'মুঝে উসপার জানা হ্যায়। এক কাম অধুরা রহে গয়া হ্যায়, উসে পুরা করনা হ্যায়'– বয়স্ক মানুষটার সর্বক্ষণের চাওয়া একটাই। ৯৫ বছর বয়সি ইশার সিং গ্রেওয়ালের (নাসিরুদ্দিন শাহ) শরীর চলে না, মন স্মৃতিভ্রান্তির ভারে ক্লান্ত। সারাদিন বিড়বিড় করতে থাকে, যা দুই ছেলে ইকবাল (রজত কাপুর), অঙ্গদ (জয়প্রীত সিং) ও বউমা মেহেরের (অঞ্জনা সুখানি) কাছে প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়। অ্যালঝাইমার আক্রান্ত মস্তিষ্কে দেশভাগের ক্ষত তেমন দাগ কাটে না আর। এত কিছুর পরেও জীবন আঁকড়ে বেঁচে আছে সে, একবার তার জন্মের মাটি সারগোদায় ফিরে যাবে বলে। যেখানে এমন কিছু রেখে এসেছে যা শেষ না করলে, এই জীবন থেকে তার মুক্তি নেই।
'ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা'য় নাসিরুদ্দিন শাহ, ইমতিয়াজ আলি
ইমতিয়াজ আলির ছবি 'ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা'র আগেও এই বছর দর্শক আরও একবার সারগোদা ঘুরে এসেছে, শ্রীরাম রাঘবনের ছবি 'ইক্কিস'-এ। দেশভাগের পর যেসব মানুষকে রাতারাতি নিজের জন্মের, বড় হয়ে ওঠার ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, তাদের অনেকেই সারাজীবনের মতো থেকে গিয়েছে উদ্বাস্তু হয়ে। বাকি জীবনটা অন্য ভিটেতে স্বচ্ছন্দে কাটাতে পারলেও আপনবোধ তৈরি হয়নি কোনওদিন। ইশার নিজেও সারাজীবন কাটিয়েছে একইভাবে। পরিবারের কাছে বদমেজাজি, অথচ দেশভাগের মানসিক আঘাত দাঁতে-দাঁত চেপে সহ্য করেছে একাই। ছেলে-বউমা ইশারের অসংলগ্ন কথাকে মূল্য না দিলেও নাতি নির্বৈর (দিলজিৎ দোসাঞ্জ) কিন্তু ঠাকুরদার কথা ফেলে দিতে পারে না। প্রতিটা কথার সূত্র ধরে সে ফিরে যেতে থাকে তার ঠাকুরদার দেশভাগের আগের জীবনে। যেখানে ১৭ বছরের কিনু/ইশার (বেদাং রায়না) প্রেমে পড়েছিল জিয়া/আফসানার (শর্বরী)। উর্দুতে আনাড়ি শের লেখা কিনু দেশভাগের ভয়কে অত পাত্তা দেয়নি। এমন কোনও শহর আছে নাকি, যেখানে হিন্দু, মুসলমান, শিখ আবার আলাদা থাকে!– এই বিশ্বাসে কিনু ভেবেছিল তাকে কোনওদিন সারগোদা ছেড়ে যেতে বাধ্য করবে না কেউ। সেটাই হল, অথচ জিয়াকে কথা দিয়েছিল সে, ফিরবেই। 'ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা' সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষার গল্প বলে। তবে কেবল প্রেম কাহিনি হিসাবে নয়, হাজার হাজার মানুষের মুহূর্তের মধ্যে স্থানচ্যুতি আর কোনও একসময় নিজের ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার হাহাকার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কিনু আত্মস্থ করতে থাকে ফয়েজ-এর লেখা লাইন, 'অউর ভি দুখ হ্যায় জমানে মে মহব্বত কে সিওয়া'– তবু ফেলে আসা প্রেম ভুলে যেতে পারে কি?
'ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা'য় শর্বরী ওয়াঘ, বেদাঙ্গ রায়না
নয়নিকা মাহতানির সঙ্গে ইমতিয়াজ আলি এমন এক হৃদয়বিদারক গল্প বুনেছেন, যা পাঞ্জাব ও বাংলার পূর্বপুরুষেরা বুকে বয়ে বেড়িয়েছে আজীবন। দেশভাগের ক্ষত পরিণতি পেয়েছে প্রজন্মগত মানসিক আঘাতে। নির্বৈর অবশ্য চেয়েছে ইশারকে মুক্তি দিতে। মানসিকভাবে মান্টোর ‘টোবা টেক সিং’-এর ধাঁচে গড়া ইশারের চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহের অভিনয় দেখলে বোঝা যাবে, কেন তিনি ভারতের অন্যতম সেরা অভিনেতা। চরিত্র অনুযায়ী যার সারা শরীরে পঙ্গু দশা, সেখানে কেবল চোখ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর আকাঙ্ক্ষা, বেদনা, ফেলে আসা দিনের কথা। সেই একই আবেগী চাউনি কিশোর কিনু বেদাং রায়নার চোখে। নাসিরুদ্দিনের মতো অভিনেতার ছোটবেলার চরিত্রে বেদাং এভাবে নিজেকে মিলিয়ে নেবেন, ভাবা যায়নি। শর্বরীর রংচঙে, ছটফটে আফসানা এই ছবির নায়কের প্রাণভোমরা। দিলজিতের অভিনয় এতটাই নিখাদ যে সহজে বিশ্বাসযোগ্য। এ আর রহমানের সুর হৃদয়ে গেঁথে থাকার মতো। চিত্রনাট্যে সামান্য ফাঁকফোকর থাকলেও ইমতিয়াজের এই ছবির উদ্দেশ্য এতটাই গভীর যে খামতিগুলো অনায়াসে উপেক্ষা করা যায়। ‘অ্যানিম্যাল’, ‘ধুরন্ধর’-এর মতো নৃশংসতা নির্ভর ছবির সাফল্যের যুগে নিঃসন্দেহে ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ ব্যতিক্রমী। যে মানুষটা ‘যব ইউ মেট’, ‘তামাশা’ কিংবা ‘হাইওয়ে’ দর্শকদের উপহার দিয়েছেন তিনি বক্স অফিসের কথা ভাববেন না, সেটাই স্বাভাবিক। কাজেই বাণিজ্যিক সাফল্য আসুক না আসুক, এই ‘লাভ ব্যালাড’ মনে থেকে যাবে অনেকদিন। আর হ্যাঁ, এন্ডক্রেডিট মিস করা যাবে না। এই যুদ্ধ-অশান্তি-ক্লিষ্ট পৃথিবীতে এখনও এমনভাবে প্রেমের গল্প বলা যায়, ইমতিয়াজ আলি আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন।
