'রে'-ঘটক-সেন... সিনেপ্রেমী বাঙালিদের ড্রয়িংরুমে উঁকি মারলে কিংবা কান পাতলেই দেখবেন, চা-মেরি সহযোগে এই তিন নাম এখনও জপেন তাঁরা। সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল শুধু বাংলা চলচ্চিত্র নয়, ভারতীয় তথা অন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ইতিহাসেরও একেকটা মাইলস্টোন। কার ছবির ভাষা তুখোর বেশি, কে কোন ছবিতে কতটা জীবনদর্শনের কোন দিকটিতে বেশি আলো ফেলেছেন, কে তা করেননি– এসব কাটাছেঁড়ায় বাঙালির লাগাম টানা দায়! বরং, বলি কি তুলনা না টানাই ভালো। এঁরা যে যাঁর কাজে একেকজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। এত কথা লেখার একটাই কারণ। আজ মৃণাল সেনের জন্মদিন। আর মৃণাল সেনের প্রসঙ্গ উঠলে তো ঋত্বিক ঘটক এবং সত্যজিত রায়ের কথা অনায়াসেই এসে যায়। বাংলা সিনেমাকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে ঘটক এবং রায়ের সঙ্গে ইনি জুড়ে গিয়েছেন অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে।
বেকারত্ব, মধ্যবিত্তের জ্বালা, সাতের দশকের রাজনৈতিক হিংসা-দুর্নীতি, তৎকালীন কলকাতার টুকরো টুকরো হতাশার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭১), ‘ক্যালকাটা ৭১’ (১৯৭২) এবং ‘পদাতিক’ (১৯৭৩) সিনেমার মাধ্যমে। এই তিনটি ছবিতেই তিনি তৎকালীন কলকাতার অস্থির পরিস্থিতিকে শুধু তুলেই ধরেননি, বরং তৎকালীন বাঙালিমননেও গেঁথে দিতে পেরেছিলেন।
জন্মশতবর্ষের বছর তিনেক পেরিয়ে সিনেপ্রেমীদের স্মৃতিচারণায় আজও জ্যান্ত তাঁদের 'মৃণালদা'। ফাইল ছবি
পরিচালক হিসেবে আজীবন নিজেকে ভেঙেছেন। চেনা ছক, চেনা গতি ভেঙে আরও দুর্বার হয়েছেন। ছাপিয়ে গিয়েছেন পারাপার। মেইনস্ট্রিম ছবির পাশাপাশি সমান্তরালভাবে রূঢ় বাস্তব সমাজের ন্যাড়া চেহারাকে তুলে ধরেছেন রূপোলি পর্দায়। আপন মনের সূক্ষ্মবোধগুলো দিয়ে চুপিসাড়ে একপ্রকার বিপ্লবই ঘটিয়েছেন বলা চলে। পরিচালক হিসেবে হাতেখড়ি হয় ১৯৫৫ সালে ‘রাতভোর’ ছবি দিয়ে। সে ছবি অবশ্য তখন খুব একটা পরিচিতি পায়নি। তবে, পরিচালক হিসেবে তিনি যে ভারত তথা বিশ্বের যে কোনও পরিচালককে যে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারেন, সেটা তৎকালীন সিনে-বোদ্ধারা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ‘নীল আকাশের নীচে’ এবং ‘বাইশে শ্রাবণ’ দেখে। তবে, ১৯৬৯ সালের ‘ভুবন সোম’ পরিচয় করায় এক অন্য মৃণাল সেনের সঙ্গে। দূরত্ব, ভালবাসা, বিশ্বাস– কী অদ্ভুতভাবে মিলেমিশে গিয়েছে ‘ভুবন সোম’-এর গল্পে। এই ছবির বড় প্রাপ্তি উৎপল দত্তের অভিনয়।
‘মৃগয়া’, ‘খণ্ডহর’, ‘আকাশ কুসুম'... মৃণাল পরিচালিত 'মাস্টারপিসে'র নামোল্লেখ করে শেষ করা যাবে না। প্রত্যেকটি সিনেমাতেই ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ পেয়েছে তাঁর ভবিষ্যতের মণিমাণিক্যকে।
শুটিংয়ের ফাঁকে পরিচালক মৃণাল সেনের সঙ্গে শাবানা আজমি। ফাইল ছবি
মৃণাল সেনের কথা বললে তাঁর 'কলকাতা ট্রিলোজি'র কথা বলতেই হয়। বেকারত্ব, মধ্যবিত্তের জ্বালা, সাতের দশকের রাজনৈতিক হিংসা-দুর্নীতি, তৎকালীন কলকাতার টুকরো টুকরো হতাশার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭১), ‘ক্যালকাটা ৭১’ (১৯৭২) এবং ‘পদাতিক’ (১৯৭৩) সিনেমার মাধ্যমে। এই তিনটি ছবিতেই তিনি তৎকালীন কলকাতার অস্থির পরিস্থিতিকে শুধু তুলেই ধরেননি, বরং তৎকালীন বাঙালিমননেও গেঁথে দিতে পেরেছিলেন। আর সেখানেই মৃণাল সেনের সার্থকতা। কারণ সিনেমাকে বরাবরই 'সমাজের আয়না' হিসেবে সম্বোধন করা হয়। কালচক্রে সেই সিনে-রীতির কলেবর বদলানোয় মৃণাল সেনরা এভাবেই আজও বিশ্ব সিনেমার দরবারে প্রাসঙ্গিক।
মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে মৃণাল সেন তুলে ধরেন বহুল প্রশংসিত দুই ছবি ‘একদিন প্রতিদিন’ (১৯৭৯) এবং ‘খারিজ’ (১৯৮২) ছবিতে। ১৯৮৩ সালে 'কান' যাত্রা হয়েছিল ‘খারিজ’-এর। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কারও পেয়েছিল এই সিনেমা। ‘মৃগয়া’, ‘খণ্ডহর’, ‘আকাশ কুসুম'... মৃণাল পরিচালিত 'মাস্টারপিসে'র নামোল্লেখ করে শেষ করা যাবে না। প্রত্যেকটি সিনেমাতেই ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ পেয়েছে তাঁর ভবিষ্যতের মণিমাণিক্যকে। তাই জন্মশতবর্ষের বছর তিনেক পেরিয়ে সিনেপ্রেমীদের স্মৃতিচারণায় আজও জ্যান্ত তাঁদের 'মৃণালদা'।
