কী সাহিত্যে, কী সিনেমায় চমকে দিতে, মজিয়ে রাখতে জুড়ি নেই গুপ্তধন খোঁজা বা ট্রেজার হান্টের গল্পের। সারাক্ষণ শিরদাঁড়া সোজা। বুকের মধ্যে ধুকপুকানি। বিপদের পর বিপদ। তার মধ্যে বহুরূপী ভিলেন। এবং নির্লোভ অতি বুদ্ধিমান সাহসী এক গুপ্তধন সন্ধানী। গল্পের ছক মোটামুটি একই রকম। সেই কোন ছেলেবেলার মেট্রো সিনেমায় দেখেছিলাম স্টুয়ার্ট গ্র্যানজার অভিনীত ‘কিং সলোমনস মাইনস’! সেই থেকে মজে আছি গুপ্তধনের সন্ধানী গল্পে। যদিও জানি, শেষপর্যন্ত এই গুপ্তধন থেকে যাবে নাগালের বাইরে। রহস্যময় ধূসর অতীতের অঙ্গ হয়ে। তবে ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’ ধরা দিচ্ছে মানুষের নাগালে। কিন্তু অত সোনা শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, কে পাচ্ছে, কার কাজে লাগছে, সেটা জানতে ছবিটা দেখতে হবে।
প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে সৌমিক হালদারের ক্যামেরা সৃজন। সিম্পলি ব্রিলিয়ান্ট। আমার ওলডাস হাক্সলির ওই কথাটা মনে পড়ছিল বারবার : 'এখানে সেই আদিম প্রকৃতি যা মানুষের কোনও শাসন ও নিয়ন্ত্রণে তোয়াক্কা করে না। এখানে এই আগ্রাসী আরণ্যকতায় চলে না ওয়ার্ডসওয়ার্থ - এর প্রকৃতি-ন্যাকামি।'
'সপ্তডিঙার গুপ্তধন'-এর দৃশ্যে আবির চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন চক্রবর্তী, ইশা সাহা।
পারিবারিক সময় কাটানোর ছবি। বাচ্চাদের নিয়ে না দেখলে মজা পাবেন না। আর প্রেমিক-প্রেমিকারা দেখলে দু' ঘণ্টার জন্যে প্রেম নয়, টেনশন। বিরতি পর্যন্ত গল্পের চলন এবং সন্ধানের পথ একরকম। বিরতির পরে আকস্মিক চমক এবং চাপ। ধ্রুব পরিচালিত আগের তিনটি গুপ্তধন সন্ধানী ছবি হল ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’ এবং ‘কর্ণসুবর্ণের গুপ্তধন’। সবকটা ছবির কেন্দ্রেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সুবর্ণ সেন, যিনি 'সোনাদা' নামেও বিশেষ পরিচিত। এই চরিত্রে চমৎকার মানিয়েছে আবির চট্টোপাধ্যায়কে। এই ছবিতেও সোনাদার ভাই আবিরলাল (ভূমিকায় অর্জুন চক্রবর্তী) এবং আবিরলালের প্রায় বউ তবু প্রেমিকা ঝিনুক তার স্বাভাবিক ঝলক, আধুনিক পালিশ নিয়ে (ইশা সাহা)। এ ছাড়া যাঁরা ছবিটাকে জমিয়ে দিয়েছেন তাঁরা অনন্য রজতাভ দত্ত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। এ ছাড়া এক জটিল ধাঁধা হয়ে উঠেছে একটা জীবন্ত চরিত্র। সারাক্ষণ ছড়ি ঘোরাচ্ছে কিন্তু ধাঁধা। সুতরাং অন্যমনস্ক হওয়ার উপায় নেই। ধাঁধার সঙ্গে তাল রেখে চলতে হবে। দর্শকের পুরোপুরি ইনভলভমেন্ট প্রার্থী এই ছবি। এটা সেই ছবি যা আপনাদের প্রতি মুহূর্ত চাইবে। বাচ্চাদের নিয়ে গেলে, প্রতি মুহূর্তে আপনাদের উত্তর দিতে হবে তাদের আগ্রহী প্রশ্নের। আর শুধু ‘তুমি আমি’ পাশাপাশি, কোনও খুনসুটি অ্যালাউ করবে না ‘সপ্তডিঙ্গার গুপ্তধন’। প্রথমত, এই ছবির আরও এক চরিত্র সুন্দরবনের গভীর অরণ্য। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে সৌমিক হালদারের ক্যামেরা সৃজন। সিম্পলি ব্রিলিয়ান্ট। আমার ওলডাস হাক্সলির ওই কথাটা মনে পড়ছিল বারবার : 'এখানে সেই আদিম প্রকৃতি যা মানুষের কোনও শাসন ও নিয়ন্ত্রণে তোয়াক্কা করে না। এখানে এই আগ্রাসী আরণ্যকতায় চলে না ওয়ার্ডসওয়ার্থ - এর প্রকৃতি-ন্যাকামি।'
এই ছবির দশানন ভিলেন, রজতাভ, যার বিকট হাসি এই ছবির ট্রাম্পকার্ড, ছবিটাকে হঠাৎ পাকড়ালো, কলার ধরে। আর এই ছবির সন্দেহাতীত শেষ মেরুদণ্ড অভিনেতা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। কেন?
'সপ্তডিঙার গুপ্তধন'-এর দৃশ্যে আবির চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন চক্রবর্তী, ইশা সাহা।
আরও যে জন্য এই ছবি দেখবেন। যত দিন যাচ্ছে তত ডেডলি হ্যান্ডসাম হচ্ছে আবির। যত দিন যাচ্ছে, সাপুড়ের বাঁশির মতো আকর্ষক হচ্ছে অর্জুন। যত দিন যাচ্ছে, তত ইশারার মতো কুহকী হচ্ছে ইশা। এই ছবির দশানন ভিলেন, রজতাভ, যার বিকট হাসি এই ছবির ট্রাম্পকার্ড, ছবিটাকে হঠাৎ পাকড়ালো, কলার ধরে। আর এই ছবির সন্দেহাতীত শেষ মেরুদণ্ড অভিনেতা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। কেন? ছবিটা দেখলে বুঝবেন। ছবিটা দেখলে বুঝবেন, শেষের তাণ্ডব তিনি! আরও একটা বার্তা, ছবিটা কিন্তু আমাদের সোলারপ্লেক্সাসে মারতেই পারত না ঝোড়ো-ঝাপটা ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের মিউজিক ছাড়া। শেষ কথা হল, এই ছবি দু’ঘণ্টার বিশুদ্ধ বিনোদন।
