shono
Advertisement
Latin American football

পেলের হাসি, মারাদোনার অশ্রু! বিশ্বকাপে বাঙালির ‘সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার’

পৃথিবীর খুব কম অঞ্চলেই অন্য দুই দেশের পতাকা এত সহজে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগের প্রতীক হয়ে ওঠে।
Published By: Biswadip DeyPosted: 04:36 PM Jul 09, 2026Updated: 04:40 PM Jul 09, 2026

বিশ্ব-ফুটবলে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার দ্বন্দ্বকে এমন ত্রিমাত্রিকে চিহ্নিত করা যায়। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা বাংলার কাছে দু’টি ফুটবল-খেলিয়ে দেশ মাত্র নয়; দু’টি স্মৃতি। একটিতে আছে পেলের হাসি, অন্যটিতে মারাদোনার অশ্রু। একটিতে শিল্পের উচ্ছ্বাস, অন্যটিতে সংগ্রামের মহাকাব্য। এই দুই বিপরীত আবেগই বাঙালির সাংস্কৃতিক মননের অংশ। লিখছেন অনিমেষ বৈদ্য।

Advertisement

বিশ্বকাপ ফুটবল মানে বাংলায় গায়ে-হলুদের উৎসব। বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বাঙালি মননে শরৎ– যেখানে আকাশ হয়ে ওঠে নীল-সাদা। পাড়ার মোড়ের নির্বাচনী পতাকা ম্লান করে দিয়ে পতপত করে ওড়া ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার পতাকা। হালে অন্য কিছু দেশের পতাকা থাকলেও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পাল্লা এখনও বহু গুণ বেশি। পৃথিবীর খুব কম অঞ্চলেই অন্য দুই দেশের পতাকা এত সহজে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগের প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রশ্ন জাগে– হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দুই লাতিন আমেরিকান দেশের সঙ্গে বাংলার এই আত্মীয়তার সূত্র কোথায়?

এর উত্তর হয়তো শুধু ফুটবলে নেই। উত্তরটি লুকিয়ে আছে বাংলার সমাজ-ইতিহাসে, টেলিভিশনের বিস্তারে, লাতিন আমেরিকার সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মীয়তায় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকার হিসাবে বয়ে চলা স্মৃতিতে। স্বাধীনতার পরের দুই দশকে কলকাতার ফুটবল মানচিত্র ছিল সম্পূর্ণ দেশীয়। ময়দান মানেই মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর মহামেডান। বিদেশি ফুটবলের খবর মিলত সংবাদপত্রের কয়েকটি কলাম, অল ইন্ডিয়া রেডিওর সংক্ষিপ্ত বুলেটিন কিংবা বিদেশি সাময়িকী থেকে। বিশ্বকাপ তখন ছিল দূরদেশের এক দুষ্প্রাপ্য রোমাঞ্চকর খবর, ঘরের অভিজ্ঞতা নয়।

পরিবর্তনের শুরুটা মূলত টেলিভিশনের হাত ধরে। ভারতে পরীক্ষামূলক টেলিভিশন সম্প্রচার ১৯৫৯ সালে শুরু হলেও তারপরে দীর্ঘ দিন সম্প্রচারের বিস্তার ছিল খুবই সীমিত। খেলার দরবারে সম্প্রচারের দুনিয়ায় আসল মোড় আসে ১৯৮২ সালে। দিল্লি এশিয়ান গেমসকে সামনে রেখে ভারতে রঙিন টেলিভিশনের সূচনা হয়। একই সঙ্গে দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে দূরদর্শনের জাতীয় নেটওয়ার্ক। আটের দশকের গোড়ায় শহরাঞ্চলে টেলিভিশন সেটের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। রঙিন টেলিভিশনের আগমন এবং দূরদর্শনের দ্রুত সম্প্রসারণ প্রথমবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়াকে সাধারণ মানুষের বসার ঘরে পৌঁছে দেয়। সেই সময় একটি টেলিভিশন সেট পাড়ার যৌথ সম্পদ ছিল। বিশ্বকাপের রাতে যে-বাড়িতে টিভি থাকত, সেটিই হয়ে উঠত অস্থায়ী স্টেডিয়াম। মাদুর পেতে পাশাপাশি বসে খেলা দেখা, গোল হলে একসঙ্গে চিৎকার, ম্যাচ শেষে রাতভর তর্ক– এভাবেই বিশ্বকাপ বাংলায় একটি সামাজিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। এই যৌথ দর্শন-সংস্কৃতি বাঙালির ফুটবল স্মৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্বাধীনতার পরের দুই দশকে কলকাতার ফুটবল মানচিত্র ছিল সম্পূর্ণ দেশীয়। ময়দান মানেই মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর মহামেডান। বিদেশি ফুটবলের খবর মিলত সংবাদপত্রের কয়েকটি কলাম, অল ইন্ডিয়া রেডিওর সংক্ষিপ্ত বুলেটিন কিংবা বিদেশি সাময়িকী থেকে। বিশ্বকাপ তখন ছিল দূরদেশের এক দুষ্প্রাপ্য রোমাঞ্চকর খবর, ঘরের অভিজ্ঞতা নয়।

এরপর আসে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ, যা ভারতীয় ফুটবল-দর্শকের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই বিশ্বকাপই প্রকৃত অর্থে রাত জেগে বিশ্বকাপ দেখার সংস্কৃতি তৈরি করে। দূরদর্শনের সম্প্রচার, পাড়ার ক্লাবে টিভি বসানো, ভোর পর্যন্ত জেগে থাকা– সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। পরদিন স্কুলে, কলেজে, অফিসে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে আগের রাতের ম্যাচ। পাড়ার ক্লাবঘরে ফুটবল নিয়ে তর্ক জমে ওঠে। বিশ্বকাপ আর সংবাদপত্রর খবর নয়; তা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

 

সরাসরি দেখার সুযোগ না পেলেও খবরের হাত ধরে বাঙালির ফুটবল উন্মাদনায় তত দিনে জায়গা করে নিয়েছে পেলে-সহ বহু তারকাখচিত ব্রাজিলের নাম। আর ১৯৮৬ সালে বাঙালি নিজের চোখে দেখার সুযোগ পায় বিশ্বকাপে মারাদোনার অসাধারণ পারফরম্যান্স, যা আর্জেন্টিনাকে বাংলার অগণিত পরিবারের আবেগের অংশ করে তোলে। এই সময়ই জন্ম নেয় দু’টি শিবির। একদিকে পেলের উত্তরাধিকার বহনকারী ব্রাজিল– যেখানে ফুটবল যেন নাচ, ছন্দ আর কল্পনার শিল্প। অন্যদিকে, দিয়েগো মারাদোনার আর্জেন্টিনা–যেখানে ফুটবল শুধুই খেলা নয়, প্রতিবাদ, অসম লড়াই এবং একজন মানুষের অসম্ভব প্রতিভার গল্প। পেলে
বাঙালির কল্পনায় প্রবেশ করেছিলেন সংবাদপত্রর পাতায়; দিয়েগো মারাদোনা প্রবেশ করলেন টেলিভিশনের পর্দা ভেদ করে। পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন কিংবদন্তি, অন্যজন হয়ে উঠলেন সমসাময়িক অভিজ্ঞতা।

রঙিন টেলিভিশনের আগমন এবং দূরদর্শনের দ্রুত সম্প্রসারণ প্রথমবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়াকে সাধারণ মানুষের বসার ঘরে পৌঁছে দেয়। সেই সময় একটি টেলিভিশন সেট পাড়ার যৌথ সম্পদ ছিল। বিশ্বকাপের রাতে যে-বাড়িতে টিভি থাকত, সেটিই হয়ে উঠত অস্থায়ী স্টেডিয়াম।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে মারাদোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল নিয়ে বিতর্ক যতখানি, তার চেয়েও বেশি আলোড়ন তুলেছিল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তঁার দ্বিতীয় গোলটি। পঁাচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সেই গোল এখনও বিশ্বকাপের ইতিহাসে শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। কিন্তু বাংলায় সেই গোলের আবেদন শুধু নান্দনিক ছিল না; তার মধ্যে ছিল ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। চার বছর আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়েছে ব্রিটেনের কাছে। ফলে অনেকের কাছে মারাদোনার সেই গোল যেন ফুটবলের মাঠে এক প্রতীকী প্রতিশোধ। ঔপনিবেশিক শাসনের স্মৃতি বহনকারী ভারতের এক অংশের কাছে এই অনুভূতি ভিন্ন মাত্রা নিয়ে হাজির হয়। পাশাপাশি বস্তির অন্ধকার থেকে উঠে এসে বিশ্বসেরা হওয়া মারাদোনা কিংবা বর্ণবৈষম্যের সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিভা হিসাবে বিশ্বজয়ী পেলের জীবনকাহিনিও বাঙালির সহানুভূতি ও কল্পনাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা– লাতিন আমেরিকার এই দুই দেশের সঙ্গে বাঙালির আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণ ফুটবল ছাপিয়ে আরও বেশি কিছুই হয়তো ছিল।

ছয় ও সাতের দশকে চে গুয়েভারা বিদ্রোহের প্রতীক, পাবলো নেরুদা কবিতার নতুন ভাষা, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস জাদুবাস্তবতার বিস্ময় হয়ে উঠেছিলেন বাংলার পাঠকের কাছে। কিউবার বিপ্লব, চিলির রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বা লাতিন আমেরিকার মুক্তির সংগ্রাম– সব মিলিয়ে এই ভূখণ্ড বাঙালির কল্পনায় এক আত্মীয় মহাদেশে পরিণত হয়। ফুটবল সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরই সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রকাশ। র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাঙালির নন্দনতত্ত্ব। বাঙালি বরাবরই শিল্পকে ভালবাসে। সে শুধু জয় দেখতে চায় না, জয়ের ভঙ্গিটাও দেখতে চায়। তাই ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবল বা আর্জেন্টিনার ড্রিবলিং-নির্ভর সৃজনশীলতা বাংলার রুচির সঙ্গে সহজেই মিশে যায়। জার্মানির শৃঙ্খলা বা ইতালির রক্ষণাত্মক কৌশলের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও হৃদয়ের টান গিয়ে পড়ে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার সৃষ্টিশীল সৌন্দর্যের দিকে।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে মারাদোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল নিয়ে বিতর্ক যতখানি, তার চেয়েও বেশি আলোড়ন তুলেছিল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তঁার দ্বিতীয় গোলটি। পঁাচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সেই গোল এখনও বিশ্বকাপের ইতিহাসে শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। কিন্তু বাংলায় সেই গোলের আবেদন শুধু নান্দনিক ছিল না; তার মধ্যে ছিল ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।

নয়ের দশকে এই আবেগ আরও সামাজিক রূপ পায়। অর্থনৈতিক উদারীকরণের পরে কেবল টেলিভিশনের বিস্তার বিশ্বকাপকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। পাড়ায় পাড়ায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙানো, ক্লাবভিত্তিক সমর্থক গোষ্ঠী, বাজি, দেওয়ালচিত্র– সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এক মাসের সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। অনেক পরিবারের মধ্যেও অদ্ভুত বিভাজন তৈরি হয়– বাবা ব্রাজিল, ছেলে আর্জেন্টিনা; দাদা ব্রাজিল, নাতি আর্জেন্টিনা। ফুটবল হয়ে ওঠে পারিবারিক উত্তরাধিকার।

বিশ্বকাপে মানুষ ক্লাব নয়, গল্পের সমর্থক। একজন বাবা তঁার ছেলেকে প্রথম যে-জার্সিটি কিনে দিয়েছিলেন, সেটি হয়তো ব্রাজিলের। কোনও দাদু নাতিকে প্রথম যে বিশ্বকাপের গল্প শুনিয়েছিলেন, তা হয়তো মারাদোনার। সেই স্মৃতি প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার’। বাংলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থনের বড় অংশ সেই উত্তরাধিকারেরই ফল।

আসলে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা বাংলার কাছে দু’টি ফুটবল দল নয়; দু’টি স্মৃতি। একটিতে আছে পেলের হাসি, অন্যটিতে মারাদোনার অশ্রু। একটিতে শিল্পের উচ্ছ্বাস, অন্যটিতে সংগ্রামের মহাকাব্য। দুই বিপরীত আবেগই বাঙালির সাংস্কৃতিক মননের অঙ্গ। একবিংশ শতাব্দীতে অবশ্য ছবিটা বদলেছে অনেকখানি। খেলার নিয়মিত সম্প্রচার নতুন প্রজন্মকে সারা বছর ধরে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে আচ্ছন্ন করে রাখে। বিশ্ব-ফুটবলও অনেক বেশি বহুমেরু। সমর্থনের ভূগোলও তাই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে।

তবু বাংলা যখন বিশ্বকাপের রাতে আবারও হলুদ কিংবা আকাশি-সাদা পতাকা তুলে ধরে, তখন বোঝা যায়– এটি কেবল একটি দলের প্রতি সমর্থন নয়, এটি স্মৃতির প্রতি আনুগত্য। একটি প্রজন্ম থেকে আর-একটি প্রজন্মে হস্তান্তরিত আবেগের প্রকাশ। এই পতাকাগুলি বাঙালির যৌথ স্মৃতির, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং দীর্ঘ ফুটবল-সভ্যতার জীবন্ত নিশান।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement