কথায় বলে, গোয়েন্দা যেখানেই যান, রহস্য তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে পিছু নেয়। একেন্দ্র সেনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় না। কাজের অবসরে দুই সঙ্গীকে নিয়ে কোথায় হাওয়াবদল করবেন, তা নয়, ঠিক উপদ্রবের মতো উড়ে এসে জুড়ে বসে 'নতুন কেস'। এবার একেনের ঠিকানা পুরুলিয়া। মারাংবুরুর দেশ। প্রথমবার লাল মাটির দেশে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই! উপাসনা আশ্রমের খোয়া যাওয়া বহুমূল্য গয়না সন্ধানের দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হয় তাঁকে। উপরন্তু নিরামিষে উদরপূর্তি করে মস্তিষ্কে শান দিতে নারাজ মাটনপ্রেমী একেন। সবমিলিয়ে পুরুলিয়ায় পাকড়াও অভিযান কেমন হল? জনপ্রিয় এই গোয়েন্দা ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রেমীদের কৌতূহল অস্বাভাবিক নয়।
তাহলে গল্পটা খানিক শুরু থেকে বলা যাক। বাপি এবং প্রমথ 'বাবু-স্যর'কে নিয়ে পুরুলিয়ায় পৌঁছতে না পৌঁছতেই নতুন কেস হাজির হয়। শালপাতা মাটনের খোঁজে গিয়ে নতুন রহস্যই একেনের পিছু নেয়। অগত্যা ভোজনরসিক একেনকে শান্ত করতে 'ঘিয়ের পেড়া'র টোপ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় উপাসনা আশ্রমে। সেখানে আশ্রমের প্রধান মহারাজ অমিয়নাথ সেনের লকার থেকে চুরি যাওয়া বহুমূল্য পান্নার হারের সম্পর্কে জানতে পারেন একেনবাবু। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা কালীপ্রসন্ন সেনের মূর্তিতে যে হার পড়িয়েই এযাবৎকাল কয়েক দিনব্যাপী পৌষ পরবের শুভসূচনা হয়। কিন্তু ওই বহুমূল্য হার খোয়া যাওয়ায় স্থগিত রাখা হয় উৎসব। এদিকে দীর্ঘকালের রীতিতে ছেদ পড়ায় আশ্রমের মর্যাদার চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে যায় অমিয় সেনের। বন্ধু পুলিশ অফিসার নিখিলের হাত ধরে এখান থেকেই শুরু হয় একেনবাবুর অভিযান। তারপর?
'একেনবাবু: পুরুলিয়ায় পাকড়াও'সিরিজের দৃশ্য
প্লট যত এগোয় পুরুলিয়ার রুক্ষ্ম মাটিতে রহস্য ততই বাঁক নেয়। রাতবিরেতে আশ্রমে ছায়ামূর্তির হানা। মহারাজের উপর হামলা। তার সঙ্গে মানভূমের অধিবাসীদের নিজস্ব মানরক্ষার লড়াই। গল্পে চোরাস্রোতের মতো ধরা দেয় প্রেমও। এরমাঝেই স্থানীয় সাঁওতালদের হামলার মুখে পড়তে হয় 'থ্রি মাস্কেটিয়ার্স'কে!
'একেনবাবু: পুরুলিয়ায় পাকড়াও'সিরিজের দৃশ্য
প্লট যত এগোয় পুরুলিয়ার রুক্ষ্ম মাটিতে রহস্য ততই বাঁক নেয়। রাতবিরেতে আশ্রমে ছায়ামূর্তির হানা। মহারাজের উপর হামলা। তার সঙ্গে মানভূমের অধিবাসীদের নিজস্ব মানরক্ষার লড়াই। গল্পে চোরাস্রোতের মতো ধরা দেয় প্রেমও। এরমাঝেই স্থানীয় সাঁওতালদের হামলার মুখে পড়তে হয় 'থ্রি মাস্কেটিয়ার্স'কে! এযাবৎকাল সংশ্লিষ্ট মামলা নিয়ে গড়িমসি করলেও এবার মাটনের মায়া সরিয়ে নড়েচড়ে বসে একেন্দ্র সেন। শিক্ষক সুবিমল, অমিয়নাথের চিকিৎসক শুভঙ্কর কুণ্ডু, আশ্রমিক অনুকূল থেকে লাইব্রেরিয়ান মনিকা- একেনবাবুর সন্দেহের তালিকায় বাদ পড়েন না কেউই। আমুদে গোয়েন্দাকে রহস্য সমাধানের প্রথম ধাঁধা দেয় আশ্রমের খুদে মেধাবী পড়ুয়া সম্বুদ্ধ। সেই সূত্র ধরেই একের পর এক রহস্যের জট উন্মোচনে 'কেচো খুঁড়তে কেউটে' পান একেনবাবু। তারপর কীভাবে রাতের আঁধারে লুকনো রহস্যের জাল দিনের আলোর মতো স্পষ্ট করে তুলে ধরলেন একেন্দ্র সেন? বাকিটা জানতে হলে চোখ রাখতে হবে হইচইয়ের পর্দায়। তবে ভোটবঙ্গে বাঙালি অস্মিতায় শান দেওয়ার আবহে পুরুলিয়া অভিযানে স্থানীয় সাঁওতাল থেকে সাধুভাষার প্রবচন উপহার দিয়ে যেহেন ভাষা অস্মিতা দেখালেন একেনবাবু, তা শুনে পেটে খিল ধরার জোগাড় হবে!
'একেনবাবু: পুরুলিয়ায় পাকড়াও'সিরিজের দৃশ্য
এবার আসা যাক সিরিজের ট্রিটমেন্টের বিষয়ে। চেনা প্লট, তবে চিত্রনাট্যের গাঁথুনি পোক্ত নয় তেমন। নয় পর্বের সিরিজ দেখতে বসে বেশ কিছু দৃশ্য অতিরিক্ত বলেও মনে হয়। উপরন্তু মানভূমের আদিবাসিদের বেশভূষা এবং বাচনভঙ্গীর দিকে নজর দিলে আরও ভালো হত। অনির্বাণ চক্রবর্তী, সুহোত্র মুখোপাধ্যায়, সোমক ঘোষ, সুমন্ত মুখোপাধ্যায়, সার্থক মল্লিক, শঙ্কর চক্রবর্তী, শাঁওলি চট্টোপাধ্যায়রা যে যাঁর চরিত্রে যথাযথ। 'একেন' হিসেবে অনির্বাণ বরাবরের মতোই আমুদে গোয়েন্দা বিষয়টা বজায় রেখেছেন। তবে শেষপাতে যেটা না বললেই নয়, সেটা হল মারাংবুরু, স্থানীয় আদিবাসীদের আবেগে জোর দিতে প্যান ইন্ডিয়ায় বহুল প্রশংসিত সিনেমার আদলে ওটুকু প্লট না ভাবলেও চলত।
