বাঙালির হৃদয়ের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের 'গুগাবাবা'। 'আহা ভূত, বাহা ভূত' আজও অনাবিল আনন্দধারা নিয়ে আসে শ্রোতাদের মনে। আর সেই গানের সঙ্গেই অক্ষয় কুমার অভিনীত 'ভূত বাংলা' ছবির 'রাম জি আকে ভালা করেঙ্গে' গানের মিল খুঁজে পেয়েছে দর্শকমহল। যে বিষয়ে বর্তমানে জোর চর্চা সোশাল মিডিয়া। ‘কালা ভূত গোরা ভূত’ গানের কলি নিয়ে বিতর্ক এখন আট থেকে আশির মুখে মুখে। সোশাল মিডিয়াতেও ভাইরাল সত্যজিৎ রায়কে অবমাননার প্রসঙ্গ। এই গানটি যিনি গেয়েছেন, তিনি আদতে মুর্শিদাবাদের ছেলে আর্ভাণ। বিগত ১৩ বছর তিনি মুম্বইয়ে। প্লেব্যাকে নিজের মতো ছাপ ফেলার চেষ্টা করছেন। এহেন বিতর্ক নিয়ে আর্ভাণের কী মত?
আগে আর্ভাণের নাম ছিল ‘দেব অরিজিৎ’। দেব অভিনীত 'খাদান' ছবিতে তাঁর ‘রাজার রাজা’ গানটি জনপ্রিয় হয়েছিল। বলিউডে তিনি ইনডিপেনডেন্ট গানও শুরু করেছেন, তখন নাম বদলে ‘আর্ভাণ’ করেন। বহরমপুরের ছেলে কিন্তু হলিউডে গিয়েও কাজ করার স্বপ্ন দেখেন, স্বাধীন মিউজিক নিয়ে। অরিজিত সিংয়ের সঙ্গে তাঁর বড় যোগ রয়েছে।
সংবাদ প্রতিদিন-এর তরফে ফোনে ধরা গেল গায়ককে। "এত বড় ব্যানারে প্রীতমদার সঙ্গে কাজ, অক্ষয় কুমারের কণ্ঠে গান, প্রিয়দর্শন স্যরের পরিচালনায়, এমন কাজ প্রথম। সামনে আরও ভালো কিছু করতে হবে", বলছিলেন আর্ভাণ। ইতিমধ্যে ৩৪ মিলিয়নের বেশি ভিউস হয়েছে তাঁর গাওয়া হিন্দি গানের। বিতর্কের কারণে ভিউস বেড়েছে অনেকেই মনে করছেন। আর্ভাণ কী বলছেন? তাঁর কথায়, "লোকের কাছে বিষয়টা বিতর্ক হিসেবে যাচ্ছে। আমি নিজে তো বাঙালি, প্রীতমদাও বাঙালি। আমাদের কাছে লিরিসিস্ট কুমার স্যরের তরফে ব্রিফ ছিল যে, ইট’স আ ট্রিবিউট। অক্ষয় কুমার এবং প্রিয়দর্শন দুজনেই সত্যজিৎ রায়ের বড় ফ্যান। গীতিকার কুমার স্যরের কাছে ব্রিফ ছিল যে, ভূত নিয়ে এমন কিছু করতে হবে। বিতর্কের প্রসঙ্গে বলি রাগ, স্কেল অনুযায়ী দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। শেষের 'আহা ভূত'-এর মিলটা নিশ্চয়ই আছে। শব্দগত মিল থাকলেও কম্পোজিশন আলাদা। এটা যে পুরোপুরি শ্রদ্ধার্ঘ্য, সেকথা প্রীতমদাও বলেছেন।"
প্রায় পাঁচ বছর তিনি প্রীতমের সঙ্গে কাজ করছেন। সত্যজিতের সৃষ্টি থেকে 'কপি করা'র অভিযোগের পাশাপাশি গানের দৃশ্যায়ন নিয়েও আপত্তি উঠেছে। একজন বাঙালি হিসেবে গানটা গাইতে গিয়ে আপত্তিজনক মনে হয়নি? আর্ভাণ বলছেন, "আমি যখন জানি, এটা সত্যজিৎ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য, তাহলে কেন আপত্তি হবে!" গানের দৃশ্যে অক্ষয় কুমারের কাঁধে স্বল্পবসনা এক পেত্নি। অন্যদিকে সত্যজিতের মাস্টারপিস-এর অনুপ্রেরণায় শ্রদ্ধার্ঘ্য দেওয়া হচ্ছে– এটা আরও সমস্যার জায়গা। উত্তরে আর্ভাণ বলছেন, "আমি বুঝতে পারছি, লোকজনের আপত্তি হওয়া স্বাভাবিক। পিকচারাইজেশন তো আমাদের হাতে নেই। সেই বিষয় আমার মন্তব্য না করাই ভালো।" তিনি আরও যোগ করলেন, "যাঁরা সমালোচনা করছেন, তাঁরা সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখে বড় হয়েছেন। এখনকার জেন জি সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে জানলেও, মনে হয় না গানটা সম্পর্কে জানত। আমার ভাইপোই জানত না। তারা বিতর্কের কারণে জানল গানটা সত্যজিৎ রায়কে ট্রিবিউট দেওয়া হয়েছে। এবং এই ইন্ডিপপ, কে পপ-এর যুগে হয়তো ফিরে গিয়ে তারা গানটা শুনবে।’
অক্ষয় কুমারের 'ভূত বাংলা'র গানে সত্যজিৎ রায়কে অবমাননা বিতর্কে মুখ খুললেন গায়ক আর্ভাণ। ছবি- সংগৃহীত
আর্ভাণের কাছে এই গানের সুযোগ এসেছিল সুরকার প্রীতমের মাধ্যমে। স্ক্র্যাচ গেয়েছিলেন তিনি প্রথমে। জানালেন তখন গানটা অনেকটা অন্যরকম ছিল। মিল হচ্ছে বুঝে, তাঁরা কিছুটা আলাদাও করেছিলেন। ক্যাচি যেটা হয়, সেই স্ক্র্যাচটাই নেওয়া হয় শেষ পর্যন্ত। তবু বাঙালি হিসেবে একটা দায়িত্ব তো থাকে। এরপর গাইতে গেলে কি আরেকটু সচেতন থাকবেন? প্রশ্ন করাতে তিনি বলছেন, "প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে সত্যি অত স্বাধীনতা থাকে না। আমি নতুনই বলব প্লেব্যাকে। আমি যদি বলি গাইতে পারব না, অন্য কাউকে নিয়ে নেবে।"
টলিউডে 'লাভ আজ কাল পরশু', 'ধর্মযুদ্ধ', 'হোম কামিং' ছবিতে গেয়েছেন আর্ভাণ। এছাড়া 'এসভিএফ'- মিউজিকের একটি কভারও করেছেন তিনি। দেব অভিনীত 'খাদান' ছবিতে তাঁর ‘রাজার রাজা’ গানটি জনপ্রিয় হয়েছিল। আগে আর্ভাণের নাম ছিল ‘দেব অরিজিৎ’। লোকে কনফিউজড হয়ে যেত। বলিউডে তিনি ইনডিপেনডেন্ট গানও শুরু করেছেন, তখন নাম বদলে ‘আর্ভাণ’ করেন। বহরমপুরের ছেলে কিন্তু হলিউডে গিয়েও কাজ করার স্বপ্ন দেখেন, স্বাধীন মিউজিক নিয়ে। অরিজিত সিংয়ের সঙ্গে তাঁর বড় যোগ রয়েছে। বহরমপুরে তাঁর ব্যান্ড ছিল। একজন কমন ফ্রেন্ডের মাধ্যমে অরিজিতের সঙ্গে আর্ভাণের আলাপ হয় একটা গানের সূত্রে। আলাপের পরে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। অরিজিৎ-ই তাঁকে প্রীতমের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। এবং রাতারাতি ২০১৩ সালে মুম্বই চলে যান আর্ভাণ। আপাতত বিতর্ক পেরিয়ে নতুন গানের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
