১১৭ মিনিটে স্পেনের গোলে প্রথম শট। তিরিশ মিনিটের একস্ট্রা টাইম মিলেজুলে ১২০ মিনিটে বিপক্ষ গোলমুখী শট মাত্র দু'টো। ম্যাচ জুড়ে অসংখ্য ফাউল। এবং খেলা শেষে স্পেনের প্লেয়ারদের নির্বিচারে মারধর। রীতিমতো মাটিতে ফেলে। 'বিব' টেনে ধরে। রবিবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন বিশ্বজয়ী হওয়ার পর লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে নিয়ে যত না আলোচনা চলছে, তার চেয়ে অনেক বেশি চর্চা চলছে পরাভূত টিম আর্জেন্টিনার আচরণ নিয়ে। বিগত চার বছর ধরে বিশ্বজয়ী ছিল যারা। কিন্তু খেলা শেষে লিয়ান্দ্রো পারদেসরা যে নিকৃষ্ট বর্বরতার নিদর্শন পেশ করলেন, তার পর গোটা বিশ্বে চর্চা চলছে, কোনটা বেশি কদর্য? মাঠে স্পেনের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার নিষ্প্রভ ফুটবল? নাকি খেলা শেষে পারদেসদের কুৎসিত আচরণ?
রবিবার খেলা শেষে একটা হিসেব ঘুরছিল যে, গত ষাট বছরের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাই একমাত্র টিম যারা নির্ধারিত নব্বই মিনিটে স্পেনের গোলে একটাও শট নিতে পারেনি। তবু সেটা খেলার দিক। কিন্তু খেলা শেষে যা হল, তার জন্য ফিফার কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে আর্জেন্টিনাকে (Argentina)। খেলা শেষে পারদেসের লাল কার্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করবে বলে জানিয়ে দিয়েছে ফিফা। শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে। ঠিক কী ঘটেছে? গতকাল ফাইনাল শেষের পর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছিল। প্রথমে আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটামেন্ডির সঙ্গে বেঁধে যায় স্পেন অধিনায়ক রড্রির। উত্তেজিত ওটামেন্ডি বলতে থাকেন, কোন সাহসে স্পেন প্রাক-ফাইনাল সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিল যে, আর্জেন্টিনাকে রেফারিরা সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে 'অন্যায়' সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে ফিফা-এ হেন অভিযোগ নানা মহল থেকে উঠছিল। বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ সিক্সটিনের ম্যাচে ন্যায্য' গোল বাতিলের অভিযোগে ক্ষিপ্ত মিশর কোচ হোসেমি হোসেন পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, এর চেয়ে ফিফা বিশ্বকাপটা আর্জেন্টিনাকেই দিয়ে দিক। ফাইনালের আগে স্পেনের রড্রি এবং অ্যামেরিক লাপোর্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন আর্জেন্টিনার খেলায় রেফারিদের 'পক্ষপাতিত্ব' নিয়ে। যা নিয়ে ফাইনাল শেষের পর রড্রিকে গিয়ে ওটামেন্ডি বলেন, "তোমরা ফাইনালের আগে রেফারিং নিয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছিলেন। ফাইনালের আগে তোমাদের সে সব বলা উচিত ছিল না।"
আসলে এনজো ফার্নান্ডেজের নাল কার্ড মেনে নিতে পারেনি 'লা আলবিসেলেস্তে'-রা। পারদেস পর্ব এরপর শুরু হয়। তাঁর সঙ্গে লেগে যায় স্পেনের দুই ফুটবলার এরিক গার্সিয়া এবং গাভির। প্রথমে উত্তেজনার বশে গার্সিয়ায় ঘাড় ধরে ধাক্কা মেরে দেন পারদেস। যার পর গাভি কিছু বলতে গেলে, তাঁকে ঘুসি মেরে বসেন আর্জেন্টিনা ফুটবলার। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালেনি পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য ছুটে যান। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। রেফারি সোজা লাল কার্ড দেখিয়ে দেন পারদেসকে। ফিফা যা নিয়ে তদন্ত শুরু করছে। শুধুমাত্র ফিফার রক্তচক্ষু নয়। গোটা বিশ্বের ফুটবল-সমাজের রোষে পড়েছে পারদেসদের আরেণ। প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক গ্যারি নেভিল বলে দেন, "পারদেস যা করল, তাকে নিকৃষ্ট আচরণ ছাড়া কিছু বলা যায় না। পারদেসের ভাগ্য ভালো যে, খেলা চলাকালীন ওকে লাল কার্ড দেখানো হয়নি। আর্জেন্টিনার কৃতিত্ব কেউ কেড়ে নিচ্ছে না। ওরা লড়াই করে বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছে। কিন্তু এটা কী রকম আচরণ?"
অ্যালান শিয়ারার বলে দেন, 'ফুটবলে এ রকম আচরণের কোনও স্থান নেই। ম্যাচ হারলে মন-মেজাজ খারাপ থাকবে। কিন্তু তাই বলে এ সমস্ত কেউ করে?" ফাইনাল শেষে জার্মানির টনি ক্রুসও সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখে দেন, 'ফুটবল জিতল'। বিতর্ক বেঁধেছে স্পেন বিশ্বজয়ী ট্রফি নেওয়ার সময় সমগ্র আর্জেন্টিনা টিমের উল্টোমুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা নিয়েও। বলা হচ্ছে, 'স্পোর্টসম্যান স্পিরিট' বলে বস্তুটাকে কি তুলে দিল আর্জেন্টিনা? ঘুরেফিরে কী দাঁড়াল? লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক দিয়ে এবারের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার। শুরু হয়েছিল, চতুর্থ বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দিয়ে। কে জানত, বিশ্বকাপের শেষ দিনে মেসির কান্নার চেয়েও একটা দুঃখজনক বিষয় জুড়ে থাকবে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সঙ্গে। সরি, বিষয় নয়। একটা শব্দ। কলঙ্ক।
