বিশ্বকাপ 'জাগ্রত দ্বারে'! ফুটবল বিশ্বের এই মহোৎসবের জন্য প্রতীক্ষা থাকে চারটে বছরের। আর প্রতিবারই বিশ্বকাপের বল গড়ানোর আগে শুরু হয় পুরনো দিনের গল্পগাছা। ফিরে ফিরে আসে মারাদোনার 'হ্যান্ড অফ গড', জিদানের ঢুঁসো, গর্ডন ব্যাঙ্কসের সেভ... নানা কিংবদন্তি। যার মধ্যে অবশ্যই থাকবে ১৯৬৬ বিশ্বকাপের 'ভূতের গোল'! এ এমন এক গোল, যা নিয়ে বিতর্ক আজও অব্যাহত। আজকের গল্প সেটা নিয়েই।
সেবার বিশ্বকাপের আসর বসেছিল ইংল্যান্ডের মাটিতে। তাদের 'কপাল'টাও ছিল খুব ভালো। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার মতো হেভিওয়েটরা আগেই বিদায় নেওয়ায় সেমিতে পৌঁছে যায় ইংল্যান্ড। যদিও শেষ চারে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী পর্তুগাল। কিন্তু ববি চার্লটনের জোড়া গোলে অনায়াসে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। ৮২ মিনিটে পেনাল্টিতে গোল পেলেও শেষপর্যন্ত জয়ী হন গর্ডন ব্যাঙ্কসরাই। অন্য খেলায় সোভিয়েত ইউনিয়নকেও ২-১ গোলে হারায় পশ্চিম জার্মানি।
বিশ্বজয়ী ইংল্যান্ড, ১৯৬৬
১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই ফাইনালে মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানি ও ইংল্যান্ড। খেলা ছিল লন্ডনের ওয়েম্বলিতে। মাঠে দর্শকসংখ্যা ছিল ৯৬ হাজার ৯২৮! অর্থাৎ প্রায় লাখখানেক মানুষের সামনে শুরু হয় বিশ্বজয়ী হওয়ার মরণপণ লড়াই। ১১ মিনিটে লিড পায় পশ্চিম জার্মানি। সমতা ফেরান জিওফ হার্স্ট। ১৮ মিনিটে খেলা ১-১। এরপর দীর্ঘক্ষণ আর গোল হয়নি। ৭৮ মিনিটে পিটার্সের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে যায় ২-১ গোলে। যখন সকলেই ধরে নিয়েছে ব্রিটিশ সিংহদের বিশ্বজয় স্রেফ সময়ের অপেক্ষা, তখনই ওয়েবারের গোলে পশ্চিম জার্মানি সমতা ফেরায়। ৮৯ মিনিটে খেলা ২-২ হয়ে যায়। শুরু হয় অতিরিক্ত সময়ের খেলা। এবার আর ইংল্যান্ডকে রোখা যায়নি। ১০১ ও ১২০ মিনিটে দুটো গোল করেন হার্স্ট। ৪-২ গোলে ম্যাচ জিতে যায় ব্রিটিশরা। বিশ্বকাপ ফাইনালে একমাত্র হ্যাটট্রিকের যে নজির গড়েন হার্স্ট তা আজও অনন্য। কেউই স্পর্শ করতে পারেননি তাঁকে। মাঝে কেটে গিয়েছে ৬০টি বছর। কিন্তু...
এই 'কিন্তু'ও রয়ে গিয়েছে এই দীর্ঘ ছয় দশকে! অতিরিক্ত সময়ের ১১ মিনিট তথা ১০১ মিনিটের গোলটি নিয়েই যাবতীয় বিতর্ক। পশ্চিম জার্মানির ফুটবলাররা মোটেই সেই গোলটিকে 'বৈধ' বলে মানেননি। তাঁরা প্রতিবাদ করতে থাকেন। এমনকী, খোদ রেফারি গটফ্রিড ডাইনেস্টও নাকি দ্বিধান্বিত ছিলেন। পরে লাইন্সম্যানের সঙ্গে কথা বলে তিনি বাঁশি বাজিয়ে গোলের সংকেত দেন।
বিতর্কিত সেই মুহূর্ত
কেন ওই গোল নিয়ে বিতর্ক বেধেছিল? অ্যালান বলের ক্রস এসে পৌঁছয় জিওফ হার্স্টের পায়ে। দক্ষ স্ট্রাইকার মুহূর্তে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। আর সপাটে গোল লক্ষ্য করে শট নেন। বল ক্রসবারে লেগে মাটিতে পড়ে লাফিয়ে উঠে গোললাইনের কাছে ড্রপ খেয়ে সামনে এগিয়ে গেলে জার্মানির খেলোয়াড় হেড করে বলটি উড়িয়ে দেন। কিন্তু গোলের আবেদন করে বসে ইংল্যান্ড। রেফারিও দ্বিধা কাটিয়ে তা মেনে নেন। আজও নেটদুনিয়ায় সেই গোলের ক্লিপিং ভেসে বেড়ায়। রেফালি গোলের সংকেত দিতেই ওয়েম্বলি উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। পরে আরও একটি গোল করে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেন হার্স্ট। কিন্তু 'ভূতের গোল' ঘিরে বিতর্ক ম্যাচশেষে তো বটেই, বলতে গেলে 'অমর'ই হয়ে রয়েছে। কেননা হলফ করে বলা যায় না, গোলটা হয়নি কিংবা নিশ্চিত ভাবেই গোলটা হয়েছিল। যদিও স্লো মোশনে দেখলে মনে হয়ই, বলটা গোললাইনের ভিতরে নয়, বাইরে ড্রপ খেয়েছিল। কিন্তু সেটা সম্পর্কে একশো শতাংশ নিশ্চিত হওয়া যায় না। এই সংশয় এত বছরেও ঘোচেনি। যে লাইন্সম্যানের সায় মেনে রেফারি গোলের বাঁশি বাজান, তিনি পরে বলেন রজার হান্টের উদযাপনেই নাকি তাঁর মনে হয়েছিল গোলটা সত্যিই হয়েছে!
১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ড
আসলে ছেষট্টির বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড জিতলেও সেই জয়ে বিতর্কের আঁশটে গন্ধ এখনও ভনভন করছে। শুধু কী ফাইনাল, কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ম্যাচটা নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। বলা যায়, সেই ম্যাচ থেকেই দুই দলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা। ৭৮ মিনিটে হার্স্টের গোলেই জিতেছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু সেই গোল নিয়েও বিতর্ক ছিল। আজও আছে। বলা হয়, গোলটা নাকি অফসাইড ছিল। আর সেই 'ভুল' গোলেই জয়লাভ করে ইংরেজরা। তাছাড়া ম্যাচের বড় একটা সময় দশজনে খেলতে হয়েছিল আর্জেন্তিনীয়দের। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। খোদ অধিনায়ক আন্তোনিও রাটিনকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। এমন ধুন্ধুমার শুরু হয় পুলিশ অফিসারকে মাঠে নেমে তাঁকে বাইরে নিয়ে যেতে হয়। জার্মানির রেফারি রুডলফের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকেই অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল রাটিনের আচরণ দেখেই নাকি তিনি লাল কার্ড দেখিয়েছেন। গোলমাল অবশ্য এরপরও শেষ হয়নি। রাটিন কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে ইংল্যান্ডের পতাকা ছিঁড়ে দেন!
সেই বিতর্কিত মুহূর্ত
বলাই বাহুল্য, এতেই গোলমাল চরমে ওঠে। ইংল্যান্ড দলের ম্যানেজার স্যার আলফ রামসে ম্যাচ শেষে জার্সি বদলের প্রথা থেকে সরিয়ে রাখেন দলের ফুটবলারদের। এমনকী দক্ষিণ আমেরিকানদের 'জানোয়ার'ও বলে বসেন। সেই বিতর্ক আজও মেটেনি। তবে কোয়ার্টার ফাইনালের গোল নিয়ে বিতর্ক কিন্তু থিতিয়ে যায় ফাইনালের গোল নিয়ে। আরও একটা বিশ্বকাপ এসে পড়ল। কিন্তু ইংল্যান্ডের ফুটবল দলের 'চোর' অপবাদ আজও মুছল না। ফলে কলঙ্কিতই রয়ে গিয়েছে তাদের একমাত্র ফুটবল বিশ্বকাপ জেতার গৌরব। হার্স্ট কি ভাবতে পেরেছিলেন তাঁর গোলটি আসলে ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়কেও ছাপিয়ে গিয়ে টিকে থাকবে এতগুলো দশক?
