রানির কাছে খবর গেল যে, দেশের মানুষ অনাহারে। তাদের দু'-বেলা একটুকরো করে রুটি অবধি জুটছে না। তখন নাকি রানি বলেছিলেন- তাহলে কেক খেতে বলো। 'লেট দেম ইট কেক'। ১৭৮৯ সালে 'ফরাসি বিপ্লব' ঘটে। এর পূর্ববর্তী শেষ ফরাসি সম্রাজ্ঞী ছিলেন মারি আন্তোনেত। তেলতেল উপকথার মতো করে তাঁর নামের সঙ্গেই 'লেট দেম ইট কেক' জড়িয়ে গিয়েছে। তবে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে নেমে যদি গুজবের পল্লবিত হওয়ার সম্ভাবনাকে নির্মূল করে দেওয়া যায়, তবে দেখা যাবে, রুশোর আত্মজৈবনিক রচনা 'কনফেশন্স' (প্রকাশিত হয় ১৭৮২) প্রথম এমন একটি গল্পের দিকে আমাদের ঠেলে দিয়েছিল। ভেবে দেখার।
একজন রানি, কত দূর বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন হলে, এ ধরনের মূঢ়-মন্তব্য করতে পারেন যে বাড়িতে খাওয়ার মতো রুটি না-থাকলে কেক খাও। রুশোর লেখায় অবশ্য 'কেক' কথাটি ছিল না। ছিল 'ব্রিয়োশ'। যা ডিম ও মাখনের সমবায়ে তৈরি। বলা বাহুল্য, যে-মানুষ দারিদ্রের কারণে রুটি জোগাড় করতে পারে না, তার পক্ষে 'ব্রিয়োশ' খাওয়া অসম্ভব। মূল অর্থ এখানেও অবিকৃত। বাস্তব সম্বন্ধে যার ধারণা নেই, একমাত্র সে-ই পারে রুটির বদলে ব্রিয়োশ খাওয়ার নিদান দিতে। 'লেট দেম ইট কেক' কথাটি প্রযুক্তিপ্লাবিত সময়ে বদলে হয়েছে- 'লেট দেম ইট স্মার্টফোন্স'। উন্নয়ন, প্রযুক্তি, অসাম্য নিয়ে আলোচনায় এ-কথার ব্যবহার সর্বজনবিদিত। যে খেতে পায় না, যে বসবাস করে দারিদ্রসীমার তলায়, তাকে যদি বলা হয় স্মার্টফোন হল সর্বরোগহর, তাহলে মশকরার মাত্রাটি লাগামছাড়া হয়ে যেতে বাধ্য।
উন্নত বিশ্বের থেকে চুঁইয়ে আরও অনেক ব্যবহারিক সুবিধার ছদ্মবেশে তৃতীয় বিশ্ব স্মার্টফোনের সাহচর্য পেয়েছে। অথচ এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে তৃতীয় বিশ্ব সচেতন নয়, বা ব্যবহারিক সুবিধার চাপে কণ্ঠ তুলতে পারছে না।
আধুনিক সময়ের সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষ্যে, এ-তালিকায় টমাস পিকেটির মতো তাত্ত্বিকও রয়েছেন, একটি কূটাভাস প্রায়শই উল্লিখিত হয়, তা হল, 'ওয়েলথ-ইনফরমেশন প্যারাডক্স'। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, উপার্জনের নিরিখে সমাজের উচ্চতর অবস্থানে যে-শ্রেণি রয়েছে, এই সময়ে দাঁড়িয়ে তারা যেমন চাইলে যে কোনও তথ্য অ্যাকসেস করতে পারে, তেমনই দরিদ্র বা অভুক্ত মানুষটিও স্মার্টফোন ও নেটের সুবাদে একই তথ্য করায়ত্ত করতে সক্ষম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, উভয় শ্রেণির মধ্যে অসাম্য ও অন্যায্যর তফাতরেখাটি ঘুচে যাবে এতদ্দ্বারা। উভয় শ্রেণির হাতে স্মার্টফোন থাকতে পারে। কিন্তু সেই স্মার্টফোন উভয় শ্রেণির বাস্তবতার প্রভেদকে মুছে ফেলতে পারবে না। উন্নত বিশ্বের থেকে চুঁইয়ে আরও অনেক ব্যবহারিক সুবিধার ছদ্মবেশে তৃতীয় বিশ্ব স্মার্টফোনের সাহচর্য পেয়েছে। অথচ এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে তৃতীয় বিশ্ব সচেতন নয়, বা ব্যবহারিক সুবিধার চাপে কণ্ঠ তুলতে পারছে না।
সুইডেন, উন্নত বিশ্বের এই দেশটি টেক-অগ্রগতিতে বরাবর এগিয়ে থেকেছে। তারা কিন্তু পদক্ষেপ করল। সেখানকার স্কুলে স্মার্টফোন নিয়ে যাওয়া 'নিষিদ্ধ' হতে চলেছে সামনের 'অ্যাকাডেমিক সেশন' থেকে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, পড়ুয়াদের পঠনপাঠনের মানের ক্ষয় ঘটিয়েছে স্মার্টফোন। তাই বই-খাতার সাবেক বন্দোবস্তে তারা ফিরে যেতে চলেছে। আমরা কী করব? স্মার্টফোন খেয়েই চলব?
