অরিগানো একটি চমৎকার ভেষজ গাছ। এই গাছ প্রায় ৩ ফুট পর্যন্ত বাড়ে। অরিগানো খুব সহজেই আপনার বাড়ির ছাদে বা উঠোনে লাগানো যেতে পারে। এই গাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুষ্টি উপাদানও রয়েছে। লিখছেন স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ তন্ময় সরকার।
আমরা সদা চিকিৎসকের উপর নির্ভরশীল। কথায় কথায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া আর মুঠো মুঠো ওষুধ খেতে কেউই পছন্দ করি না। যত দিন যাচ্ছে ঔষধি গাছের ব্যবহারও কমে আসছে, কেন না এরকম প্রচুর ঔষধি গাছ আমাদের চারপাশেই আছে কিন্তু আমাদের অজানা। আমরা তাড়াতাড়ি রোগ নিরাময়ের জন্য আলোপাথির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের চারপাশেই আছে এই সমস্ত ভেষজ উদ্ভিদ যেগুলো শুধু আপনার চিকিৎসার ব্যয় কমাবে তাই না, এর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগের থেকেও পরিত্রাণ পাওয়া যায়। এমনই একটি চমৎকারী ভেষজ গাছ অরিগানো।
অরিগানো একটি মেক্সিকান মিন্ট, ওয়াইল্ড মারজোরাম নামেও পরিচিত। এই গাছটি প্রায় ৩ ফুট পর্যন্ত বাড়ে। অরিগানো খুব সহজেই আপনার বাড়ির ছাদে বা আঙিনায় লাগানো যেতে পারে। এই গাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুষ্টি উপাদান রয়েছে। অরিগানোর প্রতি চা চামচে রয়েছে ২৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ফাইবার ০.৮ গ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ৫ গ্রাম, পটাসিয়াম ২৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ই ০.৩০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে ১১.৫ মাইক্রোগ্রাম, লোহা ০.৬৫ মিলিগ্রাম এবং শক্তি ও ক্যালোরি। এটি মূলত একটি সালাদ আইটেম এবং টম্যাটো, সস, রসুন, পিজ্জা, স্যান্ডউইচ ও জলপাই তেলের সঙ্গেও ব্যবহার করা হয়।
ক্যানসার প্রতিরোধ করে
অরিগানো দেহ থেকে বিষাক্ত উপাদান দূর করে। লায়োফিলাইজ অরিগানো (ORE) কম মাত্রাতেই স্তন ক্যানসার প্রতিরোধে ভালো ফল দিয়েছে। এই গাছের ফাইটোকেমিক্যাল বয়সের কারণে দেহের ক্ষয় নিরাময় করে। এমনকী এটি দেহের ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় ও রক্তে চিনির পরিমাণ কমিয়ে দেয়। আর তার জন্য নিয়মিত অরিগানো চা পান করা উচিত।
মানসিক চাপ কমায়
এতে আছে ভিটামিন সি এবং অন্যান্য অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। বমি অথবা মাথা ঘুরলে অরিগানো চা পান করে বিশেষ উপকার পাওয় যায়।
জ্বর, সর্দি-কাশি
আবহাওয়া বদলানোর সময় দেখা যায় জ্বর, সর্দিকাশির মতো রোগ। ঠান্ডা লাগা, কাশি, ম্যালেরিয়াল জ্বর, হাঁপানি ইত্যাদি রোগে অরিগানো পাতা একটি মহা ঔষধ। প্রতিদিন এক গ্লাসে তিন ড্রপ অরিগানো তেল যেকোনও ফলের রসের সঙ্গে মিশিয়ে পান করুন, শীতের সময়ে বিশেষ করে প্রতিদিন পান করলে অনেক রোগ থেকে মুক্তিলাভ করা সম্ভব। এছাড়া, দ্রুত সর্দিকাশি নিরাময়ের জন্য হালকা উষ্ণ জলে ২-৩ ফোঁটা অরিগান তেল মিশিয়ে জলের বাষ্প শ্বাসের দ্বারা গ্রহণ করুন।
অ্যান্টি-প্রদাহজনক বৈশিষ্ট্য
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হাড়গুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্ষয় হতে শুরু করে। তাই আমাদের উচিত প্রাথমিক বয়সে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল পাওয়া যায় যাতে তা নিশ্চিত করা। ক্যালসিয়াম, লোহা এবং ম্যাঙ্গানিজ হাড়ের বৃদ্ধি, হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, রক্ত জমাট করা প্রোটিন উৎপাদনের জন্য ভিটামিন কে
গুরুত্বপূর্ণ। অরিগানোতে এই সকল মিনারেল, প্রোটিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে অরিগানো পাতা থেকে প্রস্তুতকৃত চা নিয়মিত পান করলে ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্র ভালো থাকে।
শরীরের ব্যথা কমায়
অরিগানো তেল ব্যবহারে মাংসপেশির খিচুনি রোগ, জরায়ুর পেশি, এবং মাথাব্যথা দ্রুত সেরে যাবে। হাড়ের জয়েন্টগুলোতে। অরিগানো তেল এক ফোঁটা ও এক চামচ জলপাই তেল একসঙ্গে মিশিয়ে লাগিয়ে রাখলে ব্যথ্যর দ্রুত উপশম হয়।
লিভার ও কিডনির ক্ষতি রোধ করে
কিডনিতে পাথর হলে অরিগানো চা টানা ৬ মাস পান করলে পাথর মূত্রের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এর সঙ্গে সঙ্গে পাকস্থলীর প্রদাহ নিরাময় করে।
আন্টি-ব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্য
অরিগানোর পাতা হল প্রোফাইল্যাক্টিভ যা ছত্রাকের সংক্রমণ/পোকামাকড় কামড় দিলে উপশম করতে সক্ষম হয়। পোকায় কামড়ালে বা শরীরের যে কোনও অংশ যদি পুড়ে যায় তাহলে অরিগানো তেল এক ফোঁটা এবং এক চা চামচ জলপাই তেল একত্রে মিশিয়ে লাগালে কামড়ের ব্যথা ও জ্বালা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। পায়ের নখে অথব্য পায়ে জীবাণুর আক্রমণে ২-৩ ফোঁটা অবিগানো তেল জলে দিয়ে পা কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখুন।
চুলের সুস্বাস্থ্য
যদি আপনার চুলে খুসকি বা মাথার তালুতে ইনফেকশান হয় তবে মাথায় চুলের উপযোগী যেকোনও তেলের সঙ্গে অরিগানো তেল দু-তিন ফোঁটা মিশিয়ে চুলে প্রয়োগ করুন। এরপর শ্যাম্পু দিয়ে ৪৫ মিনিট পর ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
ত্বকের সমস্যা
ত্বকের কালো ছোপ দাগ, ব্রণ দূর করা এবং ত্বকের চমক বাড়ানোর জন্য হাফ কাপ ঘৃতকুমারী, এক চামচ শশার রস এবং তিন ফোঁটা অরিগানো তেল মিশিয়ে ত্বকে প্রয়োগ করুন। এরপর ঠান্ডা জল দিয়ে পাঁচ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এই মিশ্রণটি আপনি সাত দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রেখে ব্যবহার করতে পারেন। তবে যদি কারও ত্বকে অ্যালার্জি থাকে তাহলে এটি ব্যবহার না করাই ভালো।
অরিগানো চা তৈরি
অরিগানো পাউডার বাজার থেকে কিনে এনে খুব সহজেই অরিগানো চা তৈরি করতে পারেন। জল ১০ মিনিট ধরে ফুটিয়ে, উষ্ণ ১ কাপ জলের সঙ্গে ১ কাপ চা চামচ শুকনো অরিগানো গুঁড়ো ঢেলে তৈরি করে ফেলুন চা। চা কিছুটা তেতোভাব লাগলেও সামান্য পরিমাণ চিনি যোগ করে নিতে পারেন।
সতর্কতা
আপনার যদি অ্যালার্জি থাকে বা গর্ভাবস্থাকালীন ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় এই চা পান করা যাবে না।
