ছবির নামে রহস্য। ফিল্মে রহস্য কই? লিখছেন শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
অনীক দত্ত’র ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দেখে বিলকুল হেলে গিয়েছিলাম৷ গোটা ছবিতে হেন সিকোয়েন্স নেই যেখানে মজার আচমকা বিস্ফোরণ নেই৷ সুরে, সংলাপে, কাহিনির ঝোঁক-ফাঁকে সারাক্ষণ একটা ‘কী-হয়? কী-হয়?’ ভাব৷ রসের সঙ্গে মাখামাখি হয়ে একটা রহস্যও৷
অতীব স্মার্ট ডায়ালগ, ঝাঁ চকচকে সিনেমাটোগ্রাফি, চমৎকার অভিনয় সমাবেশ, প্রায় নিখুঁত সম্পাদনা এবং বেশ দক্ষ পরিচালনা সত্ত্বেও ‘মেঘনাদবধ রহস্য’-র রহস্যটা যে কী ও কেন, সেটা ঠাওরাতেই দর্শক এবার হেলে পড়ল৷ যে অনীক দত্তকে বাংলা ছায়াছবির ভবিষ্যৎ ভাবছিলাম অ্যাদ্দিন (এখনও ভাবি) তিনি এবার বাংলার সাহিত্য ও রাজনীতির অতীত নিয়ে পড়েছেন৷ তাঁর কাহিনি বিন্যাসের দুই মেরুতে মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ ও নকশাল আন্দোলন৷ সাহিত্য ও দর্শনের টেক্সটকে রহস্যকাহিনির অঙ্গীভূত করার দুরন্ত চর্চা আছে বিদেশে (উম্বের্তো একো-র ‘দ্য নেম অফ দ্য রোজ’ যার এক অপরূপ নিদর্শন), আর তাকে সিনেমায় প্রয়োগ করারও তুখড় কেরামতি দেখিয়েছেন জঁ জাক আনো-র মতো কেউ কেউ৷ সেদিক দিয়ে অনীক বেশ একটা নতুন হাওয়াও আনলেন বাংলায় ৷
[পোস্টারে কেন কাটা হল মধুসূদনের নাম, অনীকের ছবি ঘিরে বিতর্ক]
তবে সমস্যা এটাই যে, রহস্য গল্পকে শেষ অবধি রহস্য গল্প হতেই হয়৷ অর্থাৎ তাকে গল্প হয়ে উঠতেই হবে৷ সাহিত্য—সংস্কৃতি—দর্শন— রাজনীতির তাবৎ পরত পেরিয়ে৷ এবং তা যতই জটিল ও দুর্বোধ্য হোক, তাঁর গড়ন ও সমাধান হতে হবে স্বচ্ছ ও সাবলীল৷ অনীকের এই ছবিতে ক্রমাগত চরিত্র আমদানি ও সংলাপের ধার ও ভার বাড়ানোর যতখানি নজর দেখা গেল তার অনেকটাই যেতে পারত গল্প বাঁধায়৷ আর একটা কথা–যেটা সত্যজিৎ খুব সুন্দর দেখিয়েছেন গল্পে৷ গল্পে– রহস্যকাহিনিকে সুন্দর ছাঁচে গড়লে ও তার সমাধান জোগালে তা প্রায় সিনেমার মতোই হয়ে যায়৷ কাহিনি বিস্তারের যত ডিটেলে গিয়েছে ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ ততই গল্পটা সরে গিয়েছে রহস্য থেকে৷ তাতে অতি পোক্ত সিনেমার কারিকুরিও কাজে দেয়নি৷
ছবির নায়ক অসীমাভ বসুর (সব্যসাচী) নতুন বইয়ের জমজমাট উদ্বোধন দিয়ে ছবির শুরু৷ তিনি অক্সফোর্ড নিবাসী এবং ইংরেজিতেই লেখেন৷ কলকাতায় এসে তিনি সাধু বাংলায় একটা গল্প লেখা ধরলেন৷ নাম রাখলেন ‘স্বীকারোক্তি’৷ স্বীকারোক্তি কেন এবং কতখানি, তা জানতে ছবিটা দেখতে হবে৷ অসীমাভর দ্বিতীয়া স্ত্রী ইন্দ্রাণী (গার্গী) যতখানি গর্বিত স্বামীর কাজ ও যশে প্রায় ততখানিই অনুরক্ত মধ্যবয়সি ফিল্মমেকার বন্ধু কুণালের (আবির) প্রতি৷ স্বামীর সঙ্গে ইন্দ্রাণীর বয়সের ফারাকটা চোখকাড়া৷ হঠাৎ এক সকালে অসীমাভর নিরুদ্দেশ হওয়ার পিছনে এই বন্ধুটির যোগ কি কিছু ঘটায়? এরকম অনেক যোগ ও বিয়োগই কারণ হতে পারে৷ কিন্তু যেভাবে গল্পটা গড়ায় তাতে দর্শকের কৌতূহল আর বিশেষ গড়ায় না৷ চকচকে সংলাপ, নকশালবাড়ি, চার্চিল, নোটবন্দি, পোয়ারো, টিনটিন কমিক্সের গোয়েন্দাযুগল টমসন অ্যান্ড টমসন ইত্যাদি রেফারেন্সে মজে যাই আমরা৷ আর হ্যাঁ, ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে ৷
‘মেঘনাদবধ রহস্য’-য় অভিনয়ের সুন্দর সুযোগ পেয়েছেন সব্যসাচী, গার্গী, আবির, বিক্রম, কল্যাণ ও সায়নী৷ পার্শ্বচরিত্রের সংখ্যাও রীতিমতো বড়, এবং সেখানেও চোখে পড়ার মতো কাজ আছে৷ শেষ অবধি ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ অনীক দত্তরই একটা সিগনেচার অফারিং, নানা দিক দিয়ে৷ একটা অল রাউন্ড পারফরম্যান্স৷ যাঁরা সিনেমা ভালবাসেন তাঁরা এই ছবি অবশ্যই দেখুন, একটা ভিন্ন স্বাদের জন্য৷ যাঁরা রহস্য ভালবাসেন তাঁরা আর একটু অপেক্ষায় থাকুন, ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ নির্মাতার ভবিষ্যৎ রহস্যের জন্য৷
মেঘনাদবধ রহস্য
পরিচালক: অনীক দত্ত
অভিনয়: সব্যসাচী চক্রবর্তী, গার্গী রায়চৌধুরি, আবির চট্টোপাধ্যায়, বিক্রম চট্টোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ
The post অল রাউন্ড পারফরম্যান্স আছে, কিন্তু অনীক কোথায় আপনার টাচ? appeared first on Sangbad Pratidin.
