দুরন্ত গতিতে ছুটছে জীবন। তথ্য থেকে খাবার, সব চাই মুহূর্তের মধ্যে। সিগন্যাল খোলার সেকেন্ডের মধ্যে শুরু হয়ে যায় হর্ন দেওয়া। প্লেন মাটিতে ল্যান্ড করে ইঞ্জিন বন্ধ করার আগেই নেমে যাওয়ার জন্য তৈরি যাত্রীরা। কীসের এত তাড়া আমাদের? আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় কোথাও তাল কেটে যাচ্ছে না তো? সমর্পণ সেনগুপ্তর প্রথম ছবি ‘প্রত্যাবর্তন’ সেই প্রবল গতিকেই কিঞ্চিৎ লাগাম দেওয়ার কথা বলে।
ছবির শুরু হয় নামী স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্রী দিশাকে সাসপেন্ড করা এবং তার আত্মহত্যার চেষ্টা দিয়ে। দিশার বাবা দীপঙ্কর সান্যাল (শিলাজিৎ মজুমদার) শহরের সেরা কার্ডিও থোরাসিক সার্জেন। মা শালিনী (অপরাজিতা আঢ্য) নামী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সর্বক্ষণের উপদেষ্টা। দিশার প্রয়োজন পূরণের জন্য বাড়িতে রয়েছে পরিচারিকা। বাবা মায়ের হাতে সময় নেই মেয়েকে দেওয়ার মতো। একা হতে হতে একটা সময় সে নিশ্চিত আশ্রয় নেয় সোশাল মিডিয়ার অন্ধকূপে। সেই ভয়ংকর আকর্ষণ একসময় তাকে নিয়ে যায় সর্বনাশের পথে। বিষয় নির্বাচনে সম্ভবত এই মুহূর্তের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিতর্ককে ফের উসকে দিয়েছেন সমর্পণ।
অঞ্জন এবং রূপার ‘যুগান্ত’ জুটির পরে এই ছবিতে আবার তাঁদের একত্রে দেখার অপেক্ষা ছিল দর্শকের। অথচ চিত্রনাট্যে তাঁদের ন্যূনতম রসায়নের জায়গা রাখা হয়নি। অভিনয় সকলেরই যথাযথ।
'প্রত্যাবর্তন' ছবিতে শিলাজিৎ মজুমদার, অপরাজিতা আঢ্য। ছবি- সংগৃহীত
বর্তমান পৃথিবীতে শিশু-কিশোরদের একাকীত্ব এবং তার কারণে ক্রমশ তাদের অবসাদ কিংবা অপরাধে তলিয়ে যাওয়া অন্যতম বড় বিপদ বলে মনে করা হচ্ছে। সেই বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে প্রথম অর্ধে ছবি এগিয়েছে নিজের ছন্দে। কিন্তু দ্বিতীয় অর্ধে দিশার দাদু (অঞ্জন দত্ত) এবং ঠাকুরমার (রূপা গঙ্গোপাধ্যায়) সংস্পর্শে পুরুলিয়া এসে গল্প যেন কিঞ্চিৎ হোঁচট খায়। প্রথমত, চরিত্রায়ণ হিসেবে দেখলে অঞ্জন এবং রূপাকে শিলাজিতের বাবা-মা হিসেবে মানানসই লাগে না। এ ছাড়া ইমেজের কথা বাদ দিলেও যে বয়সের হিসেবে চরিত্রগুলিকে তুলে ধরা হয়েছে তা রীতিমতো বেমানান। এমনকী, দিশার ছোটবেলার যেটুকু অংশ ছবিতে রয়েছে সেখানেও তার বাবা-মায়ের চেহারায় কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন বোধ করা হয়নি। অঞ্জন এবং রূপার ‘যুগান্ত’ জুটির পরে এই ছবিতে আবার তাঁদের একত্রে দেখার অপেক্ষা ছিল দর্শকের। অথচ চিত্রনাট্যে তাঁদের ন্যূনতম রসায়নের জায়গা রাখা হয়নি। অভিনয় সকলেরই যথাযথ। দিশার চরিত্রে অভীপ্সা চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় এবং নৃত্যশৈলীতে দক্ষতা আলাদা করে উল্লেখ করার মতো।
গল্পের মোড় ঘুরিয়ে নাচগান দিয়ে আসল সমস্যাকে অনেকটাই ঢেকে দেওয়া হল, যেটা না হলে হয়তো গল্পের বলিষ্ঠতা প্রকাশ পেতে পারত। সামলে ওঠা যেত ছবির শেষটুকু অন্যভাবে ভাবলে। দশম শ্রেণির এক ছাত্রীর দ্বারা স্কুলের সম্মানহানির ভয়ে সমস্ত অভিভাবকদের উপস্থিতিতে বিচারসভা অত্যন্ত অবাস্তব এক কল্পনা। বিষয় ভাবনায় যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েও কাহিনি ও চিত্রনাট্যের দুর্বলতা প্রত্যাবর্তনের আশা দেখাতে পারল না।
