জঙ্গলমহল পুরুলিয়ার লাক্ষা রপ্তানি করার জন্য আন্তর্জাতিক বাজার খুলে দিয়ে রপ্তানি হাবের আওতায় নিয়ে আসছে কেন্দ্র। তাই এই লাক্ষা শিল্পে ডিস্ট্রিক্টস এস এক্সপোর্ট হাবস (ডিইএইচ) উদ্যোগের আওতায় চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে এখানকার লাক্ষা ব্যবসায়ীরা এক্সপোর্ট প্রমোশন মিশন সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ 'ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট, ওয়ান প্রোডাক্ট'-র সঙ্গেও যুক্ত। জঙ্গলমহলের লাক্ষা ব্যবসায়ীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস, স্পেনের বার্সেলোনা, সুইজারল্যান্ডের জেনেভা, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বাণিজ্য করতে পারবেন। সবে মিলিয়ে লাক্ষাকে ঘিরে বনমহলের এই জেলাকে জাতীয় লাক্ষা হাবের রূপ দিতে একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মাধ্যমে সব রকম সহায়তা করছে নয়াদিল্লি।
একনজরে লাক্ষার খতিয়ান
২০২৩-২৪ সাল: ২০,৩৩২ টন উৎপাদন। রপ্তানি মূল্য ১৪৮. ৯৮ মিলিয়ন ডলার
২০২৪-২৫ সাল: ২২,১৪৯ টন উৎপাদন। রপ্তানি মূল্য ১৬০.৫৫ মিলিয়ন ডলার
২০২৫-২৬ সাল: ২১,২৭২ টন উৎপাদন। রপ্তানি মূল্য ১৭৩. ৮৭ মিলিয়ন ডলার
চলতি মাসের ১১ তারিখ মঙ্গলবার লোকসভায় প্রশ্নোত্তর পর্বে পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো লাক্ষা বিষয়ে পাঁচটি প্রশ্নের নিরিখে কেন্দ্রের বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী জিতিন প্রসাদ পুরুলিয়াকে ঘিরে লাক্ষা রপ্তানি হাবের সুখবর জানান। গত জুন মাসের শেষের দিকেই লাক্ষা জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। তারপর সাংসদের প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রের এই ঘোষণা
লাক্ষাকে ঘিরে পুরুলিয়ার অতীতের গরিমাকে ফিরিয়ে আনবে। জঙ্গলমহলের এই জেলার অর্থনীতিও চাঙ্গা হবে। বলা যায় এই শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটবে।
বলরামপুরের লাক্ষা। নিজস্ব চিত্র
ইতিমধ্যেই লাক্ষাকে ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকার উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রকের আওতায় বন ধন বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। জেলার ২০ টি ব্লকের মধ্যে ১২ টি ব্লকের ৭০০ হেক্টর জমিতে এই চাষ হচ্ছে। এই চাষে যুক্ত কৃষকদের জন্য ২৩ টি কৃষক উৎপাদক সংস্থা গঠন করা হয়েছে। লাক্ষাকে ঘিরে জঙ্গলমহলের এই জেলার আদিবাসী মানুষজনের যাতে জীবিকা সুরক্ষিত ও রপ্তানির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি বদলানো যায় এই চেষ্টা করছে কেন্দ্র। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা ট্রেড ফিনান্স, সুদের ছাড়, ক্রেডিট গ্যারান্টি, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং, আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ, লজিস্টিক রপ্তানি গুণমান সহায়তা পাবেন।
সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো বলেন, "লাক্ষা পুরুলিয়ার শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী ফসল নয়। হাজার হাজার পরিবারের জীবিকার সঙ্গে তা জড়িত। বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বহু পরিবার এই চাষের উপর নির্ভরশীল। পুরুলিয়াকে দেশের অন্যতম প্রধান লাক্ষা হাব হিসাবে গড়ে তোলায় আমাদের প্রধান লক্ষ্য।" একশো বছরের বেশি সময় আগেকার কথা। সময়টা ১৯০৮। লাক্ষা চাষের উপযোগী ওই গাছের প্রাচুর্য দেখে মির্জাপুর থেকে পুরুলিয়ার জঙ্গলমহল বলরামপুরে এসেছিল জয়সওয়াল কোম্পানি। তাদের হাত ধরেই লাক্ষা চাষ শিল্পে রূপান্তরিত হয়। দক্ষ শ্রমিক নিয়ে আসা হয় মির্জাপুর থেকে। তারপর দেশের মধ্যে বলরামপুর লাক্ষা শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু দেড় দশক আগে এই শিল্প ধুঁকছিল। ক্লাস্টার হওয়ার পর এই শিল্পে খানিকটা গতি আসে।
বলরামপুর সেলেক ক্লাস্টার শিল্প সমবায় সমিতির সম্পাদক রঞ্জিত মাঝি বলেন, " জি আই স্বীকৃতিতে আমাদের ব্যবসার আরও প্রসার ঘটেছে। এবার রপ্তানি হাবের আওতায় আসায় মনে হচ্ছে অতীতের সোনালী দিন ফিরে আসবে।" এই লাক্ষা থেকে তৈরি হয় গালা। যা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত সহ বিদেশে যায়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইতালি, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও নেপালের মতো দেশ গুলিতে রপ্তানি হয়। এবার আন্তর্জাতিক মানচিত্রে আরও পরিধি বাড়িয়ে জঙ্গলমহল পুরুলিয়ার লাক্ষা আরও ব্যাপকভাবে রপ্তানি হবে।
প্রায় ১৬০ রকমের দ্রব্যে লাক্ষা কাজে লাগে। সুগন্ধি শিল্প, রান্নার রং, নৌকা, ওষুধ-সহ বিভিন্ন সামগ্রীতে লাক্ষার প্রয়োজন হয়। ওই গালা থেকে বহু হস্তশিল্প তৈরি করা হয়। পুতুল, চুড়ি বা ঘর সাজানোর নানা সামগ্রীতে এই শিল্পের কদর রয়েছে। এই জেলায় বলরামপুর ছাড়াও ঝালদা এলাকাতেও ছোট ছোট ভাটা রয়েছে। ইতিহাস বলে, এই শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষ যুক্ত থাকায় এখানকার ধর্মঘট আন্দোলন থেকেই জঙ্গলমহল বলরামপুরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ১৯৪২-৪৩ সালে বলরামপুরে লাক্ষা কুটির প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। পলাশ ও কূল গাছে লাক্ষা হয়। এই জেলায় বিপুল সংখ্যক পলাশ গাছ থাকা এই জেলায় লাক্ষা উৎপাদন বাড়িয়েছে। দেশের নিরিখে ফি বছর লাক্ষার উৎপাদন বাড়ছে।
