স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছর যত বেড়েছে, তত আর্থিক দুর্নীতি দেশের সিস্টেমের অপরিত্যাজ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বাস্তব থেকে সিনেমা– প্রমাণ সর্বত্র।
অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ছেলে গিয়েছে হাসপাতালে। ভর্তি করাতে হবে অবিলম্বে। কাশতে কাশতে মুখে রক্ত চলে আসছে যে! কিন্তু ভারতের সরকারি হাসপাতালের এক রা– বেড নেই। ছেলে বাবাকে বসিয়ে হাসপাতাল একটু ঘুরে দেখে। কত মানুষ একটি বেডের প্রত্যাশায় অপেক্ষারত। কেউ কেউ প্রিয়জনকে নিয়ে কার্যত হাসপাতালের মেঝেয় বসে রয়েছে। একটি বেড, একজন রুগির চিকিৎসাকে করে তুলতে পারে আরও একটু গোছানো, আরও একটু সুষ্ঠু।
ছেলে বিমর্ষ মুখে ফিরে এলে বাবা জানতে চায়, পেলি? ছেলে মাথা নাড়ে। বাবা তখন ছেলেকে ভর্ৎসনা করে বলে–আমি যে দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণপাত করেছিলাম, সেইটে কি বলেছিস ওদের? আমি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে পথ হেঁটেছি। সরকারি তাম্রপত্র রয়েছে আমার। এসব বলতে হয় রে। বল, সঙ্গে সঙ্গে বেডের ব্যবস্থা হবে। ছেলে আবারও যায়। বলে, বাবা যা শিখিয়ে দিয়েছিল। এবং কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়। হাসপাতালের ‘গ্রুপ ডি’ বিদ্রুপ করে বলে– ‘আপনার বাবাকে দেশের স্বাধীনতার জন্য কে লড়তে বলেছিল? এ-ই তো দেশের হাল। ওসব ছাড়ুন, বাড়তি কিছু টাকা দিন। বেডের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি ঘুরপথে।’
হাসপাতালের ‘গ্রুপ ডি’ বিদ্রুপ করে বলে– ‘আপনার বাবাকে দেশের স্বাধীনতার জন্য কে লড়তে বলেছিল? এ-ই তো দেশের হাল। ওসব ছাড়ুন, বাড়তি কিছু টাকা দিন। বেডের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি ঘুরপথে।’
অপমানিত হয়ে ছেলে ফিরে আসে। বাবা বুঝতে পারে না, আসলে হচ্ছেটা কী? একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বাধীন দেশে বেড পাবে না চিকিৎসার জন্য– অভাবনীয়! নিশ্চয় তার বোকা ছেলেটা ভাল করে সব খুলে বলতে পারেনি। ছেলেকে আবার ভর্ৎসনা করে। আর, ছেলে এবার প্রতিবাদে গর্জে ওঠে। বাবাকে নির্মম বাক্যে বিঁধে বলে– সব বদলে গিয়েছে। যাদের জন্য লড়েছ, সেইসব মানুষ আর তোমাদের স্বীকৃতি মনে রাখতে চায় না। মনে রাখলে, এভাবে চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে, দিনদুপুরে বেডের জন্য টাকা চাইত না। ছেলের কথা শুনে বাবা অপমানে ও বিস্ময়ে স্থবির হয়ে যায়। সত্যি, এতই কি বদলে গিয়েছে চারপাশ?
১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় রাজকুমার সন্তোষীর ‘ঘাতক’। মারদাঙ্গার সিনেমা বলে জনচিত্তে তা আসন পেয়েছিল। আবার হিংসার কারণে অনেকে বীতরাগ হয়। কিন্তু আর্থিক দুর্নীতি, একটি স্বাধীন দেশের সিস্টেমে কেমন করে পাকা জায়গা করে নিয়েছে, কীভাবে ঘুণপোকার মতো ভিতর থেকে ফোঁপরা করে সামাজিক বাস্তুতন্ত্রকে– তা নির্মমভাবে তুলে ধরতে কসুর করেনি এই সিনেমা। দেশপ্রেমের সম্মান নেই। নাগরিক অধিকারের মর্যাদা নেই। টাকার ভাষায়, টাকার তুর্কিনাচনে প্রত্যেকে অভ্যস্ত। যে-কাজ সোজা পথে হবে না, তার জন্য বাঁকা আঙুল ও টাকার প্রভাব কাজ করে। স্বাধীনতার ৮০ বছর পেরিয়ে হয়তো এখন আর অবাক লাগে না। ঘা খেয়ে খেয়ে মানুষের মন শক্ত হয়েছে। অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে এমনটাই স্বাভাবিক। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লেগে ৯ জনের মৃত্যু হয়। তার মধ্যে ৭ জন বাংলাদেশি। নিয়ম-নীতি মেনে হোটেলে কাজ হয়নি। তদন্তে উঠে আসে তা। পরে জানা গেল, এমনকী দমকলের ছাড়পত্র পাইয়ে দিয়েছিল একজন দালাল– লক্ষাধিক টাকার বিনিময়ে। দুর্নীতি সিস্টেমের অঙ্গ হয়ে না উঠলে এমনটি কি হতে পারত?
