‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’কার শ্রীমকে লেখা চিঠিতে এমন অভিমত-ই ব্যক্ত করেন স্বামী বিবেকানন্দ। শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়, নানা মজার গল্প-চরিত্র-সমাজে প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচন, লোকসংগীতের ব্যবহারে পঁাচ খণ্ডের অমৃত সাহিত্যসম্পদটি। শ্রীম-র রচনারীতির গুণে এই নিখাদ ধর্মতত্ত্বের বইটি আদর্শ লোকসাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে। কল্পতরু উৎসবের আবহে ঠাকুর-স্মরণ। লিখছেন মানস ভট্টাচার্য।
মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ১৮৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ করেন। ঠাকুরের সংস্পর্শে আসার দিনগুলিকে নানা ঘটনার দিনলিপিতে সাজিয়ে মাস্টারমশাই রচনা করেছেন ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’, যা আসলে শ্রীরামকৃষ্ণরই মুখ-নিঃসৃত বাণী। জীবনী সাহিত্যের আঙ্গিকে রচিত হলেও ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ এক সার্থক লোকসাহিত্য। তত্ত্বের দিক থেকে ঠাকুরের এক-একটি কথা নিয়ে হয়তো-বা রচিত হতে পারে ভূরি ভূরি শাস্ত্রগ্রন্থ– এমনই মনে করেছিলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। ‘কথামৃত’-কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু সাধনধারার মিলন হিসাবে বর্ণনা করেছেন। অরবিন্দ উল্লেখ করেছিলেন, অনন্তের স্রোতোধারা হিসাবে। শ্রীরামকৃষ্ণকে আমরা যতখানি প্রাণোচ্ছল জীবন্ত আকারে ‘কথামৃত’-র মধ্যে পাই, তেমনটি আর কোথাও যেন পাই না।
জীবনী সাহিত্যের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মানুষটির জীবনকাহিনি খুঁজে পেতে চাই আমরা, মানুষটির একান্ত সান্নিধ্য পেতে চাই। যা চাই না, তা হল: মানুষটিকে নিয়ে অহেতুক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, আর তত্ত্বকথার কচকচানি। সেদিক থেকে বিচার করলে দেখি ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’-য় আমরা শ্রীরামকৃষ্ণর জীবনটিকে পাই হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের নিখুঁত আঙ্গিকে। জাগতিক উচ্চতম আদর্শের যে ভাবসম্পদ আমরা এর মধ্যে অনুভব করতে পারি, তেমনটি সমকালের অন্য ধর্মগ্রন্থে অনুপস্থিত। ফলে সন্তজীবনী কাব্য ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ ধর্মীয় সাহিত্য হিসাবে ও বিপুল জনপ্রিয়তার নিরিখে ‘রামায়ণ’-‘মহাভারত’-এর সঙ্গেই তুলনীয় বললে অতিকথন হয় না আশা করি!
‘শ্রীমদ্ভগবতগীতা’-তে যেমন পাওয়া যায় সমস্ত উপনিষদের সার, তেমনই ‘কথামৃত’-য় রয়েছে সৃষ্টির আদি থেকে মানব মনের নানা প্রশ্ন আর সমস্যার শাস্ত্রানুমোদিত সমাধান। অথচ সরল, সুন্দর ও সহজবোধ্য ভাষায়। ছোট ছোট বাক্যে নির্মিত গল্প হাস্য-পরিহাসের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়েছে যা পড়ে, শুনে প্রত্যেকেই বুঝতে পারে এবং কাঙ্ক্ষিত আনন্দ পায়। ঘরোয়া মজলিশের কথোপকথনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এক অনুপম পরিবেশ, যেখানে লোকসাহিত্যের মতো হাজির হয়েছেন লৌকিক দেব-দেবী থেকে শুরু করে বিড়ালছানা, গিন্নির হঁাড়ি, সাপ, ব্যাঙ, এমনকী রামায়ণ-মহাভারত পুরাণাদির কাহিনিও। ঠাকুরের মজার গল্পটি বলা শেষ হলে পরে থাকে একরাশ নিস্তব্ধতা, যার মধ্য দিয়ে আমরা অনুভব করতে পারি গল্পটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।
সংলাপের ভঙ্গিতে লেখা ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’-য় আমরা সহজবোধ্য ভাষায় গান, গল্প ও ছড়ার সমাবেশ লক্ষ করি, যা লোকসাহিত্যের অন্যতম উপাদান। ঠাকুর বিভিন্ন প্রসঙ্গের ব্যাখ্যা করার জন্য সুন্দর সুন্দর গল্প ও ছড়ার অবতারণা করে সকলকে হাসিয়েছেন। তার মধ্যেও দুরূহ ধর্মতত্ত্বের যে আলোচনা আছে, সেটা শুনতে শুনতে আমাদের মনে কখন ক্লান্তি আনে না। প্রত্যক্ষ উক্তিতে ঠাকুরের সেই কথকতাগুলিকে সহজ-সুন্দর ভাষায় তুলে ধরেছেন তঁার প্রিয় গৃহীশিষ্য শ্রীম। ঠাকুরের বলা কথাগুলির একবর্ণও যে তঁার কষ্টকল্পনা নয় সে-কথা সহজেই বোঝা যায়। তঁার রচনারীতির গুণে এমন নিখাদ ধর্মতত্ত্বের গ্রন্থটিও আদর্শ লোকসাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে। আমাদের হৃদয় মন্দিরকে পরিষ্কার, উদার ও বিরাট না করে শুধু শঙ্খ, ঘণ্টা ও হইচইয়ের বাহ্যিক আড়ম্বরে ভগবানকে পাওয়া যায় না– এই জটিল তত্ত্বকথাটি বোঝাতে গিয়ে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব চমৎকার একটি ছড়া বলেছেন– ‘মন্দিরে তোর নাইকো মাধব পদো, শঁাখ ফুঁকে তুই করলি গোল/ তাতে চামচিকে এগার জনা দিবা নিশি দিচ্ছে হানা।’
শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়, নানা মজার গল্পে ভরে উঠেছে ‘কথামৃত’-র পাতা। কর্মনাশা নদীতে স্নান করলে কর্মনাশ হয়ে যায়। অথচ, লোকসাহিত্যের অঙ্গন ছাড়া এমন কোনও নদীর নামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল! লোকসাহিত্যের আর-একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল– সমাজে দীর্ঘ দিন প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার, যা ‘কথামৃত’-য় চমৎকারভাবে পরিবেশিত হয়েছে– ‘তেল মেখে কঁাঠাল ভাঙ্গলে হাতে আঠা লাগে না’, অথবা ‘গায়ে হলুদ মেখে জলে নামলে কুমীরের ভয় থাকে না’। ঈশ্বরলাভের জন্য দরকার ‘ডাকাত পরা ভাব’। সর্বপ্রকার বন্ধনমুক্ত না হলে ঈশ্বর লাভ হয় না, তাই ‘লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন থাকতে নয়।’ ‘নাহং নাহং, তুহু তুহু’– ঈশ্বর তুমিই আমার একমাত্র আশ্রয়, আর কিছু নেই। কথামৃতে যে কথাটি বারবার বলা হয়েছে, তা হল ভগবানকে পেতে হলে তন্ত্রমন্ত্র কিছুই দরকার হয় না। তাই তো ঠাকুর বলেছেন ‘মন্তর নয়, মন তোর, মন তোর।’ নিজের মনকে আয়ত্বে আনার জন্যই মন্ত্রের প্রয়োজন। বেদ অথবা শ্রুতি বলছে, ‘মননাৎ মন্ত্রাঃ’, তারই প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই কথামৃতের প্রথম গানে: ‘ডাক দেখি মন ডাকার মত কেমন শ্যামা থাকতে পারে কেমন কালী থাকতে পারে।’ লোকসংগীতের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য লোকশিক্ষা। ‘কথামৃত’-বর্ণিত গানের মধ্যে আমরা তার সন্ধান পাই।
১৮৮২ সালের মার্চ থেকে ১৮৮৬ সালের এপ্রিল– মোটামুটি হিসাবে এই চার বছরের মাত্র ৫০টির কিছু বেশি সাক্ষাতের বিবরণ সমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘কথামৃত’ শ্রীরামকৃষ্ণর পূর্ণাঙ্গ জীবনী নয়। অথচ পঁাচ খণ্ডের বইটি আবেদনে এমনই জনপ্রিয় যে, এক-একটি খণ্ড একাধিকবার সংস্করণ ও পুনর্মুদ্রণ করতে হয়েছিল অল্প সময়ের ব্যবধানে। ‘কথামৃত’-র মূল পাণ্ডুলিপি এবং মহেন্দ্রনাথ গুপ্তর অবশিষ্ট ডায়েরি কোথায়– তা নিয়ে সংশয়ের মাঝেও– ১৮৮৯ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি শ্রীমকে লেখা স্বামী বিবেকানন্দর একটি চিঠি থেকে এই বইটির গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুমান করা সম্ভব– ‘মাষ্টার আপনাকে লক্ষ লক্ষ ধন্যবাদ। রামকৃষ্ণকে ঠিক পাকড়েছেন। হায়, অতি অল্প লোকেই তঁাকে বোঝে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে যে মতাদর্শ শান্তি বর্ষণ করবে, কোন ব্যক্তিকে তার মধ্যে যখন সম্পূর্ণ ডুবে থাকতে দেখি, তখন আমার হৃদয় আনন্দে নৃত্য করতে থাকে। তখন একেবারে যে উন্মত্ত হয়ে যাই না– সেটাই আশ্চর্য।’
আপামর বাঙালি যে ‘কথামৃত’-র এই আনন্দরসে আকণ্ঠ নিমজ্জিত তা বলাই যায়। গল্পগ্রন্থ, বাণী, উপদেশাবলি, ধর্মগ্রন্থ, সমাজ-সংস্কৃতির তথ্যনিষ্ঠ লোকসাহিত্যের ইতিহাস– যেভাবেই আমরা তার কাছে যাই– সেভাবেই তিনি আমাদের আশ্রয় প্রদান করেন– হয়ে ওঠেন পীড়িত ও আর্ত মানুষের সহায়-সম্বল। জীবনী সাহিত্যের এমন জীবিত লোকরূপ সত্যিই বিরল।
(মতামত নিজস্ব)
