shono
Advertisement
Bangladesh

পদ্মাপাড়ের ললাটলিখন! ধর্মের রাজনীতি বনাম দুর্নীতির বিরুদ্ধতা, কোন তাসে বাজি মাত?

বাংলাদেশে ত্রয়োদশতম নির্বাচন। আওয়ামি লিগ ভোটে নেই। বিএনপি ও জামাতের ‘শীতল যুদ্ধ’ ভোট অঙ্কে যোগ করেছে নব মেরুকরণের ঢেউ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট পেতে উভয় দলই উদ্‌গ্রীব। কিন্তু সংখ্যালঘুরা কি আশ্বস্ত চিত্তে ভোট দিতে প্রস্তুত?
Published By: Kishore GhoshPosted: 01:13 PM Feb 12, 2026Updated: 01:17 PM Feb 12, 2026

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ পর্ব শুরু হওয়ার প্রাকমুহূর্তে নির্বাচন কমিশনার তথা ভূতপূর্ব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, আওয়ামি লিগ নির্বাচনে অংশ না-নিলেও ভোটারের উপস্থিতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের কঠোর
অবস্থিতির কারণে হিংসা ছড়ানোর অবকাশও নেই। নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি থাকলেও গোপন বুথের ভিতর থেকে সরাসরি সম্প্রচার বা ভোটারদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ‘নিষিদ্ধ’।

Advertisement

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে আশাবাদী। তিনি মনে করেন, বড় দলগুলি সংযম প্রদর্শন করায় অতীতের তুলনায় পরিস্থিতি বর্তমানে অনেক ভাল। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ইতিবাচক মত প্রদান করে তিনি জানিয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফলাফল মেনে নিতে তার আপত্তি নেই। প্রচারণার ক্ষেত্রে তিনি জামায়াতে ইসলামীর ’৭১-এর ভূমিকা ও ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচনা করেছেন। তারেক বিশ্বাস করেন– স্বাধীনতা ও উন্নয়নের পক্ষেই মানুষ রায় দেবে।

দেশের প্রায় ৮০টি সংসদীয় আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা জয়-পরাজয় নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

অন্যদিকে, জামাত ইসলামির আমির শফিকুর রহমান সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ভোটারদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আবার নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে জামাতের নেতা-কর্মীদের উপর হামলা চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে তাই সংশয়ী তিনি। ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কারচুপির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন। জামাতের পক্ষ থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে জবরদখল ও ‘চঁাদাবাজি’-র অভিযোগ এনে বলা হয়েছে– মানুষ আর পুরনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং বর্তমানের গ্রহণযোগ্যতা বিচার করে ভোট দেবে।

এই নির্বাচনের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক– হিন্দু বা সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ক। ঠাকুরগঁাও-সহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামাত– উভয় দলই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ‘গ্যারান্টি’ দিয়ে তাদের ভোট টানার চেষ্টা করছে। বিএনপি যেখানে নিজেদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে তুলে ধরছে, সেখানে জামাত প্রথমবারের মতো তাদের কমিটিতে হিন্দুদের অন্তর্ভুক্ত করে, হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে, চমক সৃষ্টি করেছে। বিএনপি ও জামায়াতের এই ‘শীতল যুদ্ধ’ নির্বাচনী ময়দানের নতুন মেরুকরণ।

বিএনপি যেখানে ’৭১ এবং ‘উন্নয়ন’-কে সামনে রাখছে, জামায়াত সেখানে ‘ইনসাফ’ এবং ‘চাঁদাবাজি মুক্ত সমাজ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপির ভোট ব্যাঙ্কে হানা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আগেই বললাম, এই নির্বাচনে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট, এবং তাদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ রাজনৈতিক দলগুলির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই বিশাল ভোট ব্যাঙ্ক নিজেদের দিকে টানতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সম্পূর্ণ বৈচিত্রময় কৌশল গ্রহণ করেছে। দেশের প্রায় ৮০টি সংসদীয় আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা জয়-পরাজয় নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এই ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক ভোটার মনে করছেন, ভোট দিতে গেলে দলীয় রাজনীতির রোষানলে পড়তে পারেন, আবার না দিলেও রাজনৈতিক মেরুকরণের আবর্তে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি! ‘যে দলই হারুক, মার খায় সংখ্যালঘু’–
এ ধারণাটি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রবল। 

নির্বাচনে দীর্ঘ দিনের মিত্র বিএনপি ও জামাত ইসলামি একে-অপরের মুখোমুখি।

ঠাকুরগাঁও এবং খুলনার মতো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, সে নিয়ে তঁারা সন্দিহান। প্রার্থীরা বারবার অভয় দিচ্ছেন বটে, তবুও মব-সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক উসকানি দুশ্চিন্তার কারণ বইকি। সংখ্যালঘু সংগঠনরা বিশেষ কোনও দলের প্রতি সরাসরি সমর্থন না জানালেও ৮ দফা দাবির ভিত্তিতে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ‘হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’-এর প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে– নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যবহার বন্ধ করা, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করা, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের দ্রুত বাস্তবায়ন।

এবারের নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রচারণায় ব্যতিক্রমী কৌশল অবলম্বন করেছেন। প্রথাগত একতরফা বক্তৃতার পরিবর্তে তিনি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি ‘কথোপকথন’ বা ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ’ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। জনসভায় সাধারণ মানুষকে মঞ্চে ডেকে এনে তাদের সমস্যার কথা শোনা, এবং সরাসরি উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যোগাযোগ-বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতিকে বিশ্বনেতাদের (যেমন: বারাক ওবামা বা ইমানুয়েল ম‌াকরেঁা) অনুসৃত ‘টাউন হল মিটিং’ ঘরানার প্রচার হিসাবে অভিহিত করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পারিবারিক মূল্যবোধ ও শান্তির বার্তা প্রচার করেছেন।

নির্বাচনে দীর্ঘ দিনের মিত্র বিএনপি ও জামাত একে-অপরের মুখোমুখি।

বিটিভিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি অতীতের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ‘নিরাপদ’ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন। ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক দলগুলির নতুন-নতুন প্রচারকৌশল কতটা সফল হয়, তা অচিরে স্পষ্ট হয়ে যাবে।

নির্বাচনে দীর্ঘ দিনের মিত্র বিএনপি ও জামাত ইসলামি একে-অপরের মুখোমুখি। একদা জোটসঙ্গী দুই দলের মধ্যে এখন আদর্শগত ও রাজনৈতিক লড়াই– উভয়ই তীব্রতর। যা তাদের সাম্প্রতিক নির্বাচনী জনসভা ও নেতাদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হতে দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে বিএনপি প্রগতিশীল শক্তির প্রতীক রূপে নিজেদের তুলে ধরছে। দলটির শীর্ষনেতৃত্ব, বিশেষত তারেক রহমান এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রধানত দু’টি ইস্যুকে সামনে এনেছেন। তাঁদের মতে, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের এ-দেশের মানুষ নির্বাচনে গ্রহণ করবে না। ধর্মকে, রাজনীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়ে এবং জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতাকেই গ্রহণ করবে।’

অন্যদিকে, জামাত ইসলামী এবারের নির্বাচনে নিজেদের ‘শুদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক’ রাজনৈতিক বিকল্প রূপে উপস্থাপন করছে। দলটির প্রধান শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপির বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজি’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ তুলেছেন। বিএনপি ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান’-এর চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে দখলদারিত্বের রাজনীতি শুরু করেছে বলেও জামাতের দাবি। শেরপুরে জামাতের একজন নেতাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বিএনপির প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির ছায়া দেখছে তারা। জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে বিএনপি ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কারচুপির আশ্রয় নিতে পারে বলেও তাদের শঙ্কা। এমনকী, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং টাকা দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগ তারা এনেছে– বিএনপির বিরুদ্ধে।

সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, আওয়ামি লিগ ভোটারদের একটি বড় অংশ (প্রায় ৫০ শতাংশ) বিএনপির দিকে ঝোঁকা। প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার আবার জামায়াতের ‘ইনসাফ’-ভিত্তিক রাজনীতির প্রতি আগ্রহী। তরুণ সংখ্যালঘু ভোটাররা জামাতের সমর্থিত ‘জাতীয় নাগরিক দল’-এর (‘এনসিপি’) মতো নতুন শক্তিকে নিয়ে কৌতূহলী। এই ভোট-অঙ্ক কতখানি মিলল
বা মিলল না, তা জানতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক সাংবাদিক
asishropp@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement