তাজমহলকে ঘিরে নতুন আইনি বিতর্ক আবারও ইতিহাস, জনবিশ্বাস ও বিচারব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
তাজমহলকে ঘিরে নতুন বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ঐতিহাসিক সত্য, জনবিশ্বাস, এবং বিচারব্যবস্থার সীমারেখা ঠিক কোথায়? সম্প্রতি আগ্রার একটি নিম্ন আদালত তাজমহলে সমীক্ষার জন্য অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের আবেদন খারিজ করে দেয়। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে এলাহাবাদ হাই কোর্টে আবেদন করা হয়েছে। হাই কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং 'ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ'-এর (এএসআই) কাছে জবাব তলব করেছে।
মামলার আইনগত পরিণতি যাই হোক না কেন, এই বিতর্ক ইতিহাসচর্চা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তাজমহলকে প্রাচীন হিন্দু মন্দির বলে দাবি নতুন নয়। গত শতাব্দীর শেষভাগে পুরুষোত্তম নাগেশ ওকের লেখার মাধ্যমে এই ধারণা জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের বৃহৎ অংশ দীর্ঘ দিন ধরেই এই তত্ত্বকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেনি। তাঁদের মতে, এই দাবির পক্ষে যে-যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তার অধিকাংশই ভাষাগত অনুমান এবং প্রমাণবিহীন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, সম্রাট শাহজাহানের আমলে তাজমহল নির্মাণের পক্ষে সমসাময়িক দলিল, মুঘল প্রশাসনিক নথি, বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ, স্থাপত্য বিশ্লেষণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা- সব মিলিয়ে বিস্তৃত তথ্যভিত্তি রয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনও বৈজ্ঞানিক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে তাজমহলের নীচে মধ্যযুগীয় হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবু এই বিতর্ক বারবার ফিরে এসেছে।
সমালোচকদের মতে, এগুলি অনেক সময় রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত বিতর্ককে উসকে দেওয়ার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। অতীতে জ্ঞানবাপী বা মথুরা সংক্রান্ত মামলায় একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। রায় যাই হোক, কিন্তু বিচার-বিতর্ক চলার সময়ে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ থেকে আমাদের মুক্তি মেলে না।
এখানেই বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা নির্মাণ আদালতের কাজ নয়। তাদের কাজ আইনের ভিত্তিতে কোনও দাবির গ্রহণযোগ্যতা বিচার করা। যদি কোনও মামলায় পর্যাপ্ত প্রাথমিক প্রমাণ বা আইনগত ভিত্তি না-থাকে, তবে তা খারিজ করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। একই সঙ্গে, নতুন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ সামনে এলে আদালত তার মূল্যায়নও করতে পারে।
অর্থাৎ, বিচারব্যবস্থাকে একদিকে উন্মুক্ত থাকতে হবে, অন্যদিকে ভিত্তিহীন, বা অনুমাননির্ভর দাবিকে আইনি স্বীকৃতির পথে অযথা এগিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। ইতিহাস নিয়ে গবেষণা চলতেই পারে, নতুন তথ্যও সামনে আসতে পারে। কিন্তু সেই গবেষণার ভিত্তি হতে হবে প্রমাণ, পদ্ধতিগত অনুসন্ধান এবং অ্যাকাডেমিক সততা। ইতিহাসকে আদালতের মাধ্যমে রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত সংঘাতের ময়দানে পরিণত করলে লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। 'তাজমহল বিতর্ক' তাই কেবল একটি স্মৃতিসৌধকে ঘিরে নয়; এটি আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, ইতিহাসচর্চা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা।
