সুমিত বিশ্বাস, আড়শা (পুরুলিয়া): কোনটা ছেড়ে কোনটায় হাত দেবেন? ফুচকা, আলুকাটা, আলু কাবলি, ঘুগনি, লোভনীয় পেয়ারামাখা, ঝালমুড়ি, পাপড়ি চাট... সেইসঙ্গে জিভে জল আনা ভেজ পকোড়া, ভেজ মোমো, ভেজ পাস্তা, ব্রেড চপ, পালং শাকের কচুরি-আলুর দম। এছাড়া আলু পরোটা, গাজরের হালুয়া, গুলাব জামুন-সহ আরও কত কী! আসলে টিফিনের সময়ে রসনাতৃপ্তিতে এগুলোই তো অমৃত। তবে সেসব বাড়ির কারও হাতে রান্না করা অথবা দোকান থেকে কিনে আনা, কিংবা টিফিন আওয়ারে স্কুল থেকে বাইরে বেরিয়ে ঠেলাগাড়িতে ঢুঁ মারা। কিন্তু যখন স্কুলেই ফুড ফেস্টিভ্যাল হয়, পড়ুয়াদের হাতে বানানো খাবার চেখে দেখেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা, তখন তার আনন্দই দ্বিগুণ!
মঙ্গলবার পুরুলিয়ার আড়শার নিউ ইন্টিগ্রেটেড গভর্নমেন্ট স্কুলের এই ফুড ফেস্টিভ্যাল। নিজস্ব ছবি।
খাদ্য উৎসবে রান্নার স্বাদ থেকে পরিবেশন - সেইসঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মত বিষয়টাতে গুরুত্ব দিয়ে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা হয়ে যায় কুক। আর তারাই হয় সেলার থেকে বায়ার। থুড়ি, শুধু শিক্ষক-শিক্ষিকারা চেখে দেখেন না তারাও কিন্তু ক্রেতা হন। এই বিপুল সংখ্যক ক্রেতার ভিড়ে প্রায় ৫৫ মিনিট অর্থাৎ পাপড়িচাটের স্টলে ১ ঘন্টা না হতেই বিক্রি হয়ে যায় ৭৮০ টাকা! আর এই টাকা নিয়ে খুশিতে একেবারে উপচে পড়লো ওই স্টল দেওয়া দশম শ্রেণির তিন ছাত্রী। মঙ্গলবার পুরুলিয়ার আড়শার নিউ ইন্টিগ্রেটেড গভর্নমেন্ট স্কুলের এই ফুড ফেস্টিভ্যালের প্রথম শিরোপা জয় করে নেয় তারা। এই খাদ্য উৎসবে দ্বিতীয় হয় পেয়ারামাখা। আর তৃতীয় ইডলি।
রাজ্যের স্কুল শিক্ষা বিভাগের নির্দেশে শিক্ষা বছরের একেবারে গোড়াতেই 'স্টুডেন্ট উইক' চলে। সেই উইকে পালিত হচ্ছে ফুড ফেস্টিভ্যাল। স্কুল শিক্ষা দপ্তরের এই নির্দেশ থাকলেও সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফুড ফেস্টিভ্যালের মতো এই বৃহৎ আয়োজন বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ সেভাবে করতে পারে না। কিন্তু গত বছর থেকে জঙ্গলমহলের এই সরকারি স্কুল খাদ্য উৎসবের আয়োজন করে রীতিমতো নজর কেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো পড়ুয়াদের উৎসাহ। এই খাদ্য উৎসবকে সফল করতে ওই স্কুলের পড়ুয়ারা কয়েক দিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এদিন ওই স্কুলের ক্যাম্পাসে ২২ টি স্টল বসে। পাপড়ি চাট বানিয়ে তাক লাগিয়ে দেয় দশম শ্রেণির তিন ছাত্রী - অন্বেষা মণ্ডল, দিশা মাহাতো, নেহা খাতুন। ২০ টাকায় ৪ টে, আর ১০ টাকায় ২ টো পাপড়ি দিয়ে বাজিমাত করে তারা। প্রথম থেকেই ভিড় উপচে পড়ে। এমনকী শিক্ষকরাও সেখানে ভিড় জমান। স্কুলের সহশিক্ষক কৌশিক বেরা, সুকান্ত সিং সর্দাররা বলেন, "আমাদের ফুড ফেস্টিভ্যালটা বরাবরই খুব ভালো হয়। পড়ুয়ারা ভীষণ উৎসাহের সঙ্গে খাদ্য উৎসবের আয়োজন করে। এবারের এই উৎসবে পাপড়ি চাট সত্যিই জিভে জল এনে দিয়েছে সকলের।"
নিজেদের হাতে খাবার বানিয়ে টেবিল সাজাতে ব্যস্ত ছাত্রছাত্রীরা। নিজস্ব ছবি।
রসনাতৃপ্তিতে পিছিয়ে ছিল না পেয়ারামাখা। তারা ২৯০ টাকার বিক্রিবাটা করে দ্বিতীয় হলেও ওই স্কুলের শিক্ষক সুদীপ দাস বলেন, "পেয়ারা মাখার স্টলে কাসুন্দি ছিল। সঙ্গে ছিল চিলি সস। যে যেটা সঙ্গে নিয়ে খেতে পারে আর কী!" ওই স্টল দেওয়া অষ্টম শ্রেণির দুই ছাত্রী রাখি রজক, মৌমিতা মুর্মু বলে, "আমাদের এক প্লেটের দাম ছিল মাত্র ৫ টাকা। তবে ১০ টাকার পেয়ারা যদি কেউ নিতে চায় তবু আমরা দিয়েছি।" কিন্তু পাপড়িচাটই যে মন কেড়ে নিয়েছে এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র উপেন মান্ডি ও সুফিয়ান আনসারি বলে, "আমরা অনেক কটা স্টলের খাবার খেয়েছি। কিন্তু পাপড়িচাট সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।"
ইডলি বেচে তৃতীয় স্থান অধিকার করা ষষ্ঠ শ্রেণির দুই ছাত্রী দীপিকা সিং সর্দার ও ভূমিকা মোদকের হাতে ইডলিও খারাপ লাগেনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রের বিশ্বজিৎ মোদকের। তার কথায়, "একেবারে দোকানের মত করেই দিদিরা ইডলি কেটে কেটে সম্বর দিয়ে দিয়েছে। ভীষণ ভালো খেয়েছি।" ইডলি বিক্রি করে তাদের হাতে আসে ১৫০ টাকা। তবে এই ঠান্ডাতে চা, কফি ছাড়া হয়? তাই ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র জগদীশ মণ্ডল ও পারভেজ খান দু'জনে মিলে চায়ের স্টল দেয়। শুধু দুধ চা নয় একেবারে মশলা চা। ফলে বিক্রিবাটা মন্দ হয়নি। একইভাবে কফির স্টল দেয় নবম শ্রেণির দুই ছাত্র সরিফ আনসারি, প্রীতম মণ্ডল। তাদেরও প্রায় ৫০ কাপের কাছাকাছি কফি বিক্রি হয়েছে।
পাপড়িচাট নিজেদের হাতে পরিবেশন করল নবম শ্রেণির ছাত্রীরা। নিজস্ব ছবি।
বিক্রেতাদের মাথায় ছিল ক্যাপ, হাতে গ্লাভস।দেখে মনে হচ্ছিল বাণিজ্যিক ফুড স্টল। আসলে শুধু খাদ্য উৎসব নয়। এই ফেস্টিভ্যালকে ঘিরে রীতিমতো চলেছে প্রতিযোগিতা। স্টল সাজানো, পরিবেশন করা, স্বাস্থ্য সম্মত বিষয় সেই সঙ্গে খাবারের মান। এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখেই যে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বেছে নেওয়া হয়।
