সরকারবিরোধী আন্দোলনে কেঁপে উঠেছে ইরান। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ৪৭ বছরের ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। দেশজুড়ে বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট ছোট জনপদ, সর্বত্র মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। এই ব্যাপকতা, তীব্রতা ও স্পষ্ট রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের কারণে এবারের বিক্ষোভকে অনেক বিশ্লেষক ‘নজিরবিহীন অভু্যত্থান’ বলে মনে করছেন। কারণ, এটি শুধু সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভপ্রকাশ নয়, তা আসলে পুরো শাসনব্যবস্থার বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
আন্দোলনের সূত্রপাত অর্থনৈতিক সংকট থেকে। ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং দীর্ঘ দিনের নিষেধাজ্ঞাজনিত অর্থনৈতিক চাপে মানুষের মনে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তারই এখন বিস্ফোরণ ঘটেছে। স্লোগান উঠেছে– ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’। এমনকী, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের অপসারণের দাবি উঠেছে। জায়গায় জায়গায় বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ৫০০-র বেশির মানুষের মৃতু্য হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে ১১ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী।
প্রত্যুত্তরের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান সরকার। ভবিষ্যৎ তাই অনিশ্চিত, অথচ তাৎপর্যপূর্ণ। এই আন্দোলন হয়তো কালই শাসন পরিবর্তন ঘটাবে না, কিন্তু এটি ইরানের রাজনীতিতে এক গভীর ফাটল তৈরি করেছে।
ইরানে গণবিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট ছিল মূলত শহুরে মধ্যবিত্তদের আন্দোলন, ২০১৭ ও ২০১৯ সালের বিক্ষোভে নেতৃত্বে ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং ২০২২ সালে মাহশা আমিনি-র মৃত্যুর পর
যে-আন্দোলন হয়েছিল, তা নারীর অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে। তবে, এবারের আন্দোলন এসবের চেয়ে পৃথক। একটি নির্দিষ্ট ইস্যু থেকে শুরু হলেও এটি দ্রুতই সর্বজনীন অভিন্ন দাবির আন্দোলনে রূপ পেয়েছে। যা হল ব্যবস্থার পরিবর্তন। অর্থাৎ, বিক্ষোভকারীরা শুধু জীবিকা ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে নয়, আরও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও শাসক গোষ্ঠীর কর্তৃত্বের পরিবর্তন চায়। কিছু অংশে রাজতন্ত্রপন্থী আবেগও দেখা গিয়েছে। যেমন, রাজপক্ষের প্রাক্তন শাসকের সন্তানদের প্রতি সমর্থন। প্রয়াত রেজা শাহর পুত্র নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি ইরানের খামেনেই শাসনের বিরুদ্ধে গণ-বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। এই অভ্যন্তরীণ সংকটের মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতে বিক্ষোভকারীদের সাহায্যের সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
তার প্রতু্যত্তরের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান সরকার। ভবিষ্যৎ তাই অনিশ্চিত, অথচ তাৎপর্যপূর্ণ। এই আন্দোলন হয়তো কালই শাসন পরিবর্তন ঘটাবে না, কিন্তু এটি ইরানের রাজনীতিতে এক গভীর ফাটল তৈরি করেছে। বছরে-পর-বছর ধরে অর্থনৈতিক সুযোগ সংকুচিত হওয়া এবং রাজনৈতিক ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা ক্ষয়ের কারণে
যে-জনরোষের সৃষ্টি হয়েছে, তা আর আটকে রাখা যাবে না। অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ হয়তো আর যথেষ্ট নয়। ইরানের নেতৃত্বকে অবশ্যই সংস্কার শুরু করতে হবে, দুর্নীতির মোকাবিলা করতে হবে, এবং বিশ্বের সঙ্গে ফের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।
