shono
Advertisement
Taslima Nasrin

তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ ইসলামি ফতোয়া মেনে বঙ্গের সংস্কৃতিচর্চার অবসান

লেখকের স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠাকেই চিহ্নিত করবে তসলিমার এরাজ্যে প্রত্যাবর্তন।
Published By: Biswadip DeyPosted: 10:59 AM Jul 21, 2026Updated: 11:03 AM Jul 21, 2026

প্রায় দু’-দশক পরে বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন কলকাতায় ফিরছেন। তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে লেখকের স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে ইসলামি ফতোয়া মেনে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিচর্চার অবসান। লিখেছেন মোহিত রায়।

Advertisement

সদ্য কলেজে ওঠা এক তরুণী একটা-দুটো কবিতা লিখে ফেলেছে, সলজ্জভাবে বন্ধুদের জানিয়েছে লিট্‌ল ম্যাগাজিনে তার লেখা বেরিয়েছে, আর এবার বইমেলায় একজন কবির সঙ্গে দেখা করবেই– যঁার কবিতা তাকে নারীদের জগৎকে নতুন করে দেখিয়েছে। না, সেবার বইমেলায় সেই কবি এলেন না, শোনা গেল– তঁাকে সিপিএম তাড়িয়ে দিয়েছে। সেই তরুণী এখন ঘরনি, খুব একটা কবিতা আর লেখা হয়নি, কিন্তু একজন কবিকে এভাবে নির্বাসন দেওয়া মেনে নেননি। দশম শ্রেণির ছাত্রী, তঁার প্রিয় কন্যাকে নিয়ে তিনি এবার যাবেন তসলিমার আগমন অনুষ্ঠানে। ভাবা যায় প্রায়, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রতিবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে দু’টি প্রজন্মকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল বামপন্থীরা! পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশে পরিবর্তনের সূচনা তখন থেকেই।

‘লজ্জা’ উপন্যাস নিয়ে এত হইচই! বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত তসলিমা নাসরিন। সেই বই প্রথম হাতে পেয়ে চমকে উঠল সদ্য কলেজে ঢোকা, বিপ্লবী ছাত্র। এত আবেগের বাংলাদেশে এভাবে চলে হিন্দুদের উপর অত্যাচার, অথচ পশ্চিমবঙ্গে কেউ কোথাও কিছু লেখে না, বলে না। ইসলামি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সতত সোচ্চার এহেন তসলিমা নাসরিনকে রাখা যে বিপজ্জনক, তা বাংলাদেশের মৌলবাদীদের মতো পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম বুঝেছিল। তারা তসলিমার বই ‘নিষিদ্ধ’ করল, কলকাতা পুলিশের বড়কর্তাদের পাঠিয়ে নিয়মিত রাজ্য ছাড়ার হুমকি দিতে থাকল, এবং শেষ পর্যন্ত ২১ নভেম্বর ২০০৭– ইসলামি মৌলবাদী নেতা-কর্মীদের দিয়ে শহরে একটি হিংসাত্মক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি তসলিমাকে একবস্ত্রে কলকাতা থেকে বিতাড়িত করে হঁাপ ছেড়ে বঁাচল। তসলিমার বিরুদ্ধে একেবারে সইসাবুদ করে বই ‘নিষিদ্ধ’ করতে সরকারকে সমর্থন করেছিলেন একদল প্রতিষ্ঠিত লেখক-শিল্পী। সেদিন থেকে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়ে গেল একবারে শরিয়ত-মান্য বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রতিবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে দু’টি প্রজন্মকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল বামপন্থীরা! পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশে পরিবর্তনের সূচনা তখন থেকেই।

কয়েক বছর পর সরকারে এল তৃণমূল কংগ্রেস, তাদের প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল ক্ষমতায় থাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশে পরিণত করা। ফলে তসলিমার ফেরার কথা আর ভুলেও কেউ বলল না, জলের উপর পানি ঢালতে থাকলেন বাম লিবারেল বিদ্বজ্জনগণ।
৪ মে ২০২৬। পশ্চিমবঙ্গের হুঁশ ফিরল, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে সরকারে এল নতুন সরকার, যারা মনে করিয়ে দিল– পশ্চিমবঙ্গ ‘হিন্দু হোমল্যান্ড’, সনাতনি বহুত্বের সংস্কৃতির স্থান। ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালিত হল, বিদ্যালয়ে মহাবিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হল শ্যামাপ্রসাদ চর্চা। মুক্ত চিন্তার, মৌলবাদী হিংসা-মুক্ত পশ্চিমবঙ্গে থাকতেই তো একদা এসেছিলেন তসলিমা নাসরিন। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে কয়েক বছর বিদেশের অনেক দেশে ভেসে বেড়িয়েছেন তসলিমা। তারপর থাকতে এসেছিলেন তথাকথিত বাম লিবারেল পশ্চিমবঙ্গে। এবার নতুন পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২০ বছর পর তসলিমা ফিরছেন কয়েকটি নাগরিক গোষ্ঠীর আমন্ত্রণে। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক জগতের এক কলঙ্কের ইতিহাসের অবসান হল।

একটি সাক্ষাৎকারে সিপিএমের অন্যতম শীর্ষ নেতা বলেছেন– তসলিমা ‘বিদেশি নাগরিক’– সেজন্য তসলিমা পশ্চিমবঙ্গে থাকবেন কি না– তা ঠিক করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার, সুতরাং তসলিমা বিতাড়নের দায় কেন্দ্রীয় সরকারের। কুযুক্তি আর কাকে বলে? হঠাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের কি দায় পড়েছিল তসলিমাকে বিতাড়নের? আর তখন তো বাংলায় ডাব্‌ল ইঞ্জিন সরকার, মনমোহন সিংয়ের কেন্দ্রীয় সরকার তো চলছিল বামপন্থীদের সমর্থনেই। তাছাড়া, বামপন্থীরা কি তখন কেন্দ্রীয় সরকরের এহেন লেখকের স্বাধীনতা-বিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কিছু বলেছিলেন? ওই শীর্ষ নেতা আরও নিম্ন স্তরে নেমে বলেছেন– তসলিমা ‘অনুপ্রবেশকারী’ নন তো? উচ্চশিক্ষিত এই নেতা ভালভাবেই জানেন ‘বৈধ’ ভিসা নিয়ে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক ভারতে বিভিন্ন কারণে আছেন। তা স্বাভাবিক। আসলে, এ মন্তব্য লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের উসকানোর প্রচেষ্টা মাত্র।

ইসলামি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সতত সোচ্চার এহেন তসলিমা নাসরিনকে রাখা যে বিপজ্জনক, তা বাংলাদেশের মৌলবাদীদের মতো পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম বুঝেছিল। শেষ পর্যন্ত ২১ নভেম্বর ২০০৭– ইসলামি মৌলবাদী নেতা-কর্মীদের দিয়ে শহরে একটি হিংসাত্মক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি তসলিমাকে একবস্ত্রে কলকাতা থেকে বিতাড়িত করে হঁাপ ছেড়ে বঁাচল।

ইতিহাস বিকৃত করা বামপন্থীদের ধর্ম। তসলিমা বিতাড়নের দায় এড়াতে পার্টির একজন খ্যাতনামা নেত্রীর বক্তব্য– ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বরে দাঙ্গা করেছিল তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম নেতারা। প্রত্যেকে জানেন, সিপিএমের ভরা জমানায় এই হিংসার নেতৃত্বে ছিলেন সিপিএমের বর্তমান শীর্ষ মুসলিম নেতা। আর-একজন পার্টির আনুকূল্যে বনে যাওয়া বড় উকিলবাবু বলে দিয়েছেন– তসলিমা নাসরিন আরএসএস এবং বিজেপি। সম্প্রতি, খাদ্যাভ‌্যাস পাল্টানোয় তিনি মুখে যা আসে, তাই বমন করে দেন।

যাই হোক, এসবের তোয়াক্কা না করে তসলিমা নাসরিন আসছেন। যঁঁারা আমন্ত্রণ করে আনছেন তসলিমাকে, তঁারাও ওই নেত্রীর অভিযোগ-বিন্দুতে। আসলে, ২০ বছর ধরে যঁারা একক দেওয়ানি বিধির দাবিতে লড়ে যাচ্ছেন– তঁাদের বাল্যবিবাহ, তালাক, বহুবিবাহ সমর্থনকারী বামপন্থীরা চিনবেন কী করে? বাংলাদেশের নিপীড়িত হিন্দু, বৌদ্ধ ও উদ্বাস্তুদের জন্য কয়েক দশক লড়াই করে যাচ্ছেন যঁারা– অনুপ্রবেশের মদত দেওয়া মানুষেরা তঁাদের চিনবেন কী করে? সনাতনি সংস্কৃতির পক্ষে যে আইনজীবী লড়ে যাচ্ছেন, তঁাকেই বা কী করে চিনবেন ফতোয়াপ্রেমীরা?

তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের দুই দশকের কালিমালিপ্ত অতীতের অবসান। তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে লেখকের স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে ইসলামি ফতোয়া মেনে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিচর্চার অবসান। তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে বাংলাদেশের নিপীড়িত হিন্দু ও বৌদ্ধদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সমর্থন। তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে মুসলমান মহিলাদের স্বাধিকার আন্দোলনের অগ্রগতি। তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসা সংস্কৃতির অবসানের পক্ষে প্রতিবাদ আরও সোচ্চার হওয়া। তসলিমার ‘প্রত্যাবর্তন’ মানে বাম লিবারেল সেকুলারদের দিবা অবসান। হ্যঁা, তিনি আসছেন।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement