ফ্যান্টাসি আর বাস্তবের দেওয়াল ভাঙছে। একটা ছেলে সুপারম্যানের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাচ্ছে। ‘জেন জি’ প্রজন্মের সিনেমার ভাষা তো এমনই হবে। অদ্ভুত, তারুণ্যে ভরপুর এবং শহুরে প্রেমের গল্পের আঁকেবাঁকে ছাপ ফেলেছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক সুপারহিরো-থ্রিলারের এলিমেন্ট। নাটক, উত্তেজনা, আবেগ, হিউমার– সবটা মিলেমিশে উজান গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত প্রথম ছবি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চেয়ার আঁকড়ে দেখতে হয়। না, কৌশিক বা চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘরানার সঙ্গে তার মিল নেই। তবে নিশ্চিতভাবেই সিনেমার অন্তরাত্মার সংবেদনশীলতা আর প্রথাভাঙার প্রয়াসে সেই সিনেমার লেগাসির স্রোত। পরম্পরা এগিয়ে নিয়ে যেতে উজান প্রস্তুত।
এই ছবি বলে গুড টাচ-ব্যাড টাচ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। তবে প্রতিশোধ আর হিংসা কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারে না। প্রশ্ন ওঠে, শাস্তি না চিকিৎসা কোনটা বেশি জরুরি। সুকুমার রায়ের কবিতার আধারে এরপর দেখার যুদ্ধে কেদার, নাকি সুপারম্যান ‘কেবি’ কে জেতে?
অভিনেতা উজান ছবির নিউক্লিয়াস। সেই নিউক্লিয়াসে রক্তসঞ্চালন জারি রেখেছে নবাগতা রাপূর্ণার আবেদনমুখর উপস্থিতি।
ছবির কেন্দ্রে কেদার (উজান)। শৈশবের ট্রমা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় সর্বক্ষণ। যে কথা বলতে পারেনি স্পষ্ট করে। সেই ছ-সাত বছর বয়স থেকে ছেলেটার সঙ্গী বাবার দেওয়া ছোট্ট পুতুল ‘কেবি’ অর্থাৎ ‘কাতুকুতু বুড়ো’। অন্তর্মুখী কেদারের কথা বলার সঙ্গী ওই সুপার-পুতুল। অতীতের অবাঞ্ছিত ছোঁয়ার স্মৃতি তার মনে জন্ম দিয়েছে অবদমিত রাগ আর তীব্র ঘৃণা। সেই সঙ্গে স্পর্শের প্রতি গভীর অনীহা। ফলে যখন অফিসের সহকর্মী পারমিতার (রাপূর্ণা) সঙ্গে তার ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, কেদার সামান্য স্পর্শে গুটিয়ে যায়। কারণ, নিজের চারপাশে সে দেওয়াল তুলে ফেলেছে। মেয়েটা বুঝতে পারে, ছেলেটার মনে জমে থাকা যন্ত্রণার অভিঘাত। ততদিনে ছেলেটা সমাজের ময়লা সাফ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সেই পথে তার সঙ্গী ‘কেবি’। সুপার-পুতুল হয়ে উঠেছে তারই অল্টার ইগো ‘কে-টু’। একটা নরম ভালোমানুষ কেদার, আর অন্যটা বেগুনি সুপারম্যান! দুই সত্তা চলে হাত ধরাধরি করে। এখন প্রশ্ন, প্রতিশোধের নেশা চাপলে কি থামানো যায়? ভালোবাসা কেদারের ভিতরের দৈত্যকে শান্ত করতে পারে আপাতভাবে, কিন্তু যে পৃথিবীর জঞ্জালমুক্ত করতে চায়, তাকে ঠেকাবে কে? এই প্রজন্মের একাকীত্ব, মানসিক অস্থিরতা, শারীরিক হেনস্তা, অস্বস্তিকর অতীত যেমন ধরেছেন পরিচালক, একই সঙ্গে সামাজিক অবক্ষয়, নীতিহীনতা, ভুল-ঠিক গুলিয়ে ফেলাও ছবিতে ধরা পড়ে চমৎকার। আর মধ্যবিত্ত বাঙালির ভদ্রতা রক্ষা, সাপ্রেশনের ছবিটাও সাংঘাতিক। এই ছবি বলে গুড টাচ-ব্যাড টাচ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। তবে প্রতিশোধ আর হিংসা কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারে না। প্রশ্ন ওঠে, শাস্তি না চিকিৎসা কোনটা বেশি জরুরি। সুকুমার রায়ের কবিতার আধারে এরপর দেখার যুদ্ধে কেদার, নাকি সুপারম্যান ‘কেবি’ কে জেতে? থ্রিলার ছবি জুড়ে একটা নরম প্রেমের গল্প শুশ্রূষার বাতাসের মতো। উজান-রাপূর্ণার চুম্বনের আশ্লেষ বৃষ্টির জুলাই ভাসিয়ে দেবে। অ্যাকশন, গান ছবির সিরিয়াস মেজাজে রিলিফ আনে।
অভিনেতা উজান ছবির নিউক্লিয়াস। সেই নিউক্লিয়াসে রক্তসঞ্চালন জারি রেখেছে নবাগতা রাপূর্ণার আবেদনমুখর উপস্থিতি। দু’জনের কেমিস্ট্রি সিম্পলি এফর্টলেস!
কেমন হল 'কাতুকুতু বুড়ো'?
লিড জুটি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অনুজয় চট্টোপাধ্যায় (পুলিশ) দুর্দান্ত। অফিসের কেয়ারটেকারের ভূমিকায় লামা হালদার অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য। বদ বসের চরিত্রে বিশ্বনাথ বসু বেশ মানানসই। বিশেষ চরিত্রে ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় চমৎকার। ক্যামিও চরিত্রে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় মনে থেকে যাবেন। মনোবিদের ভূমিকায় চূর্ণী একদম অন্যরকম। স্বল্প পরিসরে ভালো লাগে জয়তী চক্রবর্তী ও শঙ্কর চক্রবর্তীকে। বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী রয়েছেন ইন্টারেস্টিং একটি ভূমিকায়। অভিনেতা উজান ছবির নিউক্লিয়াস। সেই নিউক্লিয়াসে রক্তসঞ্চালন জারি রেখেছে নবাগতা রাপূর্ণার আবেদনমুখর উপস্থিতি। দু’জনের কেমিস্ট্রি সিম্পলি এফর্টলেস! দেবায়ন-উজান-সিজি-র মিউজিক রিফ্রেশিং। ‘ফালতু ভিজছে বুড়ো-বুড়ি’, ‘প্রেমে হাবুডুবু’ দুটো গানই দারুণ। তবে র্যাপের ব্যবহার কম হলে ভালো হত। শুভঙ্কর ভড় আর তুর্যার ক্যামেরা ছবির মেজাজ তুলে ধরেছে। দ্বিতীয়ার্ধে ভায়োলেন্সের মাত্রা কমানো যেত। তবে একদম টানটান চিত্রনাট্য। সব মিলিয়ে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি একজন নতুন পরিচালক আর নতুন জুটি পেল। টলিউড পেল জেন জি প্রজন্মের কমপ্লিট অভিনেতা, উজান সেই নাম। একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় এই সপ্তাহে বাবা-ছেলের দুটি ছবি চলবে শহরের প্রেক্ষাগৃহে। সামনের সপ্তাহে মায়ের ছবিও যোগ দেবে! এরকম নজির বোধহয় সারা দেশে নেই।
