'বইয়ের কাছে থাকলে মনে হয় এখানেই আমার ঈশ্বর'-সম্প্রতি সাক্ষাৎকারে বলেছেন এক বাঙালি মেয়ে। ঝুম্পা লাহিড়ী। আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধির লেখক। আগে লিখতেন ইংরেজিতে। এখন লেখেন ইতালীয় ভাষায়। তাঁর সাম্প্রতিক বই, ইতালীয়তে লেখা, 'দ্য রোমান স্টোরিজ', সবে বেরিয়েছে ইংরেজি অনুবাদে।
বাঙালি মাত্রই রবীন্দ্রনাথকে ঈশ্বরজ্ঞানে পুজো করে। 'রবীন্দ্রনাথ আমার ভগবান'- এই বাণী আমরা প্রায়ই কোনও কোনও বাঙালির মুখে শুনে থাকি দ্বিধাহীন উচ্চারণে। কিন্তু এই লেখকের কোনও বই বা একগুচ্ছ বইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে কোনও বাঙালির মুখে কি শোনা যায়- 'এখানেই আমার ঈশ্বর'? এর থেকে আরও গভীর প্রশ্ন হল, বাঙালি যেমন অনর্গল আগ্রহে রবীন্দ্রপুজারি, তেমন আগ্রহে কি রবীন্দ্রপাঠক? বরং এমন কথাই তো মনে জাগে, এই 'ভগবান' লেখকের বইগুলির সন্ধানী ও গভীর পাঠে বাঙালি আর তেমনভাবে উৎসাহী নয়।
সত্যিকথা বলতে, অধিকাংশ বাঙালি এখন 'পাঠ' বলতে বোঝে নানাবিধ সামাজিক মাধ্যমে অবগাহন এবং অহর্নিশি আচ্ছন্ন মগ্নতা! পড়ুয়া বাঙালির সংখ্যা ক্রমে কমছে। এছাড়া আছে মলে-মলে বীক্ষণবিলাস। কিংবা সিনেমা। কিংবা গালগল্প কোনও ক্যাফেতে। এটাই তো আমাদের পরিচিত পরিবহে বিস্তারিত ছবি। কি পুরুষ, কি নারী, গ্রন্থসান্নিধ্যে আমাদের ধন্যতাবোধ ক্রমশ কমেছে। আমাদের বইমেলা এখন আর যে কোনও মেলার মতোই। আটপৌরে খরচে ফুর্তির ভিড়। গ্রন্থ-নিরীক্ষণের ধ্যান সম্ভবই নয় সেই হাজার হাজার হুজুকে মানব প্রবাহের খরস্রোতে। এই পরিচিত ছবিটার মধ্যে যখন একটি বাঙালি মেয়ের কণ্ঠে অকস্মাৎ উচ্চারিত হয় এই উক্তি- 'বইয়ের কাছে থাকলে মনে হয় এখানেই আমার ঈশ্বর'- তার অভিঘাত এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই।
অধিকাংশ বাঙালি এখন 'পাঠ' বলতে বোঝে নানাবিধ সামাজিক মাধ্যমে অবগাহন এবং অহর্নিশি আচ্ছন্ন মগ্নতা! প্রতীকী ছবি।
সরস্বতী পুজোয় আমরা বিদ্যার দেবীর আরাধনা করি। পড়ার বইগুলিকে রাখছি তাঁর শ্রীচরণে। অর্থাৎ অন্তত দু'-দিনের জন্য বইপড়া থেকে মুক্তিলাভ হল। পরীক্ষা শেষে এই দেশেরই কিছু ছাত্রছাত্রীর মনে হচ্ছে, 'বই' নামের অসুখ থেকে চিরমুক্তি ঘটল, এবং উন্মত্ত উল্লাসে তারা বই ছিঁড়ে উড়িয়ে দিচ্ছে পাতা! অর্থাৎ আমাদের লেখাপড়ার মধ্যে আর যাই থাকুক না কেন, গ্রন্থপ্রেম আছে কি? আছে কি গ্রন্থপ্রেম থেকেই উঠে আসা নিবিড় ধ্যানবিন্দু? লেখাপড়া কি ক্রমশ হয়ে ওঠেনি উপার্জনের উপায় মাত্র?
বাঙালি যেমন অনর্গল আগ্রহে রবীন্দ্রপুজারি, তেমন আগ্রহে কি রবীন্দ্রপাঠক?
বই আমাদের কী দেয় যে, তার সান্নিধ্যে কেউ পৌঁছতে পারেন এমন ঐশী অনুভূতিতে? সব বই তো ধর্মের বই নয়। অনেক বই আছে, যা সরাসরি ধর্মবিরোধী! অনেক বই ঘোষণা করছে ঈশ্বরের মৃত্যু। অনেক বই 'নিষিদ্ধ'! সেসব বইয়ের কাছে গেলেও কি মনে হতে পারে, এখানেই ঈশ্বর? বই আমাদের দেয় নতুন সংশয়, নতুন দৃষ্টিকোণ, নতুন প্রশ্ন, নতুন প্রত্যয়ভূমি। ক্রমিক সঞ্চারভূমি, যার শেষ নেই। ঈশ্বরের মতোই। বই পড়লে কোনও দিন থামবে না প্রশ্ন, শেষ হবে না সন্ধান, সংশয় ও প্রাপ্তি।
