shono
Advertisement
FIFA World Cup

হিরের ব্রেসলেট চুরি! বিশ্বকাপ শুরুর আগে গ্রেপ্তার ববি মুর, তারপর...

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে গ্রেপ্তার হন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। এই ঘটনায় গোটা দলের প্রস্তুতিতে ধাক্কা লাগে। এমনকী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকারকেও কূটনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
Published By: Prasenjit DuttaPosted: 06:56 PM Jul 01, 2026Updated: 09:41 PM Jul 01, 2026

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী দল ইংল্যান্ড। ’৭০ বিশ্বকাপেও (FIFA World Cup) তারা অন্যতম হট ফেভারিট। রক্ষণভাগে টেরি কুপারের সংযোজন, মাঝমাঠে অ্যালান মুলারি ও কলিন বেলের উপস্থিতি তাদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল। মেক্সিকোর গরম আবহাওয়া ও উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিশ্বকাপের আগে কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরে দু'টি প্রীতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা করে ইংল্যান্ড। সেই লক্ষ্যেই তারা পৌঁছে যায় কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায়। কিন্তু কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি, ববি মুরকে বিলাসবহুল হোটেল টেকেনদামার গয়নার দোকান থেকে ব্রেসলেট চুরির দায়ে গ্রেপ্তার করা হবে। হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে এমন অভিযোগে গ্রেপ্তার হন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। এই ঘটনায় গোটা দলের প্রস্তুতিতে ধাক্কা লাগে। এমনকী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকারকেও কূটনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

Advertisement

ঠিক কি হয়েছিল? ১৮ মে সতীর্থ ববি চার্লটনের সঙ্গে 'ফুয়েগো ভের্দে' নামের একটি গয়নার দোকানে যান মুর। দোকানের কর্মী ক্লারা পাদিয়া অভিযোগ করেন, তাঁর চোখের সামনেই ৬০০ পাউন্ড দামের ব্রেসলেট চুরি করেছেন মুর। দোকানের মালিক দানিলো রোহাস পুলিশের উপর চাপ সৃষ্টি করেন। এরপর ইংল্যান্ড অধিনায়ককে একাধিকবার জেরা করা হয়। ২৫ মে বোগোটায় নতুন এক বয়ানের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়। যদিও মুরের তল্লাশি চালিয়েও কিছুই উদ্ধার করা যায়নি। সেই সময় পাশে দাঁড়ান ইংল্যান্ড কোচ আলফ র‍্যামসি। তিনি বলেন, "ববি মুরের সততা সম্পর্কে আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই। তাঁর মতো এক মানুষের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এতটাই হাস্যকর যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।”

'দ্য গার্ডিয়ান'-এর ২৭ মে ১৯৭০ সংখ্যার প্রথম পাতা।

মুরকে কুখ্যাত এক কারাগারে পাঠানোর কথাও ভাবা হয়েছিল। কলম্বিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি আলফোনসো সিনিয়রের হস্তক্ষেপে তাঁকে জেলে না পাঠিয়ে গৃহবন্দি রাখা হয়। এদিকে কলম্বিয়ার জনপ্রিয় সংবাদপত্র এল তিয়েম্পোও মুরের পাশে দাঁড়ায়। তারা এক প্রতিবেদনে লেখে, 'যেসব সাক্ষীর বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে মেলে না, তা কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে? তাই সেই সব সাক্ষীর চেয়ে ববি মুরের কথার উপরই আমাদের বেশি ভরসা করা উচিত।" এরপর তদন্ত যত এগোয়, অভিযোগ ততই দুর্বল হতে থাকে। দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না ক্লারা পাদিয়া। তাঁর দাবি, ট্র্যাকস্যুটের পকেটে ব্রেসলেটটি রেখেছিলেন মুর। পরে দেখা যায়, সেই ট্র্যাকস্যুটে কোনও পকেটই ছিল না। এরপর প্রত্যক্ষদর্শী আলভারো সুয়ারেজ স্বীকার করেন, দোকানমালিকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

প্রমাণের অভাবে ২৮ মে ববি মুর মুক্তি পান। এরপর মেক্সিকোয় গিয়ে ইংল্যান্ড দলের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। ১৯৭০ সালের ৩০ মে। বন্ধু মরিস কেস্টন ও তাঁর স্ত্রীকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে ধন্যবাদ জানান মুর। কলম্বিয়ায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ববি মুরের স্ত্রী টিনা ডিন খুবই দুশ্চিন্তায় ছিলেন। সেই কঠিন সময়ে কেস্টন দম্পতি টিনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের এই সাহায্যের জন্যই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন তিনি। মজার বিষয় হল, কেস্টন দম্পতি ছিলেন টটেনহ্যাম হটস্পারের সমর্থক। আর ববি মুর ছিলেন ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের কিংবদন্তি ফুটবলার। সমর্থনের দিক থেকে তাঁরা ভিন্ন মেরুর হলেও তাঁদের বন্ধুত্বে কোনও প্রভাব পড়েনি।

পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মেক্সিকো সিটি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সময় ববি মুর জামিনের নথিপত্রে সই করছেন। ছবি সংগৃহীত।

দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় নীরব থাকার পর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে মুখ খুলেছিলেন ক্লারা পাদিয়া। তিনি বলেন, "আমি সবাইকে জানাতে চেয়েছিলাম, কখনও মিথ্যা বলিনি। ববি মুরের বিরুদ্ধে আমি কোনও মিথ্যা অভিযোগ করিনি। নিজের চোখে যা দেখেছি, সেটাই বলেছি।” এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি নতুন পডকাস্ট 'এল ক্যাপিতান ই এল ব্রাসালেতে দে এসমেরালদাস'-এ প্রকাশিত কূটনৈতিক নথিতে দেখা যায়, ববি মুরকে মুক্ত করতে ব্রিটিশ দূতাবাস ও ফরেন অফিস কলম্বিয়া সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রিচার্ড রজার্স এক টেলিগ্রামে লন্ডনকে লিখেছিলেন, 'আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, দূতাবাসের সঙ্গে আলোচনা না করে কোনও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। পাশাপাশি বিচারককে ব্যক্তিগতভাবে বোঝানো হয়েছে, এই মামলার কারণে কলম্বিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।'

গল্পের এখানেই শেষ নয়। নথিতে আরও বলা হয়েছে, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দৌড়ে থাকায় কলম্বিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টিও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকী গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান জেনারেল লুইস এতিলিও লেইভা বিচারকের সঙ্গে দেখা করে ববি মুরকে জেলে পাঠালে তার রাজনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছিলেন। পডকাস্টটির প্রযোজক কামিলো মাসিয়াসের মন্তব্য, "খুব দ্রুত সবাই ধরে নেন, ববি মুরকে মিথ্যা ফাঁসিয়েছেন ক্লারা। কারণ মুরের পাশে ছিল ব্রিটিশ ও কলম্বিয়ার সরকার, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দুই দেশের সংবাদমাধ্যম। সেই প্রবল চাপের মধ্যে ক্লারার কথা কেউ গুরুত্ব দেননি।" ফলে বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র তিন দিন আগে মুক্তি পান ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

বন্ধু মরিস কেস্টন ও তাঁর স্ত্রীকে পাঠানো মুরের টেলিগ্রাম। ছবি সংগৃহীত।

এই ঘটনা নিয়ে খুবই কম কথা বলতেন মুর। শুরুতে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেছিলেন, "ঠিক বুঝতে পারছি না বিষয়টা কী! এই অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি।" পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী মেক্সিকোয় এসে স্বামীকে ব্রেসলেট উপহার দেন। অনেকেই একে পুরো ঘটনার জবাব হিসাবে দেখেন। বহুবছর পরে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, হোটেলের জুতো পালিশকর্মী হার্নন্দো রোহাস স্মৃতিচারণ করে বলেন, "তিনি ছিলেন এক মহীরুহ। আমার দেখা সবচেয়ে মার্জিত মানুষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ববি মুর।" তবে পরে তাঁর জীবনীকার জেফ পাওয়েল লিখেছিলেন, "হয়তো দলের কোনও তরুণ খেলোয়াড় মজা করতে গিয়ে এমন কিছু করেছিল, যা পরে বড় বিতর্কে রূপ নেয়।"

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement