shono
Advertisement
CBI

সিবিআইকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার! সমর্থন করা যায় না

দুর্নীতি সমর্থনযোগ্য নয়। তবে দুর্নীতিকে মূলধন করে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেল কি সমর্থনযোগ্য?
Published By: Biswadip DeyPosted: 05:33 PM Jan 15, 2026Updated: 07:39 PM Jan 15, 2026

প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং দপ্তরে তল্লাশি চালায় ইডি। চলেছে মিডিয়া ট্রায়াল। ইডির জুজু দেখিয়ে বিজেপি নেতারা শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সারা দেশ জুড়ে প্রতিপক্ষের কাছে আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করছে। সিবিআইকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না।‌ দুর্নীতি সমর্থনযোগ্য নয়। তবে দুর্নীতিকে মূলধন করে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেল কি সমর্থনযোগ্য? লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল

Advertisement

রাজীব গান্ধীকে তখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। ক্ষমতার কুর্সিতে আসীন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। সেবার লোকসভা নির্বাচন ‘বোফর্স’ নামক এক শব্দব্রহ্মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে দেখেছিলাম। বিশ্বনাথ প্রতাপ দাবি করেছিলেন, বোফর্সের সমস্ত সত্য তিনি উদ্‌ঘাটন করবেন। প্রমাণ করে দেবেন যে, রাজীব গান্ধী বোফোর্স কেলেঙ্কারিতে ঘুষ খেয়েছেন। দেশের অলিতে-গলিতে মুখরিত হয়েছিল একটি স্লোগান– ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়,/ রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।’

আমরা কতিপয় সাংবাদিক তখন নিয়মিত সিবিআইয়ের সদর দপ্তরে যেতাম।‌ তখনও সিবিআই দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিয়ে এত নিষেধাজ্ঞার লালবাতি ছিল না।‌ আমরা উপরে উঠে সিবিআইয়ের মুখপাত্রর ঘরে দীর্ঘ সময় আড্ডা মারতাম। সিবিআইয়ের মুখপাত্র তখন ছিলেন এসএম খান। পরবর্তী কালে যিনি রাষ্ট্রপতি আবদুল কালামের মিডিয়া উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আমরা প্রশ্ন করতাম– ‘সিবিআই তদন্ত কত দূর এগল? রাজীব গান্ধী ঘুষ খেয়েছেন– এ প্রমাণ পাওয়া গেল?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। উত্তরে সিবিআই মুখপাত্র বলতেন, ‘তদন্ত চলছে। আশা করি আমরা দ্রুত এই তদন্তের নিষ্পত্তি করব। বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন।’‌ রাজীব গান্ধী চুরি করেছেন কি করেননি, সে-ব্যাপারে তদন্তের স্টেটাস জানতে চাইলে মুখপাত্র বলতেন, ‘উই আর নট রুলিং আউট এনি পসিবিলিটি।’ এইটুকু শুনেই আমরা লাফাতে লাফাতে অফিসে ফিরে আসতাম। আমাদের সেদিনের স্টোরি তৈরি! সিবিআই তদন্ত চলছে।‌

তদন্ত চলার সময় সিবিআই সংবাদমাধ্যমকে কোথায় ‘রেড’ করছে, কখন ‘রেড’ করছে, কীভাবে ‘রেড’ করছে– এসব জানায় না। পূর্ণ তদন্তের রিপোর্ট জানার আগেই আংশিকভাবে তল্লাশির খবর প্রচারিত হলে বিশেষত রাজনৈতিক নেতা বা দলের তদন্তের ক্ষেত্রে সেটি প্রতিপক্ষের নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।‌

ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সিবিআই খারিজ করছে না! শুধু সিবিআইয়ের একটি অ্যাডভাইজরি ছিল আমাদের, সাংবাদিকদের উপর। আমরা সিবিআইয়ের কাউকে ‘কোট’ করতে পারব না। এমনকী, মুখপাত্রকেও নয়। আমাদের বলতে হবে– সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে। আমাদের বলতে হবে– সিবিআই দাবি করছে।
এরপর বহু বছর কেটে গেল। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হল।‌ মণ্ডল এবং কমণ্ডলুর লড়াই। রাজীব গান্ধী বোফর্স চুক্তিতে ঘুষ খেয়েছিলেন– তা কিন্তু প্রমাণিত হয়নি, এখনও। সিবিআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ অফিসার শান্তনু সেন বলেছিলেন– সিবিআইয়ের তদন্তের পদ্ধতি হওয়া উচিত covert, overt নয়। তদন্ত হয়ে যাওয়ার পর আদালতে যখন সিবিআই চার্জশিট দাখিল করবে, তখন সেই চার্জশিট প্রয়োজনে প্রকাশ্যে আনা যেতে পারে। কিন্তু তদন্ত চলার সময় সিবিআই সংবাদমাধ্যমকে কোথায় ‘রেড’ করছে, কখন ‘রেড’ করছে, কীভাবে ‘রেড’ করছে– এসব জানায় না। পূর্ণ তদন্তের রিপোর্ট জানার আগেই আংশিকভাবে তল্লাশির খবর প্রচারিত হলে বিশেষত রাজনৈতিক নেতা বা দলের তদন্তের ক্ষেত্রে সেটি প্রতিপক্ষের নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।‌ এমনকী নির্বাচন না থাকলেও প্রমাণ ছাড়া খবর হলে রাজনৈতিক দলগুলো কাদা ছোড়াছুড়ি করার সুযোগ খুঁজে পায়।

প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত অরুণ জেটলি আমাকে বলেছিলেন, আগে অর্থমন্ত্রীর অধীনে এনফোর্সমেন্ট আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে নিজের মতো করে তদন্ত করত। আর, সিবিআই ফৌজদারি দুর্নীতি নিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত করত। পরবর্তী কালে নরেন্দ্র মোদির সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, এনফোর্সমেন্টের যে কোনও তদন্তে সিবিআইয়ের সহায়তা নেওয়া হবে। সিবিআইও যে কোনও তদন্তে এনফোর্সমেন্টের সহায়তা নেবে! কারণ? যে কোনও আর্থিক দুর্নীতিতে ফৌজদারি ইস্যু জড়িয়ে থাকে।‌ আবার সিবিআইয়ের যে কোনও ক্রিমিনাল মামলায় আর্থিক দুর্নীতি দেখতে পাওয়া যায়। এই কাণ্ডজ্ঞান থেকে মনে হয় যে, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত।‌

ইলেকট্রনিক চ্যানেলের একজন সক্রিয় সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, ‘ইডি আগাম জানিয়ে দিলে আমরা আমাদের ক্যামেরা নিয়ে ফিল্ডিং সাজিয়ে নিই।‌ আমরা, সাংবাদিকরা ইডির এই জানিয়ে দেওয়া পছন্দ করি।‌ কারণ আমাদের আর খবর খুঁজতে যেতে হয় না। আমাদের কোনও পরিশ্রম করতে হয় না।

কিন্তু নির্বাচনের মুখে কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে যখন ইডি হানা দেয়, তখন তার কয়েক ঘণ্টা আগে ক্যামেরাম্যান এবং সাংবাদিকদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ‘ওই বাড়িতে আমরা আসছি’! ইডি পৌঁছনোর আগেই সাংবাদিকরা পৌঁছে যায়– তখন মনে হয়– এটি তদন্ত নয়। এটি রাজনীতি।‌ ইলেকট্রনিক চ্যানেলের একজন সক্রিয় সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, ‘ইডি আগাম জানিয়ে দিলে আমরা আমাদের ক্যামেরা নিয়ে ফিল্ডিং সাজিয়ে নিই।‌ আমরা, সাংবাদিকরা ইডির এই জানিয়ে দেওয়া পছন্দ করি।‌ কারণ আমাদের আর খবর খুঁজতে যেতে হয় না। আমাদের কোনও পরিশ্রম করতে হয় না।

ইডি, সিবিআই আমাদের ট্রেতে করে খাবার সাজিয়ে দেয়।’ এবার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং দফতরে ইডি তল্লাশি চালাতে যাবে– সেটা কিন্তু covert অপারেশন ছিল না! টিভির পর্দায় আমরা তাদের অভিযান ‘লাইভ’ দেখছি। সম্ভবত এই পদ্ধতিকেই বলা হয় ‘মিডিয়া ট্রায়াল’। সংবাদমাধ্যম ঠিক করে দেয়– কে সৎ, কে অসৎ, কে দোষী, কে নির্দোষ। এমনকী, ইডির রেড হওয়ার আগেই অনেক সময় দেখা যাচ্ছে বিজেপি নেতারা বলে দিচ্ছেন অমুক নেতার বাড়িতে এবার ইডি যাবে। ইডির জুজু দেখিয়ে বিজেপি নেতারা শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, দেশ জুড়ে প্রতিপক্ষ শিবিরের কাছে আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করছে।

আমি এতক্ষণ যে আমার অভিজ্ঞতার কথা লিখলাম, তার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমি সিবিআই প্রতিষ্ঠানটিকে তুলে দেওয়ার পক্ষে। জওহরলাল নেহরুর সময় ’৬৩ সালে প্রতিষ্ঠা। কিন্তু নেহরু ৬৪ সালে চলে গেলেন। দুর্নীতি দমনের জন্য একটি পৃথক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্রনায়করা অনুভব করেছিলেন। দুর্নীতি সেদিনও ছিল। এখনও আছে। দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারির টাকার অঙ্কের পরিমাণ হয়তো বেড়েছে। বেড়েছে দুঃসাহস।‌ ‘সমাজ’ নামক পিরামিডের শিখর থেকে শেষ স্তর পর্যন্ত দুর্নীতিরও গণতান্ত্রিকরণ হয়েছে। দুর্নীতি আরও বিকেন্দ্রীভূত হচ্ছে। কিন্তু সিবিআইকে ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হিসাবে ব্যবহার করা সমর্থন করা যায় না।‌ দুর্নীতি সমর্থনযোগ্য নয়। দুর্নীতিকে মূলধন করে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেলও কি সমর্থনযোগ্য? বাবু জগজীবন রামের বিরুদ্ধে জীবনবিমা কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছিল। টাকার পরিমাণ ছিল অনেক অল্প। ইন্দিরা গান্ধী সেই ফাইলটি তঁার ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলেন।‌ বাবু জগজীবন রামকে সেই ফাইল দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এই দেখো, তোমার ব্যাপারে এসব রিপোর্ট এসেছে। একটু সাবধানে থেকো।’

বাবু জগজীবন রামের বিক্ষুব্ধ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এটিই ছিল যথেষ্ট। কৃষ্ণ মেননের মতো প্রতিরক্ষা ন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল নেহরুর যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও।‌ তঁাকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। পরে অবশ্য আবার মন্ত্রিসভায় ফিরে এসেছিলেন। প্রয়াত সমাজবাদী পার্টির নেতা অমর সিং একবার বলেছিলেন, ‘আপনাকে একবার যদি সিবিআই ছুঁয়ে ফেলে, তাহলে সেই ফাইল বন্ধ হয় না।‌ সেই ফাইল অগ্রাধিকার পাবে কি পাবে না, সেটা আলোয় আসবে কি আসবে না, কতটা প্রচারিত হবে– এগুলো নির্ধারিত হবে শাসক প্রভুর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কীরকম থাকছে, তার উপর। মুলায়ম সিং যাদবের সিবিআই তদন্তসমূহ মেটানোর ব্যাপারে অমর সিং খুব সক্রিয় ছিলেন। মুলায়ম সিংয়ের আয়ুর্বেদ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে মায়াবতীর তাজ-করিডরের মামলা– সবেতেই রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেল অব্যাহত ছিল।

যদি কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি থাকে, সিবিআই যদি সেই দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারে আদালতের সামনে, তবে তাকে গ্রেফতার করা হোক। শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া অভিযোগপত্র তৈরি করে সেটি সংবাদমাধ্যমকে খাইয়ে দিয়ে ভোটের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনৈতিক।‌ আর, সেই কাজটাই কিন্তু এখনও হয়ে চলেছে। নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বিরুদ্ধে, কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকার সময়, যদি সেই ধরনের ‘ব্ল্যাকমেলিং তদন্ত’ অন্যায়ভাবে হয়ে থাকে, আর সেটা কংগ্রেস করে থাকে, তবে সেক্ষেত্রেও কংগ্রেস গর্হিত অন্যায় করেছিল।‌ সেদিন বিজেপি সিবিআইয়ের নাম দিয়েছিল ‘কংগ্রেস ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’। আর, কংগ্রেস করেছিল বলেই কি এখন বিজেপি একই অন্যায় করবে যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠের দল বিজেপি তাই? সেদিনের সিবিআই যদি ‘কংগ্রেস ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন হয়ে থাকে, তবে এখন ‘বিবিআই’– মানে– ‘বিজেপি ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনে’-এ সেটির পরিণতি পাওয়া গণতন্ত্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।

লালকৃষ্ণ আদবানিকে যখন উপপ্রধানমন্ত্রী করা হল, ক্যাবিনেট সচিব বিজ্ঞপ্তি জারি করে বললেন যে, আদবানির পোর্টফোলিওতে পার্সোনাল এবং পাবলিক গ্রিভেন্সও থাকবে। যেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পাশাপাশি উপপ্রধানমন্ত্রীর কাছে থাকবে। সেদিন আমি আদবানির সামনে বসে ছিলাম। তঁার কাছে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব কমল পান্ডে এসে ফাইলটি দিলেন। আদবানি তা পড়ে কমল পান্ডেকে দিয়ে বলেছিলেন– পাবলিক গ্রিভেন্সেস থাক, কিন্তু পার্সোনাল দফতরটা আমি নেব না। কারণ, অযোধ্যার মামলায় এখনও চার্জশিটের খঁাড়া আমার উপরে ঝুলছে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি না হলেও যখন রাজনৈতিক ইস্যুতে চার্জশিট আছে, তখন এই দায়িত্ব নেওয়া অনৈতিক হবে। বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ব্রজেশ মিশ্রের সঙ্গে কমল পান্ডে কথাও বলেনচিলেন সবিস্তার। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, মতাদর্শ যাই হোক, রাজধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সততা এখনও মূল্যবান। হালে বিজেপি যা করছে সেটি দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান না ভোটের আগে কালি ছেটানো? আমজনতার কাছে নেতা ও দলের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করা?
‘ইয়ে পাবলিক হ্যায়’– সব জানে পাবলিক!

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement