আজ, ১৫ জুলাই থেকে, যুক্তরাজ্যে ভারতের প্রায় সব রফতানি পণ্য শুল্কমুক্তির সুবিধা পাবে। যুগান্তকারী 'সিইটিএ' কার্যকর হওয়ার ফলে কৃষক, মৎস্যজীবী, শ্রমিক, নারী উদ্যোগপতি, পেশাজীবী ও তরুণদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এমন সব সুযোগ সৃষ্টি করবে- আমাদের দেশের প্রতিটি প্রান্তের প্রতিটি ভারতীয়কে স্পর্শ করবে। লিখছেন, পীযূষ গোয়েল (কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী)।
আজ, ১৫ জুলাই থেকে, যুক্তরাজ্যে ভারতের প্রায় সব রফতানি পণ্য শুল্কমুক্তির সুবিধা পাবে। যুগান্তকারী ‘সর্বাত্মক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি’ (‘কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ বা ‘সিইটিএ’) কার্যকর হওয়ার ফলে আমাদের ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষক, মৎস্যজীবী, উদ্ভাবক, নারী এবং শ্রমনিবিড় শিল্পক্ষেত্রে বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এটি ভারতের সবচেয়ে সর্বাত্মক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (‘ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ বা ‘এফটিএ’)– যা বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। পাশাপাশি, ধীরে ধীরে ভারতীয় উৎপাদকদের সুস্থ প্রতিযোগিতার সম্মুখীন করবে, যার ফল হিসাবে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উন্নতমানের পণ্য পেয়ে সাধারণ নাগরিকরা উপকৃত হবে। এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর মিশনকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা উচ্ছ্বাসিত। যুক্তরাজ্যে পণ্যসম্ভার পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। রত্ন ও গয়না রফতানিকারীদের ধারণা, আগামী ৩ বছর বা তারও কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাজ্যে তাঁদের রফতানির পরিমাণ ২৩০ শতাংশ বেড়ে ২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। অন্যদিকে, কারিগরি পণ্য রফতানিকারীদের আশা, আগামী ৪-৫ বছরে যুক্তরাজ্যে তাঁদের বিক্রির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৭.৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মারের উপস্থিতিতে গত বছর স্বাক্ষরিত এই পারস্পরিক লাভজনক চুক্তিটি প্রায় ৯৯ শতাংশ শুল্ক-শ্রেণিভুক্ত পণ্যের উপর থেকে শুল্ক তুলে নিয়েছে– যা মোট বাণিজ্য মূল্যের প্রায় ১০০ শতাংশের আওতাভুক্ত। এর ফলে ভারতীয় পণে্যর রফতানির জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা সত্ত্বেও ইতিমধ্যেই বেশ ভাল হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সতেজ মন, আন্তর্জাতিক অন্বেষণ
জনকেন্দ্রিক এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি (‘এফটিএ’) আজকের তারিখে কার্যকর হচ্ছে। এই দিনটি ‘বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস’ হিসাবেও পালিত হয়ে থাকে। ২০১৫ সালের এই দিনেই প্রধানমন্ত্রী মোদি ‘স্কিল ইন্ডিয়া মিশন’ চালু করেছিলেন। মিশনটি আমাদের তরুণদের বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে, অবদান রাখতে এবং নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম করে তুলছে। ভারতের তরুণদের সুবিধার্থে যুক্তরাজ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে তাদের অন্যতম সর্বাত্মক পরিষেবার অঙ্গীকার প্রদান করেছে। এর আওতায় রয়েছে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত প্রধান পরিষেবা ক্ষেত্র এবং ১৩৭টি উপক্ষেত্র, যেগুলির সঙ্গে রফতানি স্বার্থ জড়িত। সম্প্রসারিত বাজারের সুবিধা এবং নীতি-নিয়ম সংক্রান্ত নিশ্চয়তা বিভিন্ন কাজ– যেমন: আইটি ও আইটি-নির্ভর পরিষেবা; আর্থিক, পেশাগত, স্বাস্থ্য ইতাদি পরিষেবা; শিক্ষা, কারিগরি, টেলিযোগাযোগ এবং পরামর্শদান সংক্রান্ত পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ভারতীয় সুবিধা প্রদানকারীদের সহায়তা করবে।
'সিইটিএ'-র একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল: 'ডাবল কন্ট্রিবিউশন কনভেনশন'। 'সিইটিএ'-র পাশাপাশি কার্যকর হতে যাওয়া এই যুগান্তকারী ব্যবস্থার ফলে, যুক্তরাজ্যে সাময়িক কাজের জন্য নিযুক্ত ভারতীয় কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের আর দ্বৈত সামাজিক সুরক্ষার রক্ষাকবচ দিতে হবে না।
কর্মসংস্থান
বাজারের সুযোগ-বৃদ্ধির ফলে রত্ন ও গয়না, বস্ত্র, চামড়া ও জুতো, জৈব রাসায়নিক, প্লাস্টিক, গাড়ির যন্ত্রাংশ, হস্তশিল্প এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রগুলির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে, ফলে তরুণরা আরও বেশি কাজের সুযোগ পাবে। সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খলে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ‘সিইটিএ’ ভারতীয় তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সুযোগ প্রদান করব। এর ফলে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থবহ ভূমিকা পালন করতে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হবে। ‘সিইটিএ’-র একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল: ‘ডাবল কন্ট্রিবিউশন কনভেনশন’ বা দ্বৈত অবদান সংক্রান্ত চুক্তি। ‘সিইটিএ’-র পাশাপাশি কার্যকর হতে যাওয়া এই যুগান্তকারী ব্যবস্থার দরুন যুক্তরাজ্যে সাময়িক কাজের জন্য নিযুক্ত ভারতীয় কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের আর দ্বৈত সামাজিক সুরক্ষার রক্ষাকবচ দিতে হবে না। বিদেশে সাময়িক দায়িত্ব পালনরত কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা অব্যাহত থাকার ফলে ৭৫ হাজারেরও বেশি ভারতীয় পেশাজীবী এবং ৯০০-র বেশি কোম্পানি উপকৃত হবে বলে আশা।
স্থানীয় উৎপাদন, বিশ্ববাজারে বিক্রি
৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারের যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশাধিকারের ফলে ভারতীয় কৃষকরা উপকৃত হবে। এতে ভারতের দুগ্ধজাত পণ্য, চা, কফি, মশলা, ফলমূল, শাকসবজি, ফলের রস, মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়বে। যুক্তরাজ্যের কৃষি-আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই ভারতের জন্য শুল্কমুক্ত থাকবে। বিশাল এই বাজারে রফতানি আগামী ৩ বছরে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কৃষকদের আয় বাড়াবে এবং কৃষি-মূল্য শৃঙ্খল জুড়ে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়– এই চুক্তিতে দুগ্ধজাত পণ্য, শাকসবজি, আপেল, ভোজ্য তেল, ওটস, মিলেট ও রান্নার তেলের মতো সংবেদনশীল কৃষিপণ্যগুলিকে ‘সংবেদনশীল তালিকা’-র অন্তর্ভুক্ত করে সেগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যকে কোনও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়নি। এই পণ্যগুলিকে আওতামুক্ত রাখার বিষয়টি খাদ্য নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের দামের স্থিতিশীলতা এবং প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে মোদি সরকারের কৌশলেরই প্রতিফলন।
‘এসএমই’
নরেন্দ্র মোদি সর্বদা ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন। ‘সিইটিএ’-তে এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্ষেত্রে সহায়তার জন্য একটি বিশেষ অধ্যায় রাখা হয়েছে; ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে ভারতের মোট রফতানিতে এই ক্ষেত্রের অবদান ছিল ৪৫.৮ শতাংশ। দ্রুততর শুল্ক প্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা ও কাগজমুক্ত বাণিজ্যকে স্বীকৃতি ও সহজতর করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানের মাধ্যমে ‘সিইটিএ’ এই শিল্পগুলিকে সাহায্য করবে। অগ্রাধিকারমূলক বাজারের সুবিধা ছাড়াও, নানা ধরনের ‘এসএমই’ বাণিজ্য, শিক্ষা ও অর্থায়ন, ডিজিটাল দক্ষতা, ব্যবসায়িক পরিকাঠামো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম কর্মপদ্ধতি বিষয়ক বর্ধিত সহযোগিতার সুফল পাবে।
মৎস্যজীবীদের সাফল্য
‘সিইটিএ’ ভারতের মৎস্য ও জলজ চাষ ক্ষেত্রের উল্লেখযোগ্য উপকারে আসতে চলেছে। এই ক্ষেত্রটি প্রায় ২ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের জীবিকার সংস্থান করে। বর্ধিত বাজারের সুবিধা এবং বর্ধিত রফতানি অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাত, কর্নাটক, ওড়িশা ও মহারাষ্ট্রের মৎস্যজীবীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। এটি কেবল ভারতের মৎস্য রফতানিকে শক্তিশালী করবে না, বরং মৎস্যজীবীদের কল্যাণ ও জীবিকার ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা নেবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
নারীদেরও জয়
ঐতিহ্যবাহী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির গণ্ডি অতিক্রম করা এই যুগান্তকারী চুক্তিটি সুস্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনে নারীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। লক্ষ্য: নারীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ ও সুবিধা বৃদ্ধি। উভয় দেশই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর লক্ষ্য– বাজার ও উদীয়মান ক্ষেত্রগুলিতে নারীদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সাক্ষরতার প্রসার ঘটানো, কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং তাদের ক্ষমতা ও দক্ষতার উন্নতি ঘটানো।
‘সিইটিএ’ কেবল শুধুমাত্র বাণিজ্য চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি ভারতের সক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি আস্থার এক বহিঃপ্রকাশ। এটি এমন এক নতুন ভারতের প্রতিফলন, যা বিশ্ববাণিজ্যে কেবল অংশগ্রহণই করছে না, বরং তা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করছে। আমাদের কৃষক, মৎস্যজীবী, শ্রমিক, নারী উদ্যোক্তা, এমএসএমই, পেশাজীবী ও তরুণদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এটি এমন সব সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা দেশের প্রতিটি প্রান্তের প্রতিটি ভারতীয়কে স্পর্শ করবে।
