পরিচালক রাজ কুমার সন্তোষী বলিউডের ব্লু-আইড বয়, তাঁর ছবির প্রায় ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য। বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে তাঁর একাধিক ছবিতে কিছু সামাজিক বক্তব্যও প্রাধান্য পায়। তাঁর নতুন ছবির নাম ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’। নামকরণই জানিয়ে দিচ্ছে দেশভাগের পটভূমিতে কাহিনির বিস্তার। আর র্যাডক্লিফের ছুরিতে দেশভাগের অন্য অর্থ হল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দেশের পূর্ব এবং পশ্চিম দুই পারেই সেই ধর্মভিত্তিক হিংসাত্মক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল বহুদিন একত্রে বাস করা হিন্দু-মুসলমান দুটি সম্প্রদায়। আসগর ওয়াজাহাতের লেখা ‘যো লাহোর নহি দেখা ও জন্মাই নহি’ (যে লাহোর দেখেনি তার জন্মই হয়নি) নাটকের আকারে দেখার সুযোগ ঘটেছে। ওই উপন্যাসকে ভিত্তি করেই রাজকুমার চিত্রনাট্য লিখেছেন ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’। ছবির মূল কাহিনির অনেক শাখা-প্রশাখা তৈরি করেছেন তিনি। অবশ্য সেজন্য গল্পের উদ্দেশ্য এবং বক্তব্যে কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটেনি।
এপারের মিরাট থেকে মাঝবয়সি সিকান্দার মির্জা (সানি দেওল) সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে ওপারের লাহোরে যেতে বাধ্য হন স্ত্রী হামিদা (প্রীতি জিন্টা) দুই ছেলে-মেয়ে জাভেদ (করণ) ও তনভিরকে নিয়ে (খুশি) উদ্বাস্তু পরিচয়ে। ক’টা দিন রিফিউজি ক্যাম্পে কাটানোর পর তাঁদের ভাগ্যে জুটে যায় হিন্দু মালিকের এক বিরাট হাভেলি। নাটক শুরু হয় যখন, দেখা যায় ওই হাভেলিতে এক হিন্দু পাঞ্জাবি বিধবা বৃদ্ধা একাই থাকেন। তাঁর সন্তান দাঙ্গায় নিখোঁজ। সন্তান ফিরে আসার অপেক্ষায় মা একাই রয়েছেন। মুসলিম মির্জা পরিবার বাড়ির দখল নিতে এলে বৃদ্ধা দুর্গা রুখে দাঁড়ান। কিন্তু ধীরে ধীরে সখ্য গড়ে ওঠে দুটি পরিবারে। গল্পের মোড় ঘোরাতে চিত্রনাট্যে এসে পড়ে হিন্দু বিরোধী স্বঘোষিত নেতা ইয়াকুব (অভিমন্যু)। তাঁর দল চেষ্টা করে বিধবা দুর্গাকে দিল্লিতে পাঠাতে। অথচ ওই অল্প ক’দিনের মধ্যেই বৃদ্ধার সঙ্গে ‘মা’-এর সম্পর্ক পাতানো হয়ে গেছে পুরো মির্জা পরিবারের। আসলে ‘মা’-এর কোনও ধর্ম হয় না।
এবার ছবিতে একের পর এক আসতে থাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ‘খেলা’। প্রথম কারণ ‘ঘাতক’, ‘ঘায়েল’ ছবির মাচো নায়ক সানি দেওল শুধু মিষ্টি কথায় উগ্রপন্থীদের হৃদয় বদলাবেন সেটা তো হতে পারে না! সুতরাং বাহুবলী সানিকে হতেই হয়। তিনি একাই ফ্রাঙ্কেস্টাইনের শক্তি নিয়ে ধর্মান্ধ মৌলবি ও গুন্ডাদের শায়েস্তা করে চলে। তবে পরিচালক রাজকুমার একেবারে মোক্ষম তাসটি খেলেছেন শেষ পর্বে, হিন্দু বিধবা দুর্গাবতীর মৃতদেহ সৎকারে মিছিল করে বেরিয়েছে মহল্লার সব মুসলিম পুরুষ। এর মধ্যে দুই ধর্মের পক্ষে অনেক বাণীও শোনানো হয়। শবদেহকে শেষযাত্রায় কাঁধ দিয়েছেন তাঁরাই। এমনকী ‘রাম নাম সত্য হ্যায়’ মন্ত্রটিতেও গলা মিলিয়েছেন। জানি না এমন দৃশ্যটির সংযোজনে দেশের ডবল ইঞ্জিন সরকারি দলের কতটা ডিভিডেন্ড বাড়ল!
পরিচালকের ‘নাটকীয়’ চিত্রনাট্যকে জীবন্ত করে তুলতে অভিনেতারা চেষ্টায় ত্রুটি রাখেননি। প্রথম নাম অবশ্যই শাবানা আজমির। দুর্গার ভূমিকায় তিনি এতটুকু উচ্চকিত নন। ‘স্বাভাবিক’ অভিনয়ে দুর্গাকে প্রাণদান করেছেন তিনি। সানি দেওল তাঁর স্বভাবজাত ভঙ্গিতেই নাটুকে সংলাপ ডেলিভারিতে যেমন দড়, তেমনি অ্যাকশন দৃশ্যওগুলোতেও। মাঝে মাঝেই বাবা ধর্মেন্দ্রর ছায়া এসে ঢেকে দিচ্ছিল। স্ত্রী হামিদার চরিত্রে অনেকদিন পর প্রীতি জিন্টাকে সাবলীল ও স্বাভাবিক লাগল। জাভেদ চরিত্রে দেওল বংশের তৃতীয় প্রজন্ম করণ দেওল পূর্ব পুরুষদেরই অনুসরণ করবেন তেমনটাই জানান দিলেন। অভয় দেওল হবেন না। আরেক জনের নাম অবশ্যই করতে হবে বাস্তুহারা কবি হাবিব আনোয়ারের চরিত্রে আলি ফজল। সন্তোষ শিবনের সিনেমাটোগ্রাফি মুম্বইতেই তৈরি করা লাহোর শহরকে সুন্দর দেখিয়েছেন। জাভেদ আখতারের লেখা এ-আর রহমানের সুরে শান ও অনুরাধা পাড়োয়ালের গলায় ‘কাঁহা চলে গায়ো হো রাম’ গানটি এই ছবির প্রাণ ভোমরা। আক্ষেপ একটাই পরিচালক যদি একটু বাস্তববাদী হতেন! ধন্যবাদ জানাতে হয় অভিনেতা আমির খানকেও। যিনি এই ছবির অন্যতম প্রযোজক। তবে ইমতিয়াজ আলির ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ অনেক বেশি বাস্তব এবং ফিল্মিও বটে।
