shono
Advertisement

অনুপ্রবেশকারী, না কি শরণার্থী, এসআইআর কার জন্য?

সাতপুরুষের ভিটে যাদের গর্ব, তাদের ‘ভোটার হওয়া’-র লাইনে দাঁড়িয়ে ভাবতে হচ্ছে, এ দেশ আমার নয়!
Published By: Kishore GhoshPosted: 09:17 PM Jan 07, 2026Updated: 09:17 PM Jan 07, 2026

এসআইআর করতে গিয়ে সেই ভোটব্যাঙ্ককে সবচেয়ে বেশি ডিস্টার্ব কেন করে ফেলল বিজেপি! তাদের তো নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। রাজ্যে মতুয়া প্রভাবিত প্রায় সব আসন বিজেপির। এখন সেখানে গৃহযুদ্ধ। বিজেপি নেতারা প্রশ্নের মুখে। সিএএ থেকে নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তাতে হাওয়া দিয়েছে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন। লিখছেন কিংশুক প্রামাণিক

Advertisement

কনকনে ঠান্ডায় দীর্ঘ লাইনে ঠায় দাঁড়িয়ে শতায়ু বৃদ্ধ, সন্তানসম্ভবা বধূ, কেমোথেরাপি করে আসা ব্যাঙ্ককর্মী, মাঠে একদিনের রোজগার বন্ধ করা কৃষক! সবার উৎকণ্ঠিত মুখ। কার্যত বলা হয়েছে– আপনি যে ‘ভারতীয়’, তা কাগজপত্র দিয়ে প্রমাণ করুন। নইলে ভোটার তালিকায় নাম উঠবে না। এই ফতোয়ায় দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা একটি জাতির মনে যখন চরম হতাশা, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, ঠিক তখন ২৪ বছরের তরুণ এঞ্জেল চাকমার নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে কঁাদছে পরিবার। ত্রিপুরার চাকমা উপজাতির এই যুবক হামলাকারীদের বিশ্বাস করাতে পারেননি তিনি ভারতীয় নাগরিক। ‘চিনা’ তকমা দিয়ে তাঁকে পিটিয়ে মেরেছে দেরাদুনের স্বঘোষিত হিন্দু-মব, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের দীপু দাসের নৃশংস হত্যাকারীদের একটুও ফারাক নেই! দীপুকে অভিযোগ প্রমাণের সুযোগ না দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। অার, দেরাদুনে এমবিএ পড়তে আসা ঝকঝকে ছেলেটা তঁার ভাই মাইকেলকে রক্ষা করতে প্রাণভিক্ষা চেয়ে ধর্মান্ধ পিশাচদের বলেছিল, ‘মেরো না, বিশ্বাস করো আমরা ভারতীয় নাগরিক, বিদেশি নই, ত্রিপুরার চাকমা উপজাতির মানুষ।’

সেই সন্ত্রাসীরা ছিল বেপরোয়া। চেহারায় চিনাপ্রভাব দেখে তারা ‘নিশ্চিত’ হয় এঞ্জেল ভারতীয় নয়। বৈচিত্রের ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল বলে একটি অংশ আছে, অনিন্দ্যসুন্দর সেই ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোয় সবার চেহারার ধরন যে এঞ্জেলের মতোই, তা জানবে কী করে অজ্ঞ হিঁদুত্বভোগীর দল! মাইকেল বেঁচে যায়। ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এঞ্জেল ন’দিন জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মৃত্যুবরণ করেন।

নিষ্পাপ সেই তরুণের মুখ দেখতে দেখতে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিলাম। ‘নাগরিকত্ব’ প্রমাণের জ‌ন‌্য কি দেশে এবার গৃহযুদ্ধ লাগবে! ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের দরকার আছে, কিন্তু তার জন্য মানুষকে হতাশায় আত্মহত‌্যা করতে হবে! বেনাগরিক হওয়ার ভয়ে সব কাজ ফেলে লাইনে দঁাড়াতে হবে? অারও দেখলাম, বড়দিনের সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী যখন গির্জায় গিয়ে প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছেন, তখন দেশজুড়ে বহু স্থানে চুরমার করা হল প্রভু যিশুর জন্মের আনন্দ আয়োজন। প্রকাশে‌্য নিগ্রহ করা হল পাদরিদের। হামলাকারীদের দাবি– ভারত হিন্দুদের দেশ, এখানে যিশুপুজো চলবে না। এরপরও ময়মনসিংহের দরিদ্র পরিবারের দীপুর পুড়তে থাকা দেহ পোস্ট করে রাজনীতি করেন যারা, তারা আদতে ভাবের ঘরে চোর।
মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা’ মুছে একটা জাতিকে যখন তার ঐতিহ‌্য ভুলিয়ে ধর্মের বোরখায় ঢেকে ফেলা হচ্ছে, তখন আমরাও তালিবানিদের মতো হয়ে পড়ছি নাকি! ‘ওরা-আমরা’-র ফারাক তাহলে কী?

চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। কাগজ জমা হয়েছে, তবু বঙ্গের সাড়ে সাত কোটি ভোটারের মনে দুশ্চিন্তা, শেষ পর্যন্ত নাম থাকবে তো! কোটির অধিক মানুষকে শুনানির লাইনে ডাকা হয়েছে, তাদের কারও বাইপাস সার্জারি হয়েছে, কারও বুকে দুধের শিশু, কেউ আবার হারিয়েছে কাজ। গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের একটি মানবিক মুখ রাখতেই হয়। জনগণ প্রত‌্যাশা করে থাকে। মানুষের নির্যাতন দেখে সরকার চুপ থাকতে পারে না। কিন্তু ভুল ভোটের অঙ্কে সরকার অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র।

রাজনীতিক হিসাবে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে আমি ধুরন্ধর মনে করি। হয়তো তাঁদের স্ট্র‌্যাটেজি বাংলায় সফল হচ্ছে না, কিন্তু একের পর এক লোকসভা এবং অন‌্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন বিজেপি জিতছে এই ‘কৃষাণু বিকাশ’ জুটির তীক্ষ্ণ বুদ্ধির উপর ভর করে। এত যাঁদের বিচক্ষণতা, তাঁরা একবারও ভাবলেন না, ‘এসআইআর’ পশ্চিমবঙ্গে কার্যত হ‌্যারাসমেন্টে পর্যবসিত হয়েছে। মানুষ খেপে উঠছে। কবি, সাহিতি‌্যক, অভিনেতা, রাজনীতিকদের মতো ভিঅাইপিদেরও যখন লাইনে দঁাড়ানোর ডাক অাসে, তখন সাধারণের মনে বিশ্বাস অারও দৃঢ় হয়, এখন সবাই অাক্রান্ত।

বিধানসভা নির্বাচন যে এসঅাইঅার শেষ হলেই হবে সেটা কমিশনের তাড়াহুড়ো দেখে বোঝা যাচ্ছে। হেনস্তার জবাব দিতে ভুক্তভোগী মানুষ তৃণমূলকে ভোট দেবে কি না সেটা তাদের বিচার্য, কিন্তু বিজেপি যে নিজের গড়ে স্বস্তিতে নেই, তা স্পষ্ট। যদি হিন্দু উদ্বাস্তুরাই নাগরিকত্ব হারানোর ভয় পায়, তা হলে এই এসঅাইঅার কার জন‌্য? প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু বার বার বলতেন, বলা যায় তঁার দলকেও সতর্ক করতেন এই বলে যে– মানুষ তঁার অভিজ্ঞতার উপর দঁাড়িয়ে ভোট দেন। সেই অভিজ্ঞতার রায় ইতিহাস রচনা করে। আজকে যে মা, যে বৃদ্ধ, যে চাষি, যে কৃষক সব কাজ ফেলে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের লাইনে দঁাড়িয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে, তাদের কাছে কি বিজেপি সমর্থনের অাশা করে?

দ্বিতীয়ত, বাংলায় কোনও রোহিঙ্গা খুঁজে পায়নি নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে দেখা যায়নি কোনও ‘অনুপ্রবেশকারী’-কে। অথচ সংসদে দঁাড়িয়ে এই ‘ঘুষপেটিয়া’ তাড়াব বলে হুংকার ছেড়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলায় মুসলিম মানেই রোহিঙ্গা বলে নিদান দিচ্ছিলেন তঁারই রাজ্য নেতারা। সেই প্রেক্ষিতে যদি অনুপ্রবেশকারী খুঁজে না পাওয়া যায় তা হলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি ইস্যু বদলে দিতে পারে এসঅাইঅার।

বিজেপির অনুপ্রবেশ ইস্যু হালের নয়, জন্মলগ্ন থেকে তারা বাংলাদেশি হিন্দুদের শরণার্থী ও মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী বলে আসছে। মনে পড়ছে ১৯৯৬-’৯৭-’৯৮ সালের কথা, তৎকালীন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র রাজনৈতিক সংবাদদাতা সুমন ভট্টাচার্য, ‘বর্তমান পত্রিকা’র প্রবীর ঘোষাল, দেবাশিস দাশগুপ্ত, ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর বরুণ ঘোষের মতো সিনিয়রদের পাশাপাশি আমি, প্রসেনজিৎ বক্সি, জয়ন্ত চৌধুরী প্রমুখ অনেক তরুণ সাংবাদিক দুপুর ২টোর মধ্যে চলে যেতাম ৬ মুরলীধর লেনে বিজেপির রাজ্য দফতরে। সাংবাদিক সম্মেলনে শুনতাম ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে ব‌্যাখ‌্যা। বলা যায়, আমাদের পলিটিকাল বিট শুরু হত অনুপ্রবেশ প্রতিকারের দাবি শুনে। এর পর একে-একে রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়‌্যারে কংগ্রেস অফিস, আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএম রাজ্য দফতর, কালীঘাটে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বাড়ি, প্রয়োজনমতো প্রণব মুখোপাধ্যায়, গনি খান চৌধুরী, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির বাড়ি অথবা অশোক ঘোষ, মঞ্জু মজুমদার, ক্ষিতি গোস্বামীদের বাম শরিক দফতর ঘুরে এক ব্যাগ খবর নিয়ে সন্ধ্যায় যে যার অফিসে ঢুকতাম।

সে সব দিন আর নেই। খবর তার পথ হারিয়েছে। নেই অধিকাংশ অবিসংবাদিত রাজনৈতিক চরিত্রই। তখন বিজেপিতে তপন শিকদার, বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী, সুকুমার বন্দে‌্যাপাধ্যায়রা মুখ। প্রতিটি ব্যক্তি ছিলেন সজ্জন। দ্বিতীয় সারিতে পরশ দত্ত, রাহুল সিন্‌হা, প্রতাপ বন্দে‌্যাপাধ্যায় এবং তখনই সম্ভাবনাময় যুবনেতা শমীক ভট্টাচার্য। বিমলাদাকে ভুলি কী করে! তঁারা মনেপ্রাণে বিজেপি ছিলেন। পরের পর ভোটে জামানত জব্দ হলেও তঁারা অফিস খোলা রাখতেন। সম্প্রতি বিজেপির একটি সভায় শমীক সেই দিনের নেতাদের কথা স্মরণ করছিলেন লক্ষ করলাম। তো সেদিন থেকেই এই মুসলিম অনুপ্রবেশকারী তত্ত্ব সামনে খাড়া করে একটা মেরুকরণের ছক তৈরি করতে শুরু করে বিজেপি।

অত্যাচারে অথবা হামলার ভয়ে থাকতে না পেরে যারা ওপার বাংলা থেকে চলে এসেছে, তারা শরণার্থী হতেই পারেন। তথ্যে ভুল নেই। কার্যত সেই ভাবনার সুফল বিজেপি পেয়েছে এত দিনে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোট থেকে উদ্বাস্তু ভোট, বিশেষ করে যারা ১৯৭১ সালের পর এসেছে, তাদের সমর্থন বিজেপি পেতে শুরু করেছে। বর্ডার এলাকায় উদ্বাস্তু হিন্দুপ্রধান বিধানসভা এবং লোকসভা আসনে তাদের জয় সে সত্য প্রমাণ করে।

আশ্চর্য লাগছে, এসআইআর করতে গিয়ে সেই ভোটব্যাঙ্ককে সবচেয়ে বেশি ডিস্টার্ব কেন করে ফেলল বিজেপি! তাদের তো নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। রাজ্যে মতুয়া প্রভাবিত প্রায় সব আসন বিজেপির। এখন সেখানে গৃহযুদ্ধ। বিজেপি নেতারা প্রশ্নের মুখে। সিএএ থেকে নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তাতে হাওয়া দিয়েছে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন। অর্থাৎ এটাই দঁাড়াচ্ছে, ভোটার তালিকায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করতে গিয়ে নিজেদের প্রাচীন ইস্যুকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিলেন বিজেপি নেতারা। উদ্বাস্তু ভোটব্যাঙ্ক ঘেঁটে গেল। সাতপুরুষের ভিটে যাদের গর্ব, তাদের ‘ভোটার হওয়া’-র লাইনে দঁাড়িয়ে ভাবতে হচ্ছে, এ দেশ কি সত্যি আমার নয়! ছেলে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিলে আর একটা ঘর খুঁজে নিতে পারব, গ্রাম সমাজচু‌্যত করলে নতুন কোনও গ্রামে ঠিকানা বঁাধা যাবে, কিন্তু দেশ বেনাগরিক ঘোষণা করলে যাব কোথায়? ২০২৫-এ শুরু হওয়া নাগরিকত্বের ঘা
’২৬-এ দগদগে!

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • রাজনীতিক হিসাবে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে আমি ধুরন্ধর মনে করি।
  • অত্যাচারে অথবা হামলার ভয়ে থাকতে না পেরে যারা ওপার বাংলা থেকে চলে এসেছে, তারা শরণার্থী হতেই পারেন।
Advertisement