বিশ্বকাপ ও ইটালি। পাশাপাশি এই দু'টি শব্দ বসালেই আমাদের মনের ভিতরে 'ফুটবল' শব্দটাও ভেসে উঠবে। মনে পড়বে পাওলো মালদিনিকে। মনে পড়বে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের শেষ লগ্নে গোলপোস্টের অনেক উপর দিয়ে শট মারার পর রবার্তো বাজ্জিওর হতাশ মুখ। মনে পড়বে পাওলো রসি কিংবা বুঁফোকে। অথবা... অযথা তালিকা দীর্ঘ করে লাভ নেই। এই লেখা বিশ্বকাপ, ইটালি, ক্রিকেটকে পাশাপাশি বসানোর অভিপ্রায়ে। সোমবার সকালে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে টি২০ বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচ খেলে ফেলেছে ইটালি। স্কটল্যান্ডের কাছে অবশ্য হারতে হয়েছে ৭৩ রানে। তবুও ইটালি ইতিহাস রচনা করেছে বাইশ গজে বিশ্বসেরা হওয়ার লড়াইয়ে মাঠে নেমে! টি-২০ বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করাটাই তো একটা অনন্য কৃতিত্ব তাদের জন্য।
'ক্যালসিও' নামেই শ্বাস নেয় ইটালি। ফুটবলকে ওই নামেই ডাকে সেখানকার মানুষ। কিন্তু ইতিহাস খুঁড়লে আমাদের চমকে যেতেই হবে। ক্রিকেট সেদেশে ফুটবলের চেয়েও পুরনো! ১৭৯৩ সালে ইটালিতে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচের পরিসংখ্যান মেলে! কোথায় হয়েছিল সেই ম্যাচ? নেপলস বন্দরে। যাত্রাবিরতির সময় জাহাজের নাবিকরা অংশ নিয়েছিলেন ক্রিকেট খেলায়। বিখ্যাত ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল হোরাশিও নেলসন সেই ম্যাচটি আয়োজন করেছিলেন। এই নেলসনের কথা একটু বলে নেওয়া যাক। ক্রিকেটে ১১১ সংখ্যাটিকে 'অপয়া' মনে করা হয়। এর গুণিতকের (অর্থাৎ ২২২, ৩৩৩) ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। মনে পড়ে, ওই স্কোরগুলি হলেই কিংবদন্তি আম্পায়ার ডেভিড শেফার্ড একপায়ে লাফাতেন। এই স্কোরকে বলা হয় নেলসন!
কিন্তু কেন? আসলে নেলসনের একটি চোখ, একটি হাত এবং একটি পা ছিল না। তাই এক, এক, এক মিলে ১১১ হয়ে যায় অপয়া। অথচ আসলে কিন্তু হাত ও চোখ একটি করে থাকলেও দু'টি পা-ই আস্ত ছিল তাঁর। তিনটে ১ মিলে তিনটে স্টাম্পের মতো দেখায় বলেই কি ১১১-কে নেলসন অর্থাৎ ব্যাটসম্যানের বোল্ড হওয়া তথা বিপদে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় বলে মনে করা হত? সে যাই হোক, নেলসন ইটালির লোক হয়েও ব্রিটিশদের এই খেলায় এভাবেই টিকে গিয়েছেন। কাজেই ইটালি ও ক্রিকেটের সম্পর্কটা কেমন তা এখান থেকেই অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। ইটালির ফুটবলকে রূপ দিতেও সাহায্য করেছে ক্রিকেটই। এসি মিলানের নাম কে না জানে? সাতবারের ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন ক্লাবটি ১৮৯৯ সালে মিলান ফুটবল অ্যান্ড ক্রিকেট ক্লাব হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আবার, সেদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ফুটবল ক্লাব জেনোয়া ১৮৯৩ সালে জেনোয়া ক্রিকেট অ্যান্ড অ্যাথলেটিক ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবু... যত সময় গিয়েছে, ফুটবল ক্রিকেটকে সরিয়ে নিজেকে সেখানে প্রতিস্থাপিত করেছে। তবে এর পিছনেও ইতিহাস রয়েছে।
হিটলারের 'একনায়কতুতো ভাই' মুসোলিনি ইটালি শাসন করেছিলেন ১৯২২ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত। সেই সময়ই 'ব্রিটিশদের খেলা' ক্রিকেট ক্রমশ ব্যাকফুটে চলে যায়। মুসোলিনির নির্দেশ ছিল 'বিদেশি' খেলাটি থেকে সরে আসার। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যের এক 'প্রোপাগান্ডা টুল' হয়ে ওঠে ফুটবল। আর তারই ফলশ্রুতি 'সিরি এ'-র জন্য সমস্ত তহবিল, পরিকাঠামো ও মনোযোগ... ফলত ফুটবল ক্রিকেটকে ডিঙিয়ে অনেকটা এগিয়ে যায়। ব্যাট-বলের খেলাটি জনজীবন থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এবং সেই রেশ আজও রয়ে গিয়েছে! এই সেদিন, ২০২৩ সালেও উত্তর-পূর্ব ইটালির মনফালকোনেতে ক্রিকেটকে 'অ-ইটালীয়' আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
কিন্তু ব্যাপারটা একরকম থাকেনি সার্বিক ভাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ফের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ফিরতে থাকে। হয়তো প্রবল ভাবে নয়, তবুও... গত শতকের একেবারে শেষদিকে ১৯৯৫ সালে আইসিসি'র সহযোগী সদস্য হয় ইটালি। অবশ্য এর আগে ১৯৮৪ সাল থেকে দেশটির আইসিসি অনুমোদিত একটা ক্রিকেট দলও কিন্তু ছিল। যাই হোক, গত তিন দশকে ক্রিকেট ক্রমশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে ইটালিতে। আজ সেদেশে নথিবদ্ধ পুরুষ ক্রিকেটারের সংখ্যা ৪ হাজার! ৮০টি ক্লাব নিয়মিত ক্রিকেট খেলে।
সেই ইটালি এবার বিশ্বকাপে। জানা গিয়েছে, শিক্ষক থেকে ট্যাক্সি চালক নানা পেশার দক্ষ ক্রিকেটারদের নিয়ে দল গড়া হয়েছে। ফুটবলে চারবার বিশ্বজয়ীদের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে যোগ্যতা অর্জনের কাহিনিতে মিশে রয়েছে রোমাঞ্চ। প্রথমে দেখা গিয়েছিল, ইটালি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছে। কিন্তু আচমকাই স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে দেয় জার্সি। অমনি হিসেব গোলামাল হয়ে যায়। চলে আসে অঙ্কের হিসেব। যদিও প্রথমে ব্যাটিং করে ২০ ওভারে ১৩৪ রানের বেশি করতে পারেনি তারা। তবে রান রেটের হিসেবে ১৫ ওভার পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসকে আটকে রাখতে পারলেই হত। সেটাই করে ফেলে ইটালি। ওই নির্ধারিত সময়ে ১২৫-এর বেশি করতে পারেনি নেদারল্যান্ডস। সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত হয়ে যায় ইটালির বিশ্বকাপ অভিযান। ইটালির ক্রিকেট ফেডারেশনের এক আধিকারিক দলের সঙ্গে ইডেনে এসেছিলেন। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, ''কী করে আমরা বিশ্বকাপে এলাম? ইটালিতে আমরা বলি মিরাকোলো ইটালিয়ানো। অর্থাৎ ইতালীয় মিরাকল।'' মিরাকলই হোক বা লড়াই, ইটালির বিশ্বকাপ ক্রিকেটে নামা এক আশ্চর্য সাফল্য। যে দেশ একসময় ক্রিকেটে মেতে উঠেছিল, তা শতাব্দীর পথ পেরিয়ে অবশেষে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটের স্বাদ পেল। অথচ ইতিহাস সদয় হলে এমনটা অনেক আগেই হতে পারত। ভাবতে বসলে 'মিরাকল' শব্দটা খুব একটা আপত্তিকর ঠেকে না।
