জয়দীপ আহলাওয়াটকে অনন্ত সিংহের চরিত্রে দেখা গিয়েছে 'চিটাগং' ছবিতে। তাঁর বায়োপিক হলে অভিনয় করার কথা ছিল ইরফান খানের, কিন্তু হয়নি। বিপ্লবী অনন্ত সিংহকে নিয়ে হিন্দি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ হয়েছে বা পরিকল্পনা হয়েছে অনেক আগেই। শুধু বাংলায় হয়নি এতদিন। অবশেষে সেই অভাব পূরণ করলেন পথিকৃৎ বসু। অনন্ত সিংহকে নিয়ে প্রথম বাংলা ছবি তৈরি হতে লেগে গেল অনেকটা সময়। 'কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত', অনন্ত সিংহের নিজের লেখা বইয়ের নামেই ছবি, নামভূমিকায় জিৎ। প্রায় দু'বছর পর বড়পর্দায় ফিরলেন জিৎ। কেমন হল সেই প্রত্যাবর্তন?
'কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত' ছবিতে জিৎ, ছবি- ইনস্টাগ্রাম
স্বাধীনতার আগে মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম শক্তিশালী সঙ্গী এবং স্বাধীন ভারতে বাংলার পুলিশের ত্রাস, দুই ভূমিকাতেই অনন্ত ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। অগ্নিযুগে জন্ম নিয়ে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে সময় লাগেনি পাঞ্জাবি পরিবারে জন্ম নেওয়া মনেপ্রাণে বাঙালি এই বিপ্লবীর। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন ও ডিনামাইট মামলার জেরে জেল ও পরবর্তীতে দ্বীপান্তরে গিয়ে এক দীর্ঘ যন্ত্রণার জীবন কাটান অনন্ত সিংহ। ১৯৩৮ সালে অনশনের সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আলিপুর জেলে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। আন্দাজ করা যায় বিপ্লবী হিসেবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তিনি। স্বাধীনোত্তর বাংলায় ব্যবসা ও ছায়াছবি প্রযোজনা শুরু করলেও একসময় প্রশাসন বিরোধী কাজকর্মের জন্য সরকারের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন অনন্ত। হুবহু তাঁর জীবনী না হলেও ছবিতে তাঁর জীবনের বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনা উঠে এসেছে।
বিভিন্ন মেকআপে, নানান বয়সের চরিত্রে, ভিন্ন রূপে জিৎ এই ছবিতে ধরা দিয়েছেন আর প্রত্যেকটিতেই তিনি মানিয়ে গিয়েছেন দারুণভাবে। যেভাবে তিনি নানা রূপে পর্দায় এসেছেন, রক্ত গরম করা সংলাপ দিয়ে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলেছেন, দক্ষিণী ছবির ধাঁচে অ্যাকশন করেছেন, তা নতুন প্রজন্মের দর্শকের মন জয় করবে।
বিভিন্ন ভূমিকায় ছবিতে রয়েছেন টোটা রায়চৌধুরী, চন্দন সেন, কৌশিক সেন, লোকনাথ দে, সুপ্রভাত দাস, দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, দুর্বার শর্মা। তবে এই ছবিকে একান্তই জিতের ছবি বলা চলে। যারা জিৎকে দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যাবেন, তাদের জন্য পয়সা উসুল করার মতোই ছবি বানিয়েছেন পথিকৃৎ। বিভিন্ন মেকআপে, নানান বয়সের চরিত্রে, ভিন্ন রূপে জিৎ এই ছবিতে ধরা দিয়েছেন আর প্রত্যেকটিতেই তিনি মানিয়ে গিয়েছেন দারুণভাবে। যেভাবে তিনি নানা রূপে পর্দায় এসেছেন, রক্ত গরম করা সংলাপ দিয়ে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলেছেন, দক্ষিণী ছবির ধাঁচে অ্যাকশন করেছেন, তা নতুন প্রজন্মের দর্শকের মন জয় করবে। এ ছবির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কাহিনীর প্রাসঙ্গিকতা। স্বাধীন ভারতে প্রশাসন ও সরকারি দুর্নীতি ক্রমশ যেভাবে সমাজের ভেতরে ঢুকে দেশকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা রয়েছে ছবি জুড়ে।
বিপ্লবী অনন্ত সিংয়ের বেশে কেমন চমক দিলেন জিৎ?
ছবির শেষভাগে আদালতের দৃশ্য আরও সুপরিকল্পিত হতে পারত। কাহিনির সময়কালকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে বেশ কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে শুরু থেকেই।
অভিনয়ে সকলেই যথাযথ। আলাদাভাবে উল্লেখ্য টোটা, দুর্বার, চন্দনের নাম। কখনোই হতাশ করেন না কৌশিক, লোকনাথ, সুপ্রভাত, দেবপ্রিয়র মতো অভিনেতারা। কিন্তু রুনু গুহ নিয়োগীর আদলে তৈরি সুপ্রভাত অভিনীত রথিজিৎ নিয়োগীর অমন তুখোড় চরিত্রের ক্ষেত্রে কেন বাস্তবের সঙ্গে মিল রাখা গেল না? তা স্পষ্ট নয়। ভালো অভিনেতা দাপুটে চরিত্রে পেয়েও যদি অভিনয়ের সুযোগ না পান, ক্ষতি সেখানে ছবিরই। এছাড়াও মাস্টারদার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য এতটা বিসদৃশ মেকআপ না হলেও চলত। চরিত্রাভিনেতা নিজ অভিনয় গুণেই মাস্টারদা হয়ে উঠেছেন, মেকআপই বরং চোখে লেগেছে বেশি। ছবির শেষভাগে আদালতের দৃশ্য আরও সুপরিকল্পিত হতে পারত। কাহিনির সময়কালকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে বেশ কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে শুরু থেকেই। তবে পরবর্তীতে জিতের উপস্থিতি সেসবকে ঢেকে দিয়েছে অনায়াসে।
আবহ সঙ্গীত ছবির মেজাজকে আগাগোড়া ধরে রেখেছে। শান্তনু মৈত্রের সুরে গানগুলি শ্রুতিমধুর। বারিশের কথায় অদৃজ ঘোষের কণ্ঠে 'ভোর' গানটি মনে রাখার মতো। সৌমিক হালদারের চিত্রগ্রহণ প্রশংসনীয়। চেষ্টা করলে ছবির দৈর্ঘ্য কিছুটা কমতে পারত। তবে সব মিলিয়ে স্বাধীনতা দিবসের আবহে জিতের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দর্শকের ভালোবাসা জিতে নেবে বলে আন্দাজ করা যায়।
