যে কোনও সময় কুইজে এই প্রশ্ন ভীষণভাবে আসে। মহাকাশ অভিযানে কন্ট্রোল রুমকে কী নামে ডাকা হয়? নিল আমস্ট্রং চাঁদে পা দিয়েই, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগে প্রথম যে শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন, তা হল- ‘হিউস্টন’। তারপর পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের মাহাকাশ অভিযানে, কন্ট্রোল রুমকে অভিহিত করা হয়, ‘হিউস্টন’ বলে।
এখানে ‘হিউস্টন টেক্সাস’ বলে একটি ফুটবল ক্লাব অবশ্যই আছে। এই ক্লাবের স্টেডিয়ামেই গতকাল রোনল্ডোরা ম্যাচ খেললেন কঙ্গোর বিরুদ্ধে। এতদিন হিউস্টন ফুটবলের জন্য নয়। পৃথিবী বিখ্যাত, মহাকাশ গবেষণার জন্য। পৃথিবীখ্যাত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, ‘নাসা’র বিখ্যাত ‘জনসন স্পেস সেন্টার’ এই হিউস্টনেই অবস্থিত।
এতদিন হিউস্টন শহর আলোচনায় ছিল, মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নিয়ে। কিন্তু বৃহস্পতিবারের পর হিউস্টন নিয়ে যদি গুগল সার্চ ইঞ্জিনে আপনি ক্লিক করেন, একটাই নাম চলে আসবে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো… রোনাল্ডো... আর রোনাল্ডো (Ronaldo)। অবশ্য তাঁর যে মহান কৃতিত্ব বর্ণনার জন্য ‘হিউস্টন’ এই মুহূর্তে আলোচনায় শীর্ষে এরকম নয়। বরং কঙ্গো ম্যাচের পর চারিদিক থেকে যে হারে সমালোচনার ঢেউ ধাবিত হচ্ছে, তাতে ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে আসছে চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের মুহূর্তগুলি। যখন গ্রুপের শেষ ম্যাচে ৬৫ মিনিটের মাথায় রোনাল্ডোকে মাঠ থেকে তুলে দিয়েছিলেন কোচ ফার্নান্দো স্যান্তোস। নকআউটে গিয়ে সুইজারল্যান্ড ম্যাচে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন একেবারে প্রথম একাদশ থেকেই। বিতর্কর ঝড় তখনও উঠেছিল। তখনও রোনাল্ডোর পরিবারের সদস্যরা ‘স্বামী’, ‘ভাই’-এর সমর্থনে সোশাল মিডিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এখানেও তো চার বছর আগের সেই কার্বন কপি। তবে এবার মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার জন্য নয়। জঘন্য পারফরম্যান্স আর তার প্রতিফলন হিসেবে ম্যাচ শেষে কঙ্গো ফুটবলারদের প্রতি সৌজন্য না দেখানোর জন্য। অধিনায়ক হিসেবে, দলের আগে নিজের ‘অতিমাত্রায় অহংবোধ’ নিয়ে কীভাবে এতটা ব্যস্ত থাকতে পারেন সিআর সেভেন? এই প্রশ্ন নিয়েই উত্তাল পর্তুগাল ড্রেসিংরুম। সমালোচনা ধেয়ে আসছে, কোচ রবার্তো মার্টিনেজের দিকেও। ফিলাডেলফিয়াতে ব্রাজিল-হাইতি ম্যাচ কভার করতে আসা পর্তুগিজ সাংবাদিকরা এখানে বলাবলি শুরু করেছেন, রবার্তো মার্টিনেজের শেখা উচিত, কোচ ফার্নান্দো স্যান্তোসকে দেখে। কীভাবে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন রোনাল্ডোকে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর, দু’দলের ফুটবলাররাই মাঠের মধ্যে নিজেদের মধ্যে হাত মেলাচ্ছিলেন। এটাই ফুটবলের নিয়মে। সৌজন্যবোধ। ম্যাচে একদল হারবে। আরেকদল জিতবে। কিন্তু নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রতিপক্ষর প্রতি সৌজন্য দেখাবে। এটাই ফুটবলের অলিখিত নিয়ম। কিন্তু কঙ্গো ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্রই, মাঠের দিকে না তাকিয়ে ক্ষোভে-দুঃখে, হতাশায় সতীর্থদের জন্য অপেক্ষা না করে রোনাল্ডো সোজা হাঁটা দেন টানেলের দিকে। ওদিকে, মাঠের মধ্যে তখন দু’দলের ফুটবলাররা ব্যস্ত একে অপরের সঙ্গে হাত মেলানোয়।
এখানেই শেষ নয়। রোনাল্ডোর কিছুটা পাশে ছিলেন সতীর্থ গঞ্জালো গুইদেস। নিজে সৌজন্য না দেখিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে যাচ্ছিলেন ঠিক আছে। কিন্তু গঞ্জালোকেও ইশারা করেন, তাঁর সঙ্গে মাঠ থেকে বেরিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে যাওয়ার জন্য। মানে, সতীর্থকে বলছেন, প্রতিপক্ষকে সৌজন্য দেখানোর দরকার নেই। তাঁর সঙ্গে ড্রেসিংরুমে ফিরে যাওয়াটাই ঠিক পথ। ব্যস, এই দৃশ্য প্রকাশ্যে আসতেই পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছে। একে পারফরম্যান্স নেই। তার উপর টিম স্পিরিট ভেঙে একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতা। দল যাই করুক। রোনাল্ডো ব্যস্ত নিজের আবেগ নিয়েই। দল নয়। তাঁর আবেগ। তাঁর আনন্দ। তাঁর কষ্ট। সেটাই পর্তুগালের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসবই হয়তো ধামাচাপা পড়ে যেত যদি মাঠে পারফর্ম করতেন। কিন্তু সেটাও নেই। আর মাঠের বাইরে এই ঘটনা। সমালোচনার তিরে ফালা ফালা করে ফেলা হচ্ছে রোনাল্ডোকে। তারপর টানেলের যাওয়ার পথে কঙ্গোরা সমর্থকরা সিআর সেভেনের প্রতি বিদ্রূপ করে চান্টিং শুরু করেছিলেন, ‘মেসি… মেসি… মেসি’। অন্তত এই সময়টায় বুদ্ধি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন পর্তুগিজ তারকা। গ্যালারির সামনে উত্তেজিত না হয়ে নিজের সমর্থকদের সামনে গিয়ে অভিবাদন গ্রহণ করেন। অন্ততপক্ষে সেই সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখান, যাঁরা এই খারাপ সময়েও তাঁর পাশে থেকে, তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছিলেন।
সমর্থকদের বিদ্রূপ। টানেল থেকে উত্তেজিত হয়ে বেরিয়ে যাওয়া, সবটাই ডাগআউটে বসে প্রত্যক্ষ করছিলেন, সতীর্থ রুবেন দিয়াস। রোনাল্ডোকে সামলানোর জন্য দ্রুত বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে রোনাল্ডোকে জড়িয়ে ধরে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। আর সেই দৃশ্য দেখে ফিলাডেলফিয়াতে ব্রাজিল ম্যাচ কভার করতে আসা পর্তুগিজ সাংবাদিকরা বলছিলেন, “সেই সময়টায় মনে হচ্ছিল, রোনাল্ডো নয়। দলের আসল নেতা রুবেন দিয়াস।” আসলে রোনাল্ডো যখন নিজের ফর্মে থাকেন না, তখনই তাঁকে ঘিরে পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। যেমনটা দ্বিতীয় পর্বের ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে শেষের সময়ে হয়েছিল।
