। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ২.৯ শতাংশ ভোটদাতার মধ্যে তঁারাও রয়েছেন। কিন্তু আমার বেশিরভাগ বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতরা এবার বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। আমি যখন তঁাদের জিজ্ঞেস করি, কোন দলকে তঁারা ভোট দেবেন, তঁাদের উত্তর ছিল: ‘মোদিকে’। আমি তখন বলি, এটি তো বিধানসভা নির্বাচন, নরেন্দ্র মোদি তো এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। উত্তর পেয়েছি– ‘ওই এক-ই ব্যাপার’।
সর্বোচ্চ সময়কাল ধরে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রিত্ব সামলাচ্ছেন। ‘শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী’ বলে তঁাকে বিবেচনা করতে পারি। জোট সরকারে টিকে থাকার নেপথ্যে শরিক দলগুলির অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন দাবিদাওয়া থাকে। কিন্তু এই সমস্যাগুলি কাটিয়ে মোদি একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী সরকার পরিচালনা করছেন। তঁার নীতি ও কাজের ধারা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু তঁার ক্যারিশমা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভোটদাতাদের সঙ্গে তঁার নিবিড় যোগাযোগ অনুপ্রেরণাদায়ক। ২০১৯ সালের মতো ’২৪ সালেও তা প্রতিফলিত হয়। মোটকথা, আপনি নরেন্দ্র মোদিকে ‘পছন্দ’ করতে পারেন, বা ‘নাও’ পছন্দ করতে পারেন– তবে ‘ব্র্যান্ড মোদি’-কে অগ্রাহ্য বা অবহেলা করা যাবে না। তঁার দায়িত্ববোধ প্রবল। সাধারণ নাগরিক রূপে আমি চাইব, বিপুল যে-জনাদেশ তিনি পেয়েছেন, সেটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগান, দেশকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করুন।
(মতামত নিজস্ব)
