shono
Advertisement
Asha Bhosle-Uttam Kumar

উত্তমের সুরে গেয়েছিলেন গান, বাংলা প্লেব্যাকে আশা ভোঁসলের আসা কীভাবে?

এমন গল্প চলতেই থাকবে। কারণ বিষয়ের নাম আশা ভোঁসলে নাম এক মহাসমুদ্র। সুরলোক ছেড়ে পরলোকে চলে গেলেও গানের মধ্যে বাঁচবেন আশা।
Published By: Prasenjit DuttaPosted: 03:04 PM Apr 12, 2026Updated: 07:22 PM Apr 12, 2026

১৯৫৯ সাল। বাংলা ছবির জগৎ তখন এক অন্য ছন্দে এগোচ্ছে। ঠিক সেই সময়েই মুক্তি পেল এক ছবি, 'রাতের অন্ধকারে'। নামটা আজ অনেকের কাছেই প্রায় বিস্মৃত। কিন্তু ছবিটির অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক দারুণ গল্প। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ছবি বিশ্বাস, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রাবতী দেবী, রাজলক্ষ্মী দেবী। তাঁরা তখনকার সময়ের প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সব আলো কেড়ে নিলেন এক অতিথি শিল্পী। বম্বে থেকে আসা হেলেন।

Advertisement

সেই প্রথমবার বাংলা ছবিতে পা রাখলেন হেলেন। আর তাঁর জন্যই তৈরি হল এক জমকালো ক্যাবারে নাচের দৃশ্য। যা তখনকার বাংলা ছবিতে একেবারেই নতুন। এই গানের সুর দিলেন ভি বালসারা। কথার জাদু বুনলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। গানের কথা লেখার সময় এক মজার ঘটনাও ঘটে। নানা ভাষার মিশেলে গান তৈরি হবে, এই ভাবনা থেকেই পুলকবাবু একদিন পৌঁছে গেলেন বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের এক চিনে জুতোর দোকানে। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেন, "চিনে ভাষায় 'আই লাভ ইউ' চিনে ভাষায় কীভাবে বলবে?" দোকানদার হেসে উঠে বললেন, "সিন আই দ্য উ আই নি!"

এইভাবেই তৈরি হল এক বিচিত্র, বহুভাষিক গান 'সিন আই দ্য/ উ আই নি/ চিনে ভাষা জানো কী?/ শোনো তবে ইংরেজিতে তোমায় বলছি/ ও মাই ডার্লিং আই লাভ দি'। যেখানে হেলেন নানান সাজে নাচবেন। এবার প্রশ্ন উঠল, এই গান গাইবেন কে? খোঁজ পড়ল। ভি বালসারা হঠাৎ বললেন, "আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle) হলে কেমন হয়?"

নামটা শুনে সবাই একটু থমকে গেল। বাংলা ছবিতে আশা ভোঁসলে! তখন তো তিনি মূলত হিন্দি গানের তারকা। কিন্তু বালসারার আত্মবিশ্বাস ছিল অটুট। তিনিই উদ্যোগ নিয়ে আশাকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। কলকাতায় এসে শুরু হল আরেক লড়াই। বাংলা ভাষা তখন আশার কাছে একেবারেই অচেনা। শব্দে শব্দে, লাইনে লাইনে, ভি বালসারা ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ধৈর্য ধরে তাঁকে গান শেখাতে লাগলেন। ক্লান্তি ছিল। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল নতুন কিছু করার আনন্দ। এই ছবিতেই আশা ভোঁসলে গাইলেন তাঁর প্রথম বাংলা গান, 'এ হাওয়ায় এ হাওয়ায় কী সুরভি ঝরে'।

গান রেকর্ডিং শেষ হওয়ার পর আশার ইচ্ছে হল, একটু ঘুরে দেখা যাক কলকাতাকে। আশা, পুলক আর বালসারা তিনজন হেঁটে বেরলেন চৌরঙ্গির রাস্তায়। আশার থাকার কথা ছিল মহারাষ্ট্র নিবাসে। সেটা পছন্দ না হওয়ায় উঠলেন গ্র্যান্ড হোটেলে। মজার বিষয়, তখন প্লেব্যাক গায়কদের মুখ খুব একটা পরিচিত ছিল না। তাই চৌরঙ্গির ভিড়ের মধ্যেও কেউ চিনতে পারল না এই ভবিষ্যতের কিংবদন্তিকে। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে, গল্পের ফাঁকে আশা হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, "সুধীন দাশগুপ্ত কেমন সুর করেন?" পুলক হেসে বললেন, "খুব ভালো। ও আমার বন্ধু।" আশা একটু ভেবে বললেন, "তিনি আমাকে বাংলা আধুনিক গান গাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। বম্বে ফিরে ওঁর সঙ্গে বসব।" ভবিষ্যতে সুধীন দাশগুপ্তের সুরে বহু গান গেয়েছেন আশা। 'আমার দিন কাটে না', 'কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে', 'আরও দূরে চলো যাই', 'ও পাখি উড়ে আয়', 'মন মেতেছে মৌমাছিদেরই মৌ বনে'-সহ আরও আরও।

[caption id="attachment_1168719" align="aligncenter" width="1200"]


পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, পরিচালক তরুণ মজুমদার, গুলজার, হেমন্ত কুমার এবং আশা ভোঁসলে রাহগির (১৯৬৯) চলচ্চিত্রের রেকর্ডিং সেশনে।[/caption]

আসলে নাড়াটা বাঁধা হয়ে গিয়েছিল সেখান থেকেই। 'কাল তুমি আলেয়া'য় মহানায়ক উত্তমকুমার (Uttam Kumar )হলেন সঙ্গীত পরিচালক। ইতিমধ্যে জীবনে বহু ভূমিকায় তিনি এসেছেন। কিন্তু এই ওর প্রথম সংগীত পরিচালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। দেবেশ ঘোষের আর্জিতে সম্মতি দিলেও চট করে সে ভূমিকাটি মেনে নেয়নি উত্তম। দেবেশ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "কবে মিউজিক সিটিং করবে?" উত্তম অসাধারণ হাসিটি হেসে বললেন, "আমি তোমায় খবর দেব।" সেই উত্তমই পরে বললেন, "লতাজি দারুণ গান করেন। কিন্তু 'কাল তুমি আলেয়া'র এই ধরনের 'টিপিক্যাল' মেয়ের গান দু'টো আশা ভোসলে ছাড়া আর কাউকে আমি ভাবতে পারছি না। আর ছেলের গানটি গাইবেন হেমন্তদা।" ছবির পরিবেশক নারায়ণবাবুদের কিন্তু এটা পছন্দ হল না। নারায়ণবাবু হাতের মুঠিতে সিগারেট ধরে একটু টান দিয়েই বললেন, "না, না। একটা গান লতাজিকে দিয়ে গাওয়ান। লতাজির একটা গান চাই-ই।"

উত্তম মুম্বই চলে গেলেন। শুনে গেলেন একটা গান লতাজিকে দিয়ে গাওয়াতেই হবে। দেবেশও একদিন গেলেন মুম্বইতে। সবাই যখন সেখানে উত্তমের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন, তখন উত্তম কুমার ‘ছোটি সি মুলাকাত প্যায়ার বান গয়ি’ গানটির রিহার্সালে ব্যস্ত। সবাইকে দেখে হেসে বললেন, "এখন তার ধ্যান-জ্ঞান আর গান নয়, নাচ। কারণ তাকে নাচতে হবে বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে। তিনি তো একেবারে নামী নৃত্যশিল্পী। তাই তার সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে প্রবল পরিশ্রম করতেই হচ্ছে।" 

এরপর গান নিয়ে আলোচনা হয়। দু'টো গানই ভালো লেগেছিল। তবে কোনটা নেওয়া হবে, তা নিয়ে খানিক ভাবনা চলছিল। সেই সময় দেবেশ চুপিসারে এসে জানতে চাইলেন, লতাজির সঙ্গে কথা হয়েছে কি না। উত্তম বললেন, "আশাজিকে একটু বুঝিয়ে বলো। সারাদিন নাচ আর শুটিং নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে, গান শেখার সময়ই পাই না। যদি উনি রাতে একটু সময় দেন, তাহলে খুব সুবিধা হয়।" সেদিন সেখান থেকে ফেরার সময় দেবেশ আবার আড়ালে ডেকে লতা মঙ্গেশকরের কথা মনে করিয়ে দিল।

পরদিন সকালে সবাই মিলে পেডার রোডের ‘প্রভুকুঞ্জ’-এ। সেখানেই পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকতেন দুই বোন - লতা মঙ্গেশকর এবং আশা ভোঁসলে। দু’টি ফ্ল্যাটের বারান্দার মাঝে একটি দরজা ছিল, যেখান দিয়ে তারা যখন খুশি একে অপরের কাছে যাতায়াত করতে পারতেন। আশাজিকে বলা হল, উত্তমের সুরে গান। উত্তমের বড় ভক্ত তিনি, তাই এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। ঠিক হল, রাতে উত্তম এসে গান তোলাবে, আর সেই রাতেই রেকর্ডিং হবে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'কাল তুমি আলেয়া'য় আশা গেয়েছিলেন 'মনের মানুষ ফিরল ঘরে' এবং 'পাতা কেটে চুল বেঁধে'। এমন গল্প চলতেই থাকবে। কারণ বিষয়ের নাম আশা ভোঁসলে নাম এক মহাসমুদ্র। সুরলোক ছেড়ে পরলোকে চলে গেলেও গানের মধ্যে বাঁচবেন আশা।

তথ্যঋণ
কথায় কথায় রাত হয়ে যায় - পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement