shono
Advertisement
Somnath Temple

মামুদ থেকে ঔরঙ্গজেব, বারবার মুসলিম শাসকদের হাতে ধ্বংস হয়েও অটুট সোমনাথ মন্দির

Published By: Biswadip DeyPosted: 05:38 PM Jan 11, 2026Updated: 05:38 PM Jan 11, 2026

বিশ্বদীপ দে: ৬০০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার। ১৬৬৫-তে শেষবার। বারবার ধ্বংস হয়েছে গুজরাটের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত সোমনাথ মন্দির। সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দির বারো জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম। যেভাবে আগুনের ভিতর থেকে বারবার বেরিয়ে আসে ফিনিক্স, সেভাবেই সোমনাথ ধ্বংস হওয়ার পর ফের নির্মিত হয়েছে। এবং দাঁড়িয়ে থেকেছে গরিমা নিয়ে। রবিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, 'চিরন্তন দেবত্বের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সোমনাথ মন্দির। এর পবিত্র উপস্থিতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষকে পথ দেখিয়ে এসেছে।' গজনির সুলতান মামুদের হামলায় ১০২৬ সালে ধ্বংস হয়েছিল সোমনাথ মন্দির। সেই হিসেবে হাজার বছরের এক ইতিহাস। তাকে ছুঁয়েই ‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব’ কিংবা ‘শৌর্য যাত্রা’ পালিত হয়েছে এদিন। এই লেখায় তাই একবার ফিরে দেখা সেই সব ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের অনন্য ইতিহাস।

Advertisement

কিন্তু সেই ইতিহাস ঘাঁটতে বসলে শুরুতেই চমকে উঠতে হবে। সুলতান মামুদ প্রথম নন। এর আগেও মুসলিম শাসকদের হাতে ধ্বংস হতে হয়েছে পবিত্র এই দেবালয়কে। ৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা বল্লভী এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু নির্মাণের মাত্র ৭৬ বছরের মধ্যেই তা নাকি ধ্বংস করে দেন সিন্ধু প্রদেশের আরব শাসক আল জুনায়েদ। এরপরও আরও একবার নাকি ধ্বংস করা হয়েছিল পুনর্নির্মিত এই মন্দির। কিন্তু সেই ধ্বংসকারীর নাম জানা যায় না। তবে আজ থেকে ঠিক একহাজার বছর আগে গজনির সুলতান মামুদের বাহিনীর হাতে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় সোমনাথ মন্দির। সোলাঙ্কির রাজা মুলরাজের হাতে নতুন করে তৈরি হওয়ার আড়াই দশকের মধ্যেই ঘটে গিয়েছিল এই অনর্থ।

একজন প্রশাসক বা সাম্রাজ্য নির্মাতা হিসেবে নয়, নির্দয় লুণ্ঠনকারী হিসেবেই খ্যাতি মামুদের। কিংবা কুখ্যাতি। আজকের আফগানিস্তানে শুরু হয়েছিল তাঁর শাসনকাল। এই শাসনকালজুড়ে স্রেফ অত্যাচার, ধ্বংসলীলার জলছাপ। ১০২২ সালে তাঁর কানে আসেন সোমনাথ মন্দিরের নাম। পরবর্তী বছরখানেক ধরে যা চলেছিল, তা হল তথ্য সংগ্রহ। সেকালের অন্যান্য রাজাউজির, সাম্রাজ্যবাদী শাসকের মতো স্রেফ স্থানীয় সূত্রের কাছ থেকে খবর জোগাড় করেই ক্ষান্ত হতেন না মামুদ। রীতিমতো গোয়েন্দা নিয়োগ করতেন তিনি। এক্ষেত্রেও তাই করেছিলেন। সেই সব গোয়েন্দারা কেউ ফকির, কেউ বা ব্যবসায়ী সেজে সোমনাথ মন্দির সংলগ্ন সমস্ত এলাকা ছেয়ে ফেললেন। সেখানকার নদী, মন্দির থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি- সমস্ত তথ্যই হাতে এসে গিয়েছিল মামুদের। যার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্য হল- সোমনাথ মন্দিরে যা রয়েছে তা রাজারাজরার তহবিলেও নেই! এই তথ্যই মামুদকে সবচেয়ে লোভী করে তুলেছিল। কিন্তু দ্রুত হামলা করার মতো অস্থিরচিত্ত ছিলেন না তিনি।

দীর্ঘ তিনটে বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কেননা তিনি ভালোই জানতেন ১১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সোমনাথ মন্দিরের পরিবেশ একেবারে অচেনা। তাই ভালো করে আঁটঘাট বেঁধেই এগনোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জানা যায়, তিরিশ হাজার অশ্বারোহী, চুয়ান্ন হাজার পদাতিক সৈন্য, তিরিশ হাজার উট বাহিনী ছিল তাঁর সঙ্গে। এছাড়াও অতিরিক্ত উটের পিঠে চাপিয়ে জল ও অন্যান্য জরুরি জিনিসপত্রও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১০২৫ সালের ৯ নভেম্বর, রমজান মাসে মামুদের সেনাবাহিনী মুলতানে পৌঁছে যায়। রোজা রাখার কারণে রসদ সরবরাহে অসুবিধা তৈরি হলে সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষের আশঙ্কাও সৃষ্টি হয়। আর তাই রমজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন মামুদ। তাছাড়া বিরাট মরুভূমি পেরনোর চ্যালেঞ্জও ছিল। সেই কারণে প্রত্যেক সৈন্যের জন্য দু'টি করে জলবাহী উট বরাদ্দ করা হয়। আর সেই কারণে বাহিনীর সঙ্গে যোগ করা হয় কুড়ি হাজার উট। প্রশ্ন আসতেই পারে, মরুপথে না গিয়ে সহজ পথ তো বাছাই যেত। কিন্তু মামুদ জানতেন অন্যান্য সাম্রাজ্যের মাঝখান দিয়ে যেতে গেলে বাধা পেতে হতে পারে। তাই অপেক্ষাকৃত কঠিন মরুভূমিই বেছে নিন তিনি।

যদিও বাধা তাঁকে পেতে হয়েছিল। লণ্ডরাওয়ার শাসক রাজপুত রাজা রাওয়াল অমর সিং বাধা দেন মামুদ বাহিনীকে। সেই ধাপ পেরিয়ে যাওয়ার পরে রাজা প্রথম ভীমদেবের বাধার মুখে পড়েন তিনি। কিন্তু ভীমদেব বেছে নেন আত্মসমর্পণের রাস্তা। এরপর মোধেরায় অপ্রত্যাশিত ভাবে হাজার বিশেক রাজপুতের বাধার সঙ্গেও লড়তে হয়েছিল মামুদকে। গজনির সেনা ছারখার করে দেয় সেই সব জনপদ। কিন্তু এর সঙ্গেই তাড়া করতে শুরু করে অসুখের করাল থাবা। সমস্ত প্রতিকূলতাকে দূর করে শেষপর্যন্ত সোমনাথের মন্দিরে এসে পড়ে আফগান শাসকের বাহিনী। ভেঙে দেয় মন্দির। চালায় লুটপাট।

মন্দিরের নিজস্ব কোনও বাহিনী ছিল না। মন্দির রক্ষী, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্রাহ্মণরাই ঢাল-তরবারি নিয়ে লড়াই চালায়। তাদের বিক্রম অবাক করেছিল মামুদকে। শেষপর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষকে হত্যা করে তাঁর বাহিনী। সোনাদানা, মূল্যবান পাথর সব চুরি করে। আগুন লাগিয়ে দেয় মন্দিরের একাংশে। অনেক পুরুষ ও নারীকে দাস বানানো হয়েছিল। অনেক পুরুষ ও নারীকে দাস বানানো হয়েছিল। লুটের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। তবে সোমনাথের সরকারি নথিপত্রে দাবি করা হয়েছে, সব মিলিয়ে ২ কোটি দিনারের চুরি হয়েছিল।

মামুদেই কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি হামলার ইতিবৃত্ত। এরপর খিলজির সেনাও হামলা চালিয়েছিল এখানে। পরবর্তী গুজরাটের মুসলিম শাসকরা আরও দু'বার ধ্বংস করেছে সোমনাথ মন্দির। কিন্তু শেষবার মন্দিরে হামলা চালিয়েছিলেন মোঘল বাদশা সম্রাট ঔরঙ্গজেব। সেটা ১৬৬৫ সাল, আগেই বলা হয়েছে।

১৭৮৩ সালে ভেঙে যাওয়া মন্দির পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেন মারাঠা শাসকরা। কিন্তু কাজ শেষ করা যায়নি। যা শেষ হয় স্বাধীনতার পরে। ১৯৫১ সালে সোমনাথ মন্দিরের আধুনিকীকরণ করা হয়। ২০০১ সালে সেই আধুনিকীকরণের ৫০ বছর পূর্তি হয়। রবিবার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ৭৫ বছর পূর্ণ হল। সোমনাথ মন্দির কেবল হিন্দুদের জন্য নয়, সকলের কাছেই এক গর্বের স্থান। সাম্রাজ্যবাদী, দস্যুদের ধ্বংসলীলাতেও তার অটুট অবস্থান, সোনালি প্রত্যাবর্তন তৈরি করেছে এক গরিমায় ভরা ইতিহাস। হাজার বছরের সেই ইতিহাস এক অসীম ঐতিহ্যের প্রতীক।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement