shono
Advertisement
Burrabazar

জতুগৃহ হয়ে উঠছে বড়বাজার? ভাবলে ভয় হয়

জতুগৃহ হয়ে উঠছে কি ত্রিপলে আশ্রিত, প্লাস্টিকে আবৃত, তারের জালে আচ্ছাদিত কলকাতার বড়বাজার? ভাবলে ভয় হয়!
Published By: Biswadip DeyPosted: 05:26 PM Feb 01, 2026Updated: 05:26 PM Feb 01, 2026

সম্প্রতি, ঘটে যাওয়া নাজিরাবাদ অগ্নিকাণ্ড বীভৎসতায় প্রায় নজিরবিহীন। ইতিমধ্যে ২৭টির বেশি দগ্ধ-দেহ উদ্ধার হয়েছে। এবং আগুনে এতটাই বিকৃত তারা, চেনার উপায় নেই। সবথেকে বড় ‘আয়রনি’– এই অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে গেল বাঙালির শখের রসনাসুখ ‘মোমো’! নাজিরাবাদ অগ্নিকাণ্ডের দগদগে স্মৃতির দহনের মধ্যেই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে চিৎপুর থানার বি টি রোডে জ্বলে উঠল দাউদাউ করে এক বাড়ি। সেই অগ্নিগ্রাস থেকে বেরতে পারেননি একজন ব্যক্তি। এমনই কপট ও বিস্তারিত জতুগৃহ ক্রমশ কি হয়ে উঠছে না ত্রিপলে আশ্রিত, প্লাস্টিকে আবৃত, তারের জালে আচ্ছাদিত কলকাতার বড়বাজার?

Advertisement

একবার বিবিধ এবং বিপুল দাহ্য পদার্থের এই পরোয়াহীন প্রসারে আগুন লাগলে সেই অচিন্ত্যনীয় ইনফারনো কত দূর ভয়ংকর হয়ে উঠবে, সে-কথা ভাবলে ঠান্ডা হয়ে যায় শিরদঁাড়া। মহাভারতে ঘুমন্ত পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারতে বারনাবতে যে-জতুগৃহ তৈরি করেছিলেন দুর্যোধন, সেই বাড়িও বোধহয় কলকাতার বড়বাজারের মতো বহ্নিবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। তার কারণ, দুর্যোধন যে-বাড়িতে পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন সেই বাড়ি ‘জতু’ অর্থাৎ লাক্ষা দিয়ে তৈরি। মহাভারতের দুর্যোধন তঁার তৈরি দাহ্যগৃহে প্লাস্টিক মেশাতে পারেননি। যদি পারতেন কী হত স্বয়ং ব্যাসদেবও কল্পনা করতে পারতেন কি?

কপট ও বিস্তারিত জতুগৃহ ক্রমশ কি হয়ে উঠছে না ত্রিপলে আশ্রিত, প্লাস্টিকে আবৃত, তারের জালে আচ্ছাদিত কলকাতার বড়বাজার? একবার বিবিধ এবং বিপুল দাহ্য পদার্থের এই পরোয়াহীন প্রসারে আগুন লাগলে সেই অচিন্ত্যনীয় ইনফারনো কত দূর ভয়ংকর হয়ে উঠবে, সে-কথা ভাবলে ঠান্ডা হয়ে যায় শিরদঁাড়া।

‘জতুগৃহ’ বললেই বহু বাঙালির নস্টালজিয়ায় ফুটে উঠবে তপন সিনহা পরিচালিত একটি বাংলা সিনেমা। ‘জতুগৃহ’। কোনও প্লাস্টিকের তঁাবুতে বা দোকানে আগুন লাগার সর্বনাশ দেখাননি তপন তঁার ছবিতে। সেই ছবির বিষয় বিবাহিত জীবনের চাপা দহন, যা তুষের আগুনের মতো পোড়ায় স্বামী-স্ত্রীকে, দাম্পত্যকে। যে-দহন সেই ‘জতুগৃহ’, যা থেকে বেরনো সহজ নয়। পথ আগলে দঁাড়িয়ে হাজার ব্যথা। বিবাহিত জীবনের দহন ও যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করাও যায় না সামাজিক লজ্জায়। সইতে হয় হাসি মুখে, সামাজিক ভাবমূর্তি বজায় রেখে, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে করতে। বড় বড় আবাসনে এমন জতুগৃহ কপট সুখের আড়াল টেনে কত যে আছে, কে জানে!

বিশ্বজুড়ে এবং বিশ্বসাহিত্যে মানব-মানবীর সহবাসের বিচিত্র জতুগৃহের অভাব নেই। এসব সম্পর্কের দহন নিয়ে নোবেলজয়ী আইরিশ কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের একটি অবিস্মরণীয় উক্তি ভুলে যাওয়া কঠিন। তিনটি শব্দে সেই জ্বলনের বর্ণনা: ‘আইস দ্যাট বার্নস’! শুধু কি আগুন পোড়ায়? সম্পর্কের শৈত্যও তো পোড়ায়। আর,
পোড়ায় ভালবেসে ভালবাসা না-পাওয়ার যন্ত্রণা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আদরের উপবাস’। আদরের উপবাসে আমরা কে না দহিত হচ্ছি? এই দহন জীবনের অঙ্গ। মুক্তির পথ আছে কি এই জতুগৃহ থেকে? এই দেশের দিকে তাকালে, পৃৃথিবীর দিকে তাকালে, যে রাজনৈতিক পরিসর আমরা দেখতে পাই, তাও তো ‘জতুগৃহ’-সম। ভাবনার মৌলিকতা, চিন্তার স্বাতন্ত্র্যকে তা পুড়িয়ে মারতে চায়। একদেশদর্শী, আগ্রাসী, স্বৈরচারী মতবাদের পৃথিবী তো স্বয়ং জতুগৃহ!

‘জতুগৃহ’ বললেই বহু বাঙালির নস্টালজিয়ায় ফুটে উঠবে তপন সিনহা পরিচালিত একটি বাংলা সিনেমা। ‘জতুগৃহ’। কোনও প্লাস্টিকের তঁাবুতে বা দোকানে আগুন লাগার সর্বনাশ দেখাননি তপন তঁার ছবিতে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement