গত শতকের নয়ের দশক। সেসময়ে ভারতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এক তীব্র সংকট এসেছিল। একানব্বইয়ের নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে বিরানব্বইয়ের মাঝামাঝিতে যে সংকট তীব্রতম হয়ে ওঠে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে গচ্ছিত সোনার প্রায় ৪৭ টন সোনা সুইজারল্যান্ড এবং লন্ডনের দু'টি ব্যাঙ্কে সরিয়ে দিতে হয় ভারতকে আইএমএফ থেকে আন্তর্জাতিক ঋণ নেওয়ার গ্যারান্টি হিসেবে। দেশের সোনা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগে তখন উত্তাল হয়েছিল দেশ। দেশের সম্পদ বিক্রির অভিযোগও উঠেছিল। উত্তরে ব্যাঙ্কের গর্ভনর বলেছিলেন 'আমি দেশকে বেচছি না, বাঁচাচ্ছি।' বেচা ও বাঁচানোর পার্থক্যটা বুঝবেন 'গভর্নর' সিরিজে। সেই বিক্ষোভ হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও ও অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহের বিরুদ্ধে। আদতে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তৎকালীন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গর্ভনর মিস্টার ভেঙ্কিটারমাননের। তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত স্লোগান ছিল দেশকে 'ক্ষুধা ও দারিদ্র' থেকে মুক্ত করতে আমেরিকার অধীনে থাকা আইএমএফ ঋণ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। দেশের অর্থনীতির 'বিশ্বায়ন' তখন থেকেই শুরু। প্রযোজক বিপুল শাহ এবং পরিচালক চিন্ময় মণ্ডলেকর সেই তুলকালাম ঘটনা নিয়েই 'গভর্নর' ছবির চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন।
ক্যামেরার কাজেরও প্রশংসা করতে হয়। দর্শকের মনে প্রায় নখ কামড়ে থাকার উত্তেজনা তৈরি হয়। চিন্ময়ের পরিচালনার সাবলীল ভঙ্গির সঙ্গে ঘটনার নাটকীয়তার মিশ্রণটি ভালো লাগে।
রাজনীতির শহর দিল্লি এবং অর্থনীতির কেন্দ্র মুম্বই শহরজুড়ে ছবির ঘটনা। গতিময় এই ছবি প্রথমার্ধে একটু স্লো। রামাননের সাংসারিক জীবন, অফিসে উচ্চপদের অফিসার ব্যাঙ্কের (রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া : আরবিআই) ডেপুটি গভর্নর সি আর থেকে সাধারণ পিওন এবং এক ডেটা কর্মীর সঙ্গেও আন্তরিকভাবে মেশার কাহিনি একটু বেশি জায়গাই নিয়েছে। ছবি গতি পায় দ্বিতীয় পর্বে। শুধু দিল্লি-মুম্বই ঘুরে উচ্চ পর্যায়ের মিটিংয়ের সঙ্গে দেশ দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কিনারা থেকে উদ্ধার করার মানসিক চাপ নিয়ে রামানন (মনোজ বাজপেয়ী) নিজের সঙ্গে যে লড়াইটা চালান, চিত্রনাট্যে সেই জায়গাটি বিশ্বস্ত করেই তুলেছেন পরিচালক চিন্ময়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভল্ট থেকে লুকিয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সোনা বোঝাই তিনটি ট্রাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছনোর ব্যাপারটাও থ্রিলার মেজাজে উপস্থিত। এই পর্বে ক্যামেরার কাজেরও প্রশংসা করতে হয়। দর্শকের মনে প্রায় নখ কামড়ে থাকার উত্তেজনা তৈরি হয়। চিন্ময়ের পরিচালনার সাবলীল ভঙ্গির সঙ্গে ঘটনার নাটকীয়তার মিশ্রণটি ভালো লাগে।
পড়ুন মনোজ বাজপেয়ীর 'গভর্নর'-এর রিভিউ।
সম্প্রতি দেখা 'কেরালা স্টোরি' বা 'বেঙ্গল ফাইলস'-এর চেয়ে বিষয় সচেতনতায় এবং পরিবেশনার সরল স্বাভাবিক পরিপাট্যে 'গভর্নর'কে এগিয়ে রাখতেই হচ্ছে। আবার এটাও বলতে হচ্ছে সিনেমাটিক লাইসেন্সের নামে একই সঙ্গে আরবিআই-এর গভর্নরের মেয়ে এবং তার পিওনের মেয়ে দুজনেরই আইএএস পাস করে ফেলার ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি মনে হয়। যেমন হাস্যকর লাগে সোনাভর্তি একটি ট্রাক বৃষ্টিভেজা রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার কারণে আটকে পড়লে ব্যাঙ্কের গভর্নর নিজে এসে সবটাই সামলান। আবার নির্ভীক তরুণী সাংবাদিক অদিতি সোনা পাচারের খবরটি জেনেও সম্পাদকের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে সেটি প্রকাশ করল না– এটাও কিন্তু সাংবাদিকতার এথিকসে পড়ে না। তবে গভর্নর নিজে তাঁকে সতর্ক ও সাবধান করেছিলেন– এগুলো কি সত্যি? না সাজানো! সাজানোর কৌশলটি অবশ্যই তারিফযোগ্য।
দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংকটকালের এমন ছবি তুলে আনা, সীমান্ত সংঘর্ষ বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে গোলা-কামান-বন্দুক-মর্টার-সাঁজোয়া-যুদ্ধ গাড়ি আর পেশী আস্ফালনের চাইতে অনেক বেশি কৃতিত্বের এবং ইতিহাসে ধরে রাখার মতো। এই ছবির প্রাণভোমরা তামিলভাষী রামাননের চরিত্রে মনোজ বাজপেয়ীর অনন্য সাধারণ অভিনয়। চরিত্রটির অন্তর্দ্বন্দ্ব, যন্ত্রণার পাশাপাশি একজন সাধারণ মানুষের মতো ভাঙা হিন্দিতে কথা বলার ব্যাপারটাও চোখে পড়ে। তাঁর সঙ্গে সমান তালে সহযোগিতা করে গিয়েছেন নৌশাদ মুহাম্মদ কুঞ্জু (পি. আর), আধা শর্মা (অদিতি), মধু (বন্দিতা), জয়ন্ত (পিওন), জয়া স্বামীনাথন, দেবাং বামা, পরিতোষ– বলাই। 'গভর্নর' নিশ্চিতভাবে অন্তত একবার দেখাই যায়।
